অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করা এবং অন্যের ঘরে উঁকি না দেওয়া
ঘর মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। সেখানে মানুষ কাপড় বদলায়, বিশ্রাম নেয়, পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলে। এই জায়গাটির গোপনীয়তা রক্ষা করা সমাজের শান্তির জন্য অপরিহার্য। ইসলাম তাই কারও ঘরে ঢোকার আগে অনুমতি নেওয়া, সালাম দেওয়া এবং ঘরের ভেতরে উঁকি না দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে। প্রতিবেশীদের মধ্যে যাতায়াত বেশি হয় বলে এই আদব তাঁদের ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
কুরআনের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে প্রবেশ করো না, যে পর্যন্ত আলাপ-পরিচয় না করো এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম না করো। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখো।” (সূরা নূর, ২৪:২৭)
পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে: “যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও, তবে অনুমতি গ্রহণ না করা পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ করো না। যদি তোমাদেরকে বলা হয় ফিরে যাও, তবে ফিরে যাবে। এতে তোমাদের জন্য অনেক পবিত্রতা আছে এবং তোমরা যা করো, আল্লাহ তা ভালোভাবে জানেন।” (সূরা নূর, ২৪:২৮)
এই দুটি আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হয়:
- নিজের বাড়ি ছাড়া অন্য যেকোনো বাড়িতে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হবে।
- ঢোকার আগে সালাম দিতে হবে এবং নিজের পরিচয় জানাতে হবে।
- ঘরে কাউকে না পেলেও অনুমতি ছাড়া ঢোকা যাবে না।
- ফিরে যেতে বললে মন খারাপ না করে ফিরে যাওয়াই সম্মানজনক। এতে উভয় পক্ষের জন্য কল্যাণ ও পবিত্রতা আছে।
প্রবেশের অনুমতি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ঘরের বাসিন্দাদের ইচ্ছার ওপর। তাঁরা না চাইলে কারও অসন্তুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই।
তিনবার অনুমতি চাওয়া
আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন, আবু মুসা আশআরী (রা.) উমর (রা.)-এর কাছে তিনবার অনুমতি চেয়ে অনুমতি না পেয়ে ফিরে এলেন। উমর (রা.) কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, তোমাদের কেউ তিনবার অনুমতি চাইলে যদি অনুমতি না দেওয়া হয়, তাহলে সে যেন ফিরে যায়। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬২৪৫)
অর্থাৎ অনুমতি চাইতে হবে ধীরে-সুস্থে, বিরক্ত না করে। কয়েকবার অপেক্ষা করার পরও সাড়া না এলে ফিরে যাওয়াই আদব। দরজায় বারবার ধাক্কা দেওয়া বা জোরে চেঁচিয়ে ডাকা ঠিক নয়।
দরজায় দাঁড়ানোর আদব
উমর (রা.) যখন আবু মুসা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, কেন ঢুকলে না, তিনি রাসূল ﷺ-এর নির্দেশই শোনালেন। এ থেকে সাহাবিদের আদবের একটি ছবি পাওয়া যায়: তিনবার সালাম দিয়ে অনুমতি চাওয়া, সাড়া না পেলে বিনা অভিযোগে ফিরে যাওয়া। অনুমতির অপেক্ষায় থাকার সময় দৃষ্টি ঘরের ভেতরে নিবদ্ধ না করা সেই আদবেরই স্বাভাবিক অংশ।
ঘরের ভেতরে উঁকি দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
সাহল ইবনে সা’দ (রা.) বর্ণনা করেন, একবার এক লোক নবীজি ﷺ-এর কোনো এক হুজরায় উঁকি দিয়ে তাকাল। তখন নবীজি ﷺ-এর কাছে একটি চিরুনি ছিল, যা দিয়ে তিনি মাথা চুলকাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, যদি আমি জানতাম যে তুমি উঁকি দিচ্ছ, তবে এটি দিয়ে তোমার চোখ ফুঁড়ে দিতাম। তাকানোর জন্যই তো অনুমতি গ্রহণের বিধান দেওয়া হয়েছে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬২৪১)
কুরআনেও গোপন বিষয় খুঁজে বেড়াতে নিষেধ করা হয়েছে: “মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কতক ধারণা গুনাহ। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না।” (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১২) অন্যের ঘরের গোপন বিষয় খুঁজে বেড়ানো এই নিষেধেরই অন্তর্ভুক্ত, তাই অনুমতি না পেলে ফিরে যাওয়াই আদব।
এসব নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, অনুমতি নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য ঘরের ভেতরের গোপনীয়তা রক্ষা। জানালা, দরজার ফাঁক বা বারান্দা দিয়ে অন্যের ঘরের দিকে তাকানো তাই ভয়াবহ অন্যায়। ফ্ল্যাট বাড়ির জীবনে এ কথা মনে রাখা আরও জরুরি, কারণ বারান্দা ও জানালা একে অপরের খুব কাছে থাকে।
সন্তান ও ঘরের কর্মীদের জন্য বিশেষ সময়
ঘরের ভেতরেও গোপনীয়তার কিছু সময় আছে। আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ, তোমাদের দাসদাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে অনুমতি গ্রহণ করে: ফজরের নামাযের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা বস্ত্র খুলে রাখো এবং এশার নামাযের পর। এই তিন সময় তোমাদের দেহ খোলার সময়। এ সময়ের পর তোমাদের ও তাদের জন্য কোনো দোষ নেই।” (সূরা নূর, ২৪:৫৮) আর “তোমাদের সন্তান-সন্ততিরা যখন বয়ঃপ্রাপ্ত হয়, তারাও যেন তাদের পূর্ববর্তীদের ন্যায় অনুমতি চায়।” (সূরা নূর, ২৪:৫৯)
অর্থাৎ বাবা-মায়ের কক্ষেও সন্তানকে অনুমতি নিয়ে ঢোকার শিক্ষা দিতে হবে। এই অভ্যাস ছোটবেলা থেকে গড়ে উঠলে অন্যের ঘরেও সে স্বাভাবিকভাবে এই আদব মানবে।
প্রতিবেশীর ঘরে যাওয়ার আগে কয়েকটি কথা
- দরজায় দাঁড়িয়ে প্রথমে সালাম দিন, পরিচয় দিন।
- অসময়ে, যেমন গভীর রাতে বা বিশ্রামের সময়ে, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া না যাওয়া।
- অনুমতি না পেলে বা ব্যস্ততার কথা জানালে হাসিমুখে বিদায় নেওয়া।
- ভেতরে ঢুকলেও কোথায় বসবেন, কোন ঘরে যাবেন, গৃহকর্তার ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া।
- যা দেখলেন বা শুনলেন, তা অন্যের কাছে বলে না বেড়ানো।
শেষ কথা
অনুমতি চাওয়া সম্মানের প্রকাশ, আর উঁকি না দেওয়া আস্থার সুরক্ষা। যে সমাজে মানুষ একে অপরের ঘরের সীমানা সম্মান করে, সে সমাজে নিরাপত্তাবোধ বাড়ে। আল্লাহ আমাদের গৃহ ও গোপনীয়তার প্রতি যত্নবান হওয়ার তাওফীক দিন।
