ইদ্দতের সময় কোথায় থাকবেন ও ইদ্দতকালে ভরণপোষণ কার দায়িত্ব
ইদ্দত চলাকালীন নারী কোন বাড়িতে থাকবেন? স্বামীর বাড়িতে, নাকি বাপের বাড়িতে? এই প্রশ্ন নিয়ে বহু পরিবারে ঝামেলা হয়। হানাফী ফিকহের নির্দেশনা এখানে সহজ ভাষায় দেওয়া হলো।
মূল নিয়ম: যে ঘরে ছিলেন, সেখানেই
বিধবার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। আসকিমামের ফতোয়ায় এসেছে, স্বামীর মৃত্যুর সময় যে ঘরে ছিলেন, সেই ঘরেই ইদ্দত পালন করা উচিত। সুনানে আবু দাউদে ফুরাইআ বিনতে মালিক রা.-এর হাদীস আছে। তাঁর স্বামী মারা গেলে তিনি বাপের বাড়ি যেতে চাইলেন। নবীজি ﷺ তাঁকে বললেন, যে ঘরে তোমার কাছে স্বামীর মৃত্যুর খবর এসেছে, সেই ঘরেই থাকো, যতক্ষণ না নির্ধারিত সময় শেষ হয়। তিনি চার মাস দশ দিন সেখানেই থাকলেন (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৩০০; জামে তিরমিযী, হাদীস ১২০৪)।
ব্যতিক্রম: ওজর থাকলে
মুফতি সিরাজ দেসাই ও আসকিমামের ফতোয়া অনুযায়ী নিচের ক্ষেত্রে ঘর বদলানো যায়:
- ঘর ভেঙে পড়ার আশঙ্কা
- প্রাণ, ইজ্জত বা সম্পদের নিরাপত্তার ভয়
- ভাড়া দিতে না পারা, যদি সামর্থ্য না থাকে
- স্বামীর পরিবার ঘর থেকে বের করে দিলে
- সম্পত্তির অংশ দিয়ে থাকার জায়গা না হলে, অথবা অ-মাহরাম ওয়ারিশদের থেকে সম্পদ বা সম্মান রক্ষার জন্য
যেখানে সরে যাওয়া হবে, সেই বাড়িও পুরো ইদ্দতের জন্য আগের বাড়ির মতো গণ্য হবে। আলী রা. উমর রা.-এর মৃত্যুর পর উম্মে কুলসুমকে অন্যত্র সরিয়েছিলেন, আয়েশা রা. তালহা রা.-এর মৃত্যুর পর বোনকে সরিয়েছিলেন, ফিকহী গ্রন্থে এমন বর্ণনা এসেছে।
বের করে দেওয়া হলে
স্বামী তালাক দিয়ে স্ত্রীকে ঘর থেকে বের করে দিলে তা বড় গুনাহ। এ অবস্থায় স্ত্রী বাপের বাড়িতে বা অন্য নিরাপদ জায়গায় ইদ্দত পালন করতে পারেন।
মাহরাম ও পর্দা
ইদ্দতকালে একই বাড়িতে দেবর, ভাসুর, চাচাতো ভাইদের মতো অ-মাহরাম পুরুষ থাকলে পর্দার ব্যবস্থা করতে হবে। মুফতি সিরাজ দেসাই জানিয়েছেন, ইদ্দতে থাকুক বা না থাকুক, অ-মাহরামের সামনে আসা যাবে না, শুধু মাহরামরাই দেখতে পারেন।
সাধারণ ভুল
- শোক কাটানোর নামে বাপের বাড়ি চলে যাওয়া।
- শ্বশুরবাড়ির লোকেরা সম্পত্তির লোভে তাড়িয়ে দেওয়া।
- একজনকে আরেক বাড়িতে বদলি করতে বাধ্য করা।
এসব এড়িয়ে চললে ইদ্দত আরও সহজে পালন করা যায়।
ইদ্দতকালে ভরণপোষণ কার দায়িত্ব
ইদ্দতের সময় নারীর খরচ কে চালাবে, এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে ইদ্দত তালাকের নাকি মৃত্যুর।
তালাকের ইদ্দতে স্বামীর দায়িত্ব
হানাফী মাযহাব অনুযায়ী তালাকপ্রাপ্তা নারী ইদ্দতের পুরো সময় স্বামীর কাছ থেকে খোরপোষ পাবেন, তালাক রাজয়ী হোক বা বায়েন। দারুল ইফতা লেস্টারের মুফতি মুহাম্মাদ ইবনে আদম এই কথা বলেছেন এবং ইবনে আবেদীনের রদ্দুল মুহতার গ্রন্থের উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে বাস কর, তাদের সেখানে বাস করতে দাও এবং তাদের সংকটে ফেলার জন্য কষ্ট দিও না। যদি তারা গর্ভবতী হয়, তাদের প্রসব পর্যন্ত খরচ বহন কর” (সূরা তালাক, আয়াত ৬)।
খোরপোষ বলতে খাবার, পোশাক, ওষুধ ও থাকার জায়গা বোঝায়। সামর্থ্য অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক হবে (সূরা তালাক, আয়াত ৭)।
স্বামী না দিলে
মুফতি সিরাজ দেসাইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী স্বামী খরচ না দিলে এবং স্ত্রী কঠিন প্রয়োজনে থাকলে তিনি উপার্জনের জন্য বের হতে পারেন, সূর্যাস্তের আগে ফিরতে হবে। আর বাকি পড়া খরচ কাজির রায় বা পারস্পরিক সম্মতি ছাড়া ঋণ হিসেবে গণ্য হয় না। তবু স্বামী স্বেচ্ছায় তা পরিশোধ করলে সওয়াব পাবেন।
মৃত্যুর ইদ্দতে
স্বামী মারা গেলে ইদ্দতকালে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে বিধবা তাঁর শরয়ী অংশ পাবেন। স্ত্রী পান:
- সন্তান না থাকলে স্বামীর সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ
- সন্তান থাকলে এক-অষ্টমাংশ (সূরা নিসা, আয়াত ১২)
এই অংশ বণ্টনের আগে ঋণ ও ওয়াসিয়ত পরিশোধ হবে। ওয়ারিশদের উচিত অবিলম্বে বিধবার হক বুঝিয়ে দেওয়া। ইদ্দতের সময় তাঁর খরচের জন্য অগ্রিম কিছু দিয়ে দেওয়া ভালো।
বিধবার নিজের সম্পদ
বিধবার নিজস্ব সম্পদ ও মোহর পৃথক হক। মোহর অপরিশোধিত থাকলে তা স্বামীর ঋণ এবং সম্পত্তি ভাগের আগে পরিশোধ্য। এ বিষয়ে পরে আলাদা লেখা থাকবে।
পরিবারের করণীয়
- মৃত স্বামীর আত্মীয়রা সম্পত্তি আটকে রাখবেন না।
- বিধবা যদি অসহায় হন, তবে পরিবার ও সমাজের উচিত তাঁর খরচের ব্যবস্থা করা।
- আর্থিক চাপে বিধবাকে অপমান বা খোঁটা দেওয়া নিষিদ্ধ।
সতর্কতা
নবীজি ﷺ বলেছেন, “বিধবা ও মিসকিনদের জন্য চেষ্টা-পরিশ্রমকারী আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো, অথবা রাতে ইবাদতকারী ও দিনে রোযাদারের মতো” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৩৫৩; সহীহ মুসলিম)। তাই বিধবার পাশে দাঁড়ানো মহান সওয়াবের কাজ।
