ছেলেশিশুর খাতনা: সুন্নাহ, সময় ও অনুষ্ঠানের মাসআলা
ছেলে সন্তান জন্মের পর অনেক পরিবারে প্রশ্ন ওঠে: খাতনা কি জরুরি, কখন করানো উচিত, আর এ উপলক্ষে কি অনুষ্ঠান করা যায়? এই লেখায় বুখারী-মুসলিমের হাদীস এবং চারটি হানাফি ফতোয়ার আলোকে উত্তরগুলো সাজানো হলো: দারুল ইফতা দেওবন্দের দুটি ফতোয়া (নম্বর ৩৬৭/৩৬৭=এম/১৪২৯ এবং ১০১৩/১০১৩/এম=১৪৩৪), দারুল ফিকহ ডাবলিনের (শায়খ ফারাজ আদম) লেখা এবং দারুল উলুম ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর ফতোয়া।
খাতনা ফিতরাতের অংশ
আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ বলেছেন, “পাঁচটি কাজ ফিতরাতের অন্তর্ভুক্ত: খাতনা করা, নাভির নিচের লোম পরিষ্কার করা, নখ কাটা এবং গোঁফ ছোট করা।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৮৮৯)। সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় (হাদীস ২৫৭) পাঁচটি কাজের মধ্যে বগলের লোম উপড়ে ফেলার কথাও আছে।
অর্থাৎ খাতনা ইসলামের একটি স্বভাবজাত পরিচ্ছন্নতার কাজ হিসেবে হাদীসে এসেছে।
খাতনার হুকুম
ত্রিনিদাদের দারুল উলুমের ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ইমাম আবু হানিফা (রহঃ), হাসান বসরী ও আহমাদ (রহঃ)-এর মাযহাবের কিছু আলেমের মতে পুরুষের জন্য খাতনা সুন্নাত। ইমাম শাফেয়ী, আহমাদ ও মালেক (রহঃ)-এর মাযহাবে অধিকাংশের মতে এটি ওয়াজিব। মুফতি ওয়াসীম খান লিখেছেন, ওয়াজিব মতটি শক্তিশালী হওয়ায় সুন্নাতের হুকুমকেও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কোনো ওজর ছাড়া বালেগ পুরুষ খাতনা অবহেলা করলে গুনাহগার হবে।
দারুল ফিকহ ডাবলিনের লেখায় (শায়খ ফারাজ আদম) এটিকে ছেলেদের জন্য তাকিদপূর্ণ সুন্নাত বলা হয়েছে।
কখন খাতনা করাবেন
দেওবন্দের ৩৬৭ নম্বর ফতোয়ায় প্রশ্ন ছিল, সন্তান জন্মের কত দিনের মধ্যে খাতনা করাতে হবে। উত্তরে বলা হয়েছে, ফকীহদের মতে সাত থেকে বারো বছর বয়সের মধ্যে করানো মুস্তাহাব। এর আগে করানোও জায়েজ। সূত্র হিসেবে ফাতাওয়া হিন্দিয়ার (৫/৩৫৭) কথা বলা হয়েছে।
১০১৩ নম্বর ফতোয়ায় বলা হয়েছে, শিশু ব্যথা সহ্য করার মতো হলে খাতনা করানো যায়, এবং সাত থেকে বারো বছর বয়সে করানো সুন্নাত। এর আগে করানোও জায়েজ।
দারুল ফিকহ ডাবলিনের লেখায় বলা হয়েছে, শিশু ব্যথা সইতে পারার মতো হলে খাতনা করানো উচিত। আধুনিক চিকিৎসায় ব্যথা কমানো গেলে আগে করানো ভালো। লেখাটির পাদটীকায় আদর্শ বয়স নিয়ে সাত থেকে দশ বছর বা তার পরেও বিভিন্ন মত আছে বলে উল্লেখ আছে, মূল লেখা কোনো নির্দিষ্ট বয়স ধরেনি।
বড় বয়সে খাতনা
ত্রিনিদাদের ফতোয়ায় বলা হয়েছে, বালেগ হয়ে গেলেও যথাসম্ভব খাতনা করানোর চেষ্টা করা উচিত। কোনো ব্যক্তি অতি কষ্ট পেলে, বা ডাক্তার ক্ষতির আশঙ্কায় নিষেধ করলে তা ছাড়া যায়। সে ক্ষেত্রে প্রস্রাব বা স্রাব লেগে থাকা অংশ ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে, বিশেষ করে নামাযের আগে। ফতোয়াটিতে আরও বলা হয়েছে, আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, ইবরাহীম (আঃ) আশি বছর বয়সে খাতনা করেছিলেন, এবং নতুন মুসলিম হলে বড় বয়সেও খাতনার কথা যুহরী (রহঃ)-এর সূত্রে এসেছে। (এই বর্ণনাগুলো ফতোয়ার উদ্ধৃতি থেকে নেওয়া, মূল সংকলন দেখে মেলানো হয়নি।)
