বিয়ের পর প্রথম এক বছর, নতুন সংসারের সুন্দর শুরু
বিয়ের দিনটা হয়তো এক সন্ধ্যার আয়োজন, কিন্তু সংসার গড়ার কাজটা শুরু হয় তার পরের দিন থেকে। দুজন আলাদা মানুষ, আলাদা ঘর, আলাদা অভ্যাস নিয়ে একসাথে পথ চলা শুরু করেন। কেউ সকালে আগে ওঠেন, কেউ রাতে জাগেন বেশি। কেউ কথা বলতে ভালোবাসেন, কেউ চুপচাপ। কারও রান্নায় ঝাল বেশি, কারও কম। এই ছোট ছোট পার্থক্যই প্রথম বছরে সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায়।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো (সূরা নিসা, ৪:১৯)। সদ্ভাব মানে শুধু ঝগড়া না করা নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণে ভালোবাসা আর সম্মান দেখানো। নতুন দম্পতির জন্য তাই কয়েকটি সহজ কথা বলি।
একে অপরকে চেনার সময় দিন
বিয়ের পর হঠাৎ করে সব কিছু মিলে যাবে, এমন আশা করা ঠিক নয়। অনেক দম্পতির ক্ষেত্রে বিয়ের আগে পরিচয় কম থাকে। তাই প্রথম বছরটা আসলে একে অপরকে জানার বছর। কে কী ভালোবাসে, কোন কথায় কষ্ট পায়, কীভাবে রাগ সামলায়, সন্তান নিয়ে কী ভাবে, সব কিছু ধীরে ধীরে জানতে হবে।
সন্ধ্যায় বা রাতে কিছুটা সময় শুধু দুজনের জন্য রাখুন। মোবাইল সরিয়ে রেখে গল্প করুন। নিজের ছোটবেলার কথা বলুন, পরিবারের গল্প করুন, ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা বলুন। এই আলাপগুলোই সম্পর্কের ভিত গড়ে।
অপেক্ষা ও ধৈর্য
কেউ নিখুঁত নয়। আপনি যেমন কিছু ভুল করবেন, আপনার সঙ্গীও করবেন। রান্নায় লবণ বেশি হয়ে গেলে, জামা ঠিকমতো না গোছালে, দেরিতে ফিরলে, এসব নিয়ে রাগ না করে আগে ভাবুন, সে কি ইচ্ছা করে করেছে? নবীজি ﷺ বলেছেন, কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য একটি স্বভাব পছন্দ হবে (মুসলিম, হাদীস ১৪৬৯)।
সঙ্গীর ভালো দিকগুলো খুঁজে বের করুন আর মুখে বলুন। ভালো রান্না হলে প্রশংসা করুন। সংসারের কাজে সাহায্য করলে ধন্যবাদ দিন। প্রশংসা মানুষকে আরও ভালো হতে অনুপ্রাণিত করে।
দুই পরিবারের সাথে সুন্দর সম্পর্ক
বিয়ে শুধু দুজন মানুষের নয়, দুটি পরিবারেরও মিলন। শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ-দেবর, ভাবি, এঁদের সাথে সম্পর্ক সুন্দর রাখা নতুন সংসারের জন্য খুব জরুরি। নতুন বউকে নিজের মেয়ের মতো আপন করে নিন, আর নতুন বউও শ্বশুর-শাশুড়িকে নিজের বাবা-মায়ের মতো সম্মান করুন। প্রথম দিকে কিছু অস্বস্তি থাকবেই। একটু সময় দিন, একটু ধৈর্য ধরুন।
স্বামীর দায়িত্ব হলো মা-বাবা আর স্ত্রীর মাঝে ভারসাম্য রাখা। কারও সামনে অন্যের নিন্দা করবেন না। সমস্যা হলে শান্তভাবে দুজনের কথাই শুনুন। আর স্ত্রী যেন একা হয়ে না পড়েন, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
