পরিমিত খাবার: পেটের তিন ভাগের হাদীস ও আজকের খাবার
আমাদের ঘরে রোজ তিনবেলা রান্না হয়। সেই খাবার শরীরকে শক্তি দেয়, আবার একই খাবার বেশি হয়ে গেলে রোগের কারণও হয়। ইসলাম খাওয়ার ব্যাপারে আমাদের কোনো কঠিন নিয়মে বাঁধেনি। বরং একটি সহজ ও সুন্দর মাপকাঠি দিয়েছে, যা বাবা-মা থেকে শুরু করে ছোট সন্তান পর্যন্ত সবাই বুঝতে পারে।
খাবারও আল্লাহর নিয়ামত
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ লিখেছেন, খাদ্য মানবজীবনের অন্যতম প্রধান নিয়ামত। বেঁচে থাকা, শক্তি অর্জন ও কাজের সামর্থ্যের জন্য খাবারের বিকল্প নেই। তাই খাওয়ায় পরিমিতি রাখা এবং অপচয় থেকে বিরত থাকা কৃতজ্ঞতারই প্রকাশ।
কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা খাও এবং পান করো, কিন্তু অপব্যয় করো না। আল্লাহ অপব্যয়কারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আরাফ, ৭:৩১)। অন্যত্র বলা হয়েছে, “যারা অপব্যয় করে, তারা শয়তানের ভাই।” (সূরা বনি ইসরাঈল, ১৭:২৭)। এই আয়াতগুলো একদিকে খাওয়ার অনুমতি দেয়, অন্যদিকে সীমা মানার কথা মনে করিয়ে দেয়। খাওয়া নিষিদ্ধ নয়, কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া নিষিদ্ধ।
পেটের তিন ভাগের হাদীস
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মানুষ পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোন পাত্র ভর্তি করে না। যতটুকু আহার করলে মেরুদন্ড সোজা রাখা সম্ভব, ততটুকু খাদ্যই কোন ব্যক্তির জন্য যথেষ্ট। এরপরও যদি কোন ব্যক্তির উপর তার নফস জয়যুক্ত হয়, তবে সে তার পেটের এক-তৃতীয়াংশ আহারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩৩৪৯)। জামে তিরমিযীর বর্ণনায় আছে, “মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারে এমন কয়েক গ্রাস খাবারই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট।” (জামে তিরমিযী, হাদীস ২৩৮০)
মুফতি ইউসুফ এমদাদীর ভাষায়, হাদীসে পরিমিত খাবারের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে এবং এর একটি চমৎকার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও বলে দেওয়া হয়েছে। হাদীসটি ধাপে ধাপে তিনটি কথা শেখায়। প্রথমত, বেশি খাওয়ার অভ্যাসকে খারাপ বলা হয়েছে। পেটকে সবচেয়ে মন্দ পাত্র বলার মানেই হলো, অকারণে ভরে ফেলা ঠিক নয়। দ্বিতীয়ত, আসল প্রয়োজন সামান্যই, শরীর সোজা রেখে কাজ করার মতো শক্তি পেলেই যথেষ্ট। তৃতীয়ত, যাঁদের পক্ষে এর চেয়ে কম খাওয়া কঠিন, তাঁদের জন্য সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সেই সীমায় পেটের একভাগ খাবার, একভাগ পানি আর একভাগ ফাঁকা থাকবে।
অতিভোজন কেন ক্ষতিকর
মুফতি ইউসুফ এমদাদী ব্যাখ্যা করেছেন, পাকস্থলীর একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা আছে। অতিরিক্ত খাবারে তা পূর্ণ হয়ে গেলে হজমের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বদহজমসহ পেটের নানা রোগ দেখা দেয়। ফয়জুল্লাহ রিয়াদও লিখেছেন, অতিরিক্ত আহার শরীরের জন্য ক্ষতিকর এবং বহু রোগের মূল কারণ অতিভোজন।