খাতনার হিকমত
ত্রিনিদাদের ফতোয়ায় দুটি কারণ বলা হয়েছে। প্রথমত, খাতনা মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে পার্থক্যের চিহ্ন। দ্বিতীয়ত, ঠিকমতো না ধুলে চামড়ার নিচে প্রস্রাবের ফোঁটা থেকে যেতে পারে, ফলে পবিত্রতা ও নামায নিয়ে সন্দেহ থাকে এবং ওযু-নামায অপূর্ণ হতে পারে। তাই শিশুর বেলায় বাবা-মায়ের উচিত এসব বিষয় মাথায় রেখে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া।
ফতোয়াটিতে আরও বলা হয়েছে, নতুন মুসলিমকে কুফরের সময়ের লোম পরিষ্কার করতে ও খাতনা করতে বলা হয়েছে (আবু দাউদের উদ্ধৃতিতে, মূল সংকলন দেখে মেলানো হয়নি)। যাদের পরিবারে নতুন মুসলিম আছেন, তাঁদের জন্য এটি জানা থাকা ভালো।
ফতোয়াটি আরেকটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছে: “খাতনা পুরুষের জন্য সুন্নাত এবং নারীর জন্য সম্মানের বিষয়।” এটি মুসনাদে আহমাদ ও বাইহাকীর সূত্রে বলা হয়েছে, মূল সংকলন দেখে মেলানো হয়নি, তাই এর ওপর আমরা আলাদা কোনো মাসআলা দাঁড় করাইনি। ফতোয়ার উপসংহার হলো, যিনি কোনো বৈধ কারণ ছাড়া এবং পুরোপুরি অবজ্ঞা করে খাতনা ছেড়ে দেন, তিনি গুনাহগার; আর যিনি ব্যথা বা চিকিৎসকের নিষেধের কারণে ছাড়েন, তিনি পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে ক্ষমাযোগ্য।
অনুষ্ঠান করা কি ঠিক?
দেওবন্দের ১০১৩ নম্বর ফতোয়ায় প্রশ্ন ছিল, খাতনা উপলক্ষে বন্ধু-আত্মীয়দের দাওয়াত করা যাবে কি না। উত্তরে বলা হয়েছে, খাতনার অনুষ্ঠান করে মানুষকে দাওয়াত দেওয়া সুন্নাহর পরিপন্থী ও অপছন্দনীয়। ফতোয়ায় মুসনাদে আহমাদের উদ্ধৃতিতে এক সাহাবীর কথা এসেছে যিনি এমন অনুষ্ঠানে যেতে অস্বীকার করেছিলেন, কারণ নবীজির ﷺ যুগে সাহাবীরা খাতনায় যেতেন না, ডাকাও হতেন না। (এই উদ্ধৃতি ফতোয়া থেকে নেওয়া।)
একই প্রশ্নের ভেতরে আকীকার গোশত রান্না করে মানুষকে খাওয়ানো বা কাঁচা বিতরণ, দুটিই জায়েজ বলা হয়েছে। এবং চল্লিশ দিন পর নির্দিষ্ট তারিখে আনন্দ-অনুষ্ঠান ঠিক নয় বলা হয়েছে।
পরিবারের জন্য সারকথা
- খাতনা ফিতরাতের কাজ, বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে এসেছে।
- হানাফি মতে এটি সুন্নাত; অন্য মাযহাবে অনেকে ওয়াজিব বলেছেন, তাই অবহেলা করা ঠিক নয়।
- দেওবন্দের ফতোয়া অনুযায়ী সাত থেকে বারো বছর বয়সে করানো মুস্তাহাব বা সুন্নাত, তার আগেও জায়েজ।
- ব্যথা সহ্য করার মতো অবস্থা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ দেখে সিদ্ধান্ত নিন।
- খাতনা উপলক্ষে বড় অনুষ্ঠান ও দাওয়াত না করাই সুন্নাহ-সম্মত।
শিশুর স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার এই বিষয়টিতে আল্লাহ আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাওফীক দিন।
