মদ ও মাদকদ্রব্যের বিধান: কেন ইসলাম এত কঠোর

মাদকাসক্তি আজ প্রায় প্রতিটি পরিবারের ভয়ের নাম। একজন সন্তান নেশায় জড়িয়ে গেলে শুধু তার জীবন নষ্ট হয় না, গোটা পরিবার ভেঙে পড়ে। ইসলাম মদ ও সব ধরনের নেশা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে। এই নিষেধের পেছনের শিক্ষা ও বিধান জানা থাকলে নিজেকে ও সন্তানদের রক্ষা করা সহজ হয়।

ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা

আলেমদের লেখায় এসেছে, কুরআন মদের নিষেধাজ্ঞা কয়েক ধাপে দিয়েছে।

প্রথম ধাপ: আল্লাহ বলেছেন, “তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়।” (সূরা বাকারা, ২:২১৯)

দ্বিতীয় ধাপ: “হে ঈমাণদারগণ! তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাযের ধারে-কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ।” (সূরা নিসা, ৪:৪৩)

চূড়ান্ত ধাপ: “হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য বৈ তো নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শুত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন ও কি নিবৃত্ত হবে?” (সূরা মায়িদা, ৫:৯০-৯১)

আলেমরা বলেন, এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর সাহাবিরা সঙ্গে সঙ্গে মদ ত্যাগ করেছিলেন।

লক্ষ করুন, আয়াতে মদকে বলা হয়েছে “শয়তানের অপবিত্র কার্য”। এর ক্ষতি হিসেবে শত্রুতা, বিদ্বেষ এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নেশা মাত্রই নিষিদ্ধ

ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন, প্রতিটি নেশাজাতীয় জিনিস মদ, আর প্রতিটি নেশাকর বস্তু হারাম। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করে এবং তাওবা না করে মারা যায়, সে আখিরাতে তা থেকে বঞ্চিত হবে। (সহীহ মুসলিম, ২০০৩)

এর মানে, নেশার জিনিসের নাম বদলে যেতে পারে, কিন্তু হুকুম বদলায় না। ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন বা আধুনিক যেকোনো নেশার ক্ষেত্রেও একই বিধান।

নেশার সঙ্গে জড়িত সবাই গুনাহগার

আনাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মদের সঙ্গে জড়িত দশ শ্রেণির মানুষের ওপর লানত করেছেন। এদের মধ্যে আছে যে নিংড়ায়, যার জন্য নিংড়ানো হয়, যে পান করে, যে বহন করে, যার কাছে বহন করে নেওয়া হয়, যে পরিবেশন করে, যে বিক্রি করে, যে এর মূল্য ভোগ করে, যে কেনে এবং যার জন্য কেনা হয়। (জামে তিরমিযী, ১২৯৫; হাদীসটি হাসান)

অর্থাৎ শুধু সেবনকারী নয়, উৎপাদক, ব্যবসায়ী, বাহক ও সরবরাহকারী, সবাই এই সতর্কতার আওতায়।

মাদকের ক্ষতি

আলেম ও গবেষকদের লেখায় মাদকের যেসব ক্ষতি উঠে এসেছে:

  • শারীরিক: মস্তিষ্ক, যকৃৎ ও হৃদযন্ত্রের ক্ষতি।
  • মানসিক: বিচারবুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি নষ্ট হয়।
  • নৈতিক: বিবেক ও আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়।
  • সামাজিক: অপরাধ, সহিংসতা ও পারিবারিক কলহ বাড়ে।
  • আসক্তি: ধীরে ধীরে মানুষকে নিজের দখলে নিয়ে নেয়।

আলেমরা এ কারণে মদকে “উম্মুল খাবায়িস” বা সকল মন্দের উৎস বলেছেন। শরীয়তের মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি হলো বুদ্ধির হেফাজত, আর নেশা সরাসরি তার বিপরীত।

নেশা থেকে ফেরার পথ

যিনি নেশায় জড়িয়ে পড়েছেন, তাঁর জন্য আল্লাহর দরজা বন্ধ নয়। আল্লাহ বলেন, “বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা যুমার, ৩৯:৫৩)

মদ্যপানের বিষয়ে ইবনে উমর (রা.)-এর বর্ণিত হাদীসে তাওবা না করার পরিণতির কথা এসেছে। তার মানে, তাওবা করলে ফিরে আসার পথ খোলা আছে। আসক্ত ব্যক্তির পাশে পরিবারের ধৈর্য, ভালোবাসা ও চিকিৎসা সহায়তা এই ফেরার পথকে সহজ করে।

একই সঙ্গে ঝুঁকির জায়গা

সূরা মায়িদার আয়াতে মদের পাশে জুয়ার কথাও এসেছে। শয়তান দুটির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে শত্রুতা আর বিদ্বেষ ছড়াতে চায়। তাই নেশা ও জুয়ার সঙ্গী, আড্ডা ও জায়গা থেকে দূরে থাকাও বাঁচার একটি উপায়। কেউ যদি সন্তানকে এমন সঙ্গে দেখেন, বকাঝকার আগে বোঝানোর চেষ্টা করুন।

পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব

  • সন্তানদের বন্ধু কারা, তারা কী করে, সে বিষয়ে সচেতন থাকুন।
  • সন্তানের ইন্টারনেট ব্যবহারে খেয়াল রাখুন।
  • ঘরে ধর্মীয় পরিবেশ ও খোলামেলা আলাপের সুযোগ রাখুন, যেন সন্তান সমস্যায় পড়লে আপনার কাছে আসতে পারে।
  • নেশাগ্রস্ত কেউ থাকলে তাকে ঘৃণা না করে চিকিৎসা ও সহযোগিতার ব্যবস্থা করুন।
  • যুবকদের জন্য শিক্ষা, কাজ ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করুন।

রাষ্ট্র ও সমাজের ভূমিকা

আলেমরা মাদক প্রতিরোধে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র, সবার দায়িত্বের কথা বলেছেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কঠোর আইন প্রয়োগ করা, আর যুবসমাজের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির ব্যবস্থা করা। পরিবার ও সমাজ ধর্মীয় অনুশাসনের চর্চা এবং সন্তানের বন্ধু ও অনলাইন কার্যক্রমে নজর রাখার মাধ্যমে এই প্রতিরোধে অংশ নিতে পারে।

শেষ কথা

নেশা একটি ঘরকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। তাই শুরুতেই সতর্ক হওয়া, সন্তানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা আর আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক শক্ত করাই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।

আল্লাহ আমাদের এবং আমাদের সন্তানদের সব ধরনের নেশা থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

Author

মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * চিহ্নিত।