রাগ সামলানো ও ক্ষমা করা: শান্ত হৃদয়ের দুই চাবি
রাগ আসা স্বাভাবিক। সমস্যা হয় তখন, যখন রাগ আমাদের মুখ, হাত আর সিদ্ধান্ত নিজের দখলে নিয়ে নেয়। রাগের মাথায় বলা একটি কথা বছরের পর বছর সম্পর্ক ভেঙে রাখতে পারে। আবার কারও ওপর অভিমান জমে থাকলে সেটাও ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত করে দেয়। যার ওপর রাগ, তার হয়তো কিছুই যায় আসে না, কিন্তু যে রাগ ধরে রাখে, সে-ই বেশি কষ্ট পায়। ইসলাম তাই রাগ সংবরণ আর ক্ষমা, এই দুটি গুণকে একসঙ্গে শিখিয়েছে।
প্রকৃত বীর কে
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ বলেছেন, প্রকৃত বীর সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে হারায়। প্রকৃত বীর সেই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (সহীহ বুখারী, ৬১১৪)
ভাবুন, ঘরে সন্তান কোনো জিনিস ভেঙে ফেলল আর আপনি চিৎকার না করে শান্ত থাকলেন। এই সংযমই প্রকৃত শক্তি।
আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের গুণ
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “যারা স্বচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুতঃ আল্লাহ সৎকর্মশীলদিগকেই ভালবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪)
রাগ করো না
আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি নবীজি ﷺ-কে বলল, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বললেন, রাগ করো না। লোকটি কয়েকবার একই কথা বলল। প্রতিবারই নবীজি ﷺ বললেন, রাগ করো না। (সহীহ বুখারী, ৬১১৬)
রাগ এলে কী করবেন
আলেমদের লেখায় যে উপায়গুলো এসেছে, সেগুলো সহজ ও ঘরে প্রয়োগযোগ্য:
১. আউযুবিল্লাহ পড়ুন। সুলাইমান ইবনে সুরাদ (রা.) বলেন, নবীজি ﷺ-এর সামনে দুজন লোক ঝগড়া করছিল। তাদের একজনের চেহারা লাল হয়ে গিয়েছিল। নবীজি ﷺ বললেন, আমি এমন একটি কথা জানি, সে যদি তা বলে, তার রাগ চলে যাবে। সে যদি বলে “আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম”। (সহীহ বুখারী, ৩২৮২)
২. চুপ থাকুন। রাগের সময় মুখ থেকে এমন কথা বেরিয়ে যায়, যার জন্য পরে আফসোস হয়। কিছুক্ষণ চুপ থাকলে সেই ক্ষতি এড়ানো যায়।
৩. অবস্থান বদলান। আবু যর (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে, দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় রাগ এলে বসে পড়বে। তাতেও না কমলে শুয়ে পড়বে।
৪. ওযু করুন। আতিয়্যা (রা.)-র বর্ণনায় এসেছে, রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে, শয়তানকে আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর পানি আগুন নিভিয়ে দেয়। তাই রাগ এলে ওযু করা ভালো।
৫. মন্দের জবাব ভালো দিয়ে দিন। আল্লাহ বলেন, “সমান নয় ভাল ও মন্দ। জওয়াবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন আপনার সাথে যে ব্যক্তির শুত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু।” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৪)
রাগ দমনের প্রতিদান
মুআয ইবনে আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি রাগ প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা দমন করে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সব সৃষ্টির সামনে ডেকে আনবেন এবং জান্নাতের হুরদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা বেছে নিতে দেবেন। (সুনানে আবু দাউদ, ৪৭৭৭; হাদীসটি হাসান)
আল্লাহও ক্ষমা ভালোবাসেন
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষক্রটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা কর না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।” (সূরা নূর, ২৪:২২)
আয়াতটির প্রশ্ন আমাদের নিজেদের দিকে ফেরায়। আমরা সবাই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। তাহলে অন্যকে ক্ষমা করতে এত কষ্ট কেন?
ক্ষমা দুর্বলতা নয়
কুরআনে বলা হয়েছে, “অবশ্যই যে সবর করে ও ক্ষমা করে নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।” (সূরা শূরা, ৪২:৪৩) আরও বলা হয়েছে, “যে ক্ষমা করে ও আপোষ করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে।” (সূরা শূরা, ৪২:৪০)
অর্থাৎ ক্ষমা মানে অন্যায় মেনে নেওয়া নয়। ক্ষমা মানে প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে সংযত রাখা। এটাই সাহসিকতা।
ক্ষমা করলে সম্মান বাড়ে
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, সদকা সম্পদ কমায় না। যে ব্যক্তি ক্ষমা করে, আল্লাহ তার সম্মান বাড়িয়ে দেন। আর যে আল্লাহর জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে উচ্চ মর্যাদা দেন। (সহীহ মুসলিম, ২৫৮৮)
আমরা ভাবি, ক্ষমা করলে ছোট হয়ে যাব। হাদীস বলছে, উল্টোটা সত্য।
সত্তরবার ক্ষমা
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি নবীজি ﷺ-কে জিজ্ঞেস করল, আমি খাদেমকে কতবার ক্ষমা করব? নবীজি ﷺ চুপ থাকলেন। সে আবার জিজ্ঞেস করল, তিনি চুপ থাকলেন। তৃতীয়বার তিনি বললেন, প্রতিদিন সত্তরবার। (সুনানে আবু দাউদ, ৫১৬৪; হাদীসটি সহীহ)
যারা আমাদের অধীনে কাজ করে, তাদের ভুলে আমরা খুব দ্রুত রেগে যাই। এই হাদীস আমাদের উদার হতে শেখায়।
নরম মনের গুণ
আল্লাহ তাআলা নবীজি ﷺ-কে লক্ষ করে বলেছেন, “আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯)
কঠোরতা মানুষকে দূরে সরায়, কোমলতা কাছে টানে। ঘরের ক্ষেত্রেও এই কথা সমানভাবে সত্য।
ঘরে রাগ সামলানো ও ক্ষমার অভ্যাস
- রাগ এলে কথা বলার আগে একটু থামুন। চুপ করে গভীর শ্বাস নিন।
- রাগের সময় বড় সিদ্ধান্ত নেবেন না, বিশেষ করে সম্পর্ক নিয়ে।
- ঝগড়ার মাঝখানে অন্য ঘরে যান, ওযু করুন।
- সন্তান ভুল করলে রাগ কমার পর ক্ষমা করে বুঝিয়ে দিন। বারবার একই ভুলের জন্য খোঁটা দেবেন না।
- স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের ছোট ভুল ক্ষমা করার অভ্যাস করুন।
- আত্মীয়ের সঙ্গে দূরত্ব থাকলে আপনি প্রথম এগিয়ে যান। ক্ষমা করার পর পুরোনো কথা তুলবেন না।
শেষ কথা
রাগ বারবার আসবে, কিন্তু প্রতিবার সংযমের চর্চা করলে একদিন তা সহজ হয়ে যায়। আর যে ক্ষমা করে, সে নিজের মনকে বোঝামুক্ত করে। যে ক্ষমা চায়, সে সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার সুযোগ পায়।
আল্লাহ আমাদের রাগ সংবরণ করার ও ক্ষমা করার তাওফীক দিন। আমীন।