অর্থ ও খরচ নিয়ে খোলামেলা আলাপ
প্রথম বছরে অনেক দম্পতির ঝগড়ার কারণ হয় টাকাপয়সা। কে কত খরচ করবে, কোথায় জমাবে, বাবা-মাকে কত দেবে, এসব নিয়ে আগে থেকে কথা বলে রাখা ভালো। একটা সাধারণ মাসিক বাজেট বানিয়ে নিন। আয় অনুযায়ী খরচ ঠিক করুন, আর কিছু অংশ সঞ্চয়ের জন্য আলাদা রাখুন। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, যারা খরচ করার সময় অপচয়ও করে না, কৃপণতাও করে না, বরং মাঝামাঝি পথ অবলম্বন করে, তারাই (রহমানের বান্দা) (সূরা ফুরকান, ২৫:৬৭)।
ইবাদতে সঙ্গী হোন
নতুন সংসারের সবচেয়ে সুন্দর অভ্যাসগুলোর একটি হলো একসাথে ইবাদত করা। একসাথে ফজরের নামায পড়া, একসাথে কোরআন তিলাওয়াত করা, রাতে ঘুমানোর আগে দুআ করা। নবীজি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যে রাতে উঠে নামায পড়ে এবং নিজের স্ত্রীকে জাগায়। সে না উঠলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয় (আবু দাউদ, হাদীস ১৩০৮)। যে ঘরে ইবাদতের চর্চা থাকে, সেখানে শান্তি ও বরকত বেশি থাকে।
মতের অমিলকে ভয় পাবেন না
দুজন মানুষের সব কিছুতে মিল থাকবে, এমন আশা করাই ভুল। বরং অমিল থেকেই সংসারে ভারসাম্য আসে। একজন যেখানে বেশি আবেগী, আরেকজন সেখানে ঠান্ডা মাথার। একজন ঝুঁকি নিতে চায়, আরেকজন সাবধানী। এই পার্থক্য যদি একে অপরকে পূর্ণ করে, সংসার আরও শক্ত হয়। তাই মতের অমিল হলে বলুন, “তোমার কথাটা আমি বুঝলাম, এবার আমার কথাটাও শোনো।” জেতার চেয়ে বোঝার চেষ্টাই জরুরি।
নিজের পরিবার আর বন্ধুদের সীমা ঠিক করুন
নতুন সংসারে অনেক সময় ঝামেলা হয় বাইরের মানুষের বেশি হস্তক্ষেপে। বন্ধু, আত্মীয় কিংবা প্রতিবেশীদের সাথে সংসারের ব্যক্তিগত কথা আলোচনা করবেন না। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার কথা আল্লাহর আমানত। ছোটখাটো মনোমালিন্য নিজেরাই মিটিয়ে ফেলুন। বড় কোনো সমস্যা হলে বিশ্বস্ত ও দ্বীনদার কোনো মুরব্বির পরামর্শ নিন, যিনি দুই পক্ষের প্রতি ইনসাফ করবেন।
নিজেদের জন্য ছোট স্মৃতি তৈরি করুন
কাজের চাপে সংসারের ছোট আনন্দগুলো যেন হারিয়ে না যায়। মাসে একবার একসাথে বাইরে খেতে যান। বছরে একবার কোথাও বেড়াতে যান। জন্মদিন বা বিয়ের বার্ষিকীতে ছোট কোনো উপহার দিন। এই স্মৃতিগুলো কঠিন সময়ে আপনাদের শক্তি জোগাবে।
শেষ কথা
প্রথম বছরটা সংসারের ভিত গড়ার সময়। এখন যা শিখবেন, আগামী দিনগুলো তার ওপরই দাঁড়াবে। ভুল হলে ক্ষমা চান, ভালো লাগলে বলুন, কঠিন সময়ে একজন আরেকজনের হাত ধরে থাকুন।
আল্লাহ সব নতুন দম্পতির ঘরে ভালোবাসা, বরকত ও শান্তি দান করুন। আমীন।