মুফতি ইউসুফ এমদাদী ইসলামের দৃষ্টিতে সর্বোত্তম স্বাস্থ্যবিধি হিসেবে তিনটি অভ্যাসের কথা বলেছেন। এক, ভরা পেটে আবার না খাওয়া। দুই, ক্ষুধা নিয়ে খেতে বসা। তিন, কিছুটা ক্ষুধা থাকতেই খাবার শেষ করা। এই তিনটি অভ্যাস একসঙ্গে মানলে খাবার শরীরের উপকারে লাগে, বোঝা হয়ে দাঁড়ায় না।
আজকের ঘরে কীভাবে মানবেন
এই হাদীসকে আজকের জীবনে এনে আমরা কয়েকটি সহজ কাজ করতে পারি।
পাতে অল্প নিন, দরকার হলে আবার নিন। শুরুতেই পাহাড়ের মতো ভাত তুললে খাওয়ার পর অর্ধেক ফেলে দিতে হয়, নয়তো না চাইতেও খেয়ে ফেলতে হয়। অল্প নিয়ে শুরু করলে দুটোই এড়ানো যায়।
দস্তরখান বিছিয়ে, হাত ধুয়ে খান। ফয়জুল্লাহ রিয়াদ লিখেছেন, খাওয়ার সময় দস্তরখান বিছিয়ে বসা এবং হাত ধুয়ে খাওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো খাবারের অপচয় রোধ করা। এর মাধ্যমে আল্লাহর নিয়ামতের মূল্য দেওয়া হয়। মেঝেতে বা অগোছালোভাবে ছড়িয়ে খেলে খাবার নষ্ট হওয়ার সুযোগ বাড়ে, আর পরিচ্ছন্নভাবে বসলে সবাই যত্ন করে খেতে পারে।
সন্তানকে শেখান। ছোটদের জোর করে বেশি খাওয়ানো অনেক ঘরেই দেখা যায়। হাদীসের শিক্ষা অনুযায়ী প্রয়োজন পরিমাণ খাওয়ানোই যথেষ্ট। শিশুর শারীরিক চাহিদা ও ডাক্তারের পরামর্শ বিবেচনায় রাখুন।
দাওয়াত ও অনুষ্ঠানে সংযম রাখুন। ফয়জুল্লাহ রিয়াদ দুঃখ করে লিখেছেন, আমাদের সমাজে দাওয়াত, বিয়ে কিংবা নানা অনুষ্ঠানে বিপুল পরিমাণ খাবার নষ্ট হয়। হোটেল-রেস্তোরাঁতেও একই চিত্র। এই অপচয় আল্লাহর অমূল্য নিয়ামতের অবমূল্যায়নের শামিল। নিয়ামত পেয়ে অকৃতজ্ঞ হলে আল্লাহ তা ছিনিয়ে নেন। কুরআনে এসেছে, “যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি তোমাদের আরও বেশি দেব। যদি অকৃতজ্ঞ হও, তাহলে আমার শাস্তি অবশ্যই কঠিন।” (সূরা ইবরাহীম, ১৪:৭)
পানিকে জায়গা দিন। তিন ভাগের এক ভাগ পানির জন্য, এই কথাটি মনে রাখলে খাবারের সঙ্গে ও আশপাশে পানি পান করা সহজ হয়।
একটি ভারসাম্যের কথা
এসব কথার অর্থ এই নয় যে, খাওয়া নিয়ে কৃপণতা করতে হবে বা পরিবারকে অভুক্ত রাখতে হবে। কুরআন যেমন অপচয় নিষেধ করেছে, তেমনি আল্লাহর দেওয়া হালাল ও স্বাস্থ্যকর রিযিক খাওয়ার অনুমতিও দিয়েছে। কেউ যদি রোগের কারণে বা চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ খাদ্যতালিকা মানেন, তাহলে সেটি মেনে চলাই উত্তম। নির্দিষ্ট রোগের খাবার নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শেষ কথা
পেটের তিন ভাগের হাদীস মাত্র কয়েকটি বাক্য, কিন্তু এর ভেতরে স্বাস্থ্য, কৃতজ্ঞতা ও সংযমের পুরো শিক্ষা রয়েছে। ঘরের দস্তরখানে এই হাদীসের চর্চা থাকলে বহু রোগ ও অপচয় থেকে বাঁচা সম্ভব। আল্লাহ আমাদের পরিমিত, হালাল ও বরকতময় রিযিক দান করুন। আমীন।
