গরিব আত্মীয়কে সাহায্য: যে দানে দুই সওয়াব
প্রায় প্রতিটি পরিবারে এমন কেউ থাকেন, যাঁর অবস্থা অন্যদের চেয়ে একটু কঠিন। হয়তো কোনো ভাই চাকরি হারিয়েছেন, কোনো বোন বিধবা হয়েছেন, কিংবা কোনো চাচার সংসার চলছে টেনেটুনে। এই মানুষদের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের শিক্ষা, আর এতে আছে দ্বিগুণ প্রতিদানের সুসংবাদ।
কুরআনের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আত্মীয়-স্বজনকে তার প্রাপ্য দাও, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও, এবং কিছুতেই অপচয় করো না (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৬)। এখানে “প্রাপ্য” শব্দটি লক্ষণীয়। অর্থাৎ আত্মীয়কে যা দেওয়া হয়, তা দয়া নয়, তাঁর হকের অংশ।
আল্লাহ আরও বলেছেন, কী খরচ করবে, তা জিজ্ঞেস করলে বলো, যে সম্পদই তোমরা খরচ করো, তা মা-বাবা, আত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য (সূরা বাকারা, ২:২১৫)। এখানেও মা-বাবার পরেই আত্মীয়দের কথা এসেছে।
সূরা বাকারার আরেক আয়াতে সত্যিকারের নেককাজের বর্ণনায় বলা হয়েছে, আল্লাহর মহব্বতে প্রিয় সম্পদ থেকে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতিম, মিসকিন, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী এবং দাসমুক্তির জন্য ব্যয় করা (সূরা বাকারা, ২:১৭৭)। এখানে আত্মীয়-স্বজনের কথা সবার আগে এসেছে।
দ্বিগুণ সওয়াবের হাদীস
সালমান ইবনে আমের (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মিসকিনকে সদকা দিলে তা কেবল সদকা। আর আত্মীয়কে দিলে তা দুটো, সদকা এবং আত্মীয়তার হক আদায় (সুনানে নাসাঈ, হাদীস ২৫৮২)।
দানের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগার সওয়াব, এ যেন এক ঢিলে দুই পাখি। তাই যাকাত বা সদকা দেওয়ার সময় আগে নিজের অভাবী আত্মীয়দের কথা ভাবা ভালো।
সামর্থ্য যত বেশি, দায়িত্ব তত বেশি
আত্মীয়দের মধ্যে যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁদের দায়িত্ব বেশি। আত্মীয় অভাবগ্রস্ত বা ঋণগ্রস্ত হলে তাঁর পাশে দাঁড়ানো কর্তব্য। আর এই আমলের প্রতিদান শুধু আখিরাতে নয়, দুনিয়াতেও শুরু হয়। নবীজি ﷺ বলেছেন, যে চায় তার রিযিক প্রশস্ত হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে (সহীহ বুখারী, হাদীস ২০৬৭)। অর্থাৎ আত্মীয়কে সাহায্য করলে সম্পদ কমে না, বরং বরকত আসে।
কীভাবে বুঝবেন কার সাহায্য দরকার
অনেক অভাবী আত্মীয় মুখ ফুটে কিছু বলেন না। তাঁদের অবস্থা বোঝা যায় ছোট ছোট লক্ষণে। বাড়িতে আগের মতো বাজার হয় না, বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ, অসুখ হলেও চিকিৎসা হচ্ছে না, কিংবা উৎসবে তাঁরা আসেন না। এসব দেখলে সরাসরি প্রশ্ন না করে সুন্দরভাবে খোঁজ নিন। মায়ের কাছে, ভাইয়ের কাছে বা অন্য কোনো আত্মীয়ের কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন। তারপর প্রয়োজন বুঝে সাহায্য করুন। পুরো পরিবার মিলে একটি ছোট তহবিল করেও কঠিন সময়ে একজনকে সাহায্য করা যায়। এতে একজনের ওপর বোঝা পড়ে না।
যাকাত কাদের দেওয়া যায়, কাদের যায় না
যাকাত ও সদকার মধ্যে পার্থক্য আছে। যাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে আলেমগণ এভাবে জানিয়েছেন:
- যাকাতের হকদার হলে ভাই-বোন, চাচা-চাচি, মামা-মামি, খালা-খালু, ফুফু-ফুফা এবং শ্বশুর-শাশুড়িকে যাকাত দেওয়া বৈধ। এঁদের মধ্যে কেউ অভাবী হলে যাকাত দেওয়া উত্তম, কারণ তাতে যাকাত ও আত্মীয়তার হক, দুটিই আদায় হয়।
- বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং তাঁদের ওপরের পুরুষদের যাকাত দেওয়া যায় না।
- ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি এবং তাঁদের নিচের প্রজন্মকেও যাকাত দেওয়া যায় না।
- স্বামী স্ত্রীকে এবং স্ত্রী স্বামীকে যাকাত দিতে পারেন না।
যাঁদের যাকাত দেওয়া যায় না, তাঁরা অভাবী হলেও তাঁদের ভরণপোষণ নিজের সাধারণ সম্পদ থেকে দেওয়া দায়িত্ব। যাকাতের বিস্তারিত নিয়ম জানতে আপনার এলাকার নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতি সাহেবের কাছে জিজ্ঞেস করে নিন।
সাহায্য করার সুন্দর উপায়
- সম্মান বজায় রেখে দিন। সবার সামনে বা ঘটা করে নয়। গোপনে, বিনয়ের সঙ্গে দিন।
- খোঁচা দেবেন না। পরে কথায় কথায় সাহায্যের কথা তুললে দানের সুন্দর ভাবটাই নষ্ট হয়ে যায়।
- প্রয়োজন বুঝে দিন। অনেক সময় টাকার চেয়ে বাজার, বাচ্চাদের স্কুলের খরচ বা ওষুধ বেশি কাজে লাগে।
- কাজ খুঁজে দিতে সাহায্য করুন। যিনি সামর্থ্য রাখেন, তাঁকে কাজ বা প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেওয়া স্থায়ী সাহায্য।
- নিয়মিত খোঁজ নিন। একবার সাহায্য করেই ভুলে না গিয়ে মাঝে মাঝে কথা বলুন।
যাঁরা সাহায্য নেন, তাঁদের জন্য
সাহায্য নেওয়া লজ্জার নয়, বিশেষ করে যখন সত্যিই প্রয়োজন। তবে প্রয়োজন কেটে গেলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা এবং দাতার জন্য দোয়া করা ভালো আচরণ।
সাধ্যের মধ্যে থাকা
সাহায্য করতে গিয়ে নিজের সংসার যেন বিপদে না পড়ে। নিজের পরিবারের খরচ আগে। আয়াতে “অপচয় করো না” কথাটিও তাই এসেছে। যা সম্ভব, তা-ই করুন।
সাহায্যের পাশাপাশি সম্পর্ক
অনেক সময় আমরা টাকা দিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করি। অথচ অভাবী আত্মীয়ের দরকার শুধু টাকা নয়, একটু সম্মান আর একটু সঙ্গও। ঈদে বা কোনো অনুষ্ঠানে তাঁকে ডাকুন, তাঁর সন্তানদের জন্য কিছু উপহার রাখুন, তাঁর কথা শুনুন। এতে তিনি নিজেকে একা মনে করেন না। হাদীসেও আত্মীয়কে দানের ফযীলতের কারণ এই যে, এতে সদকা ও আত্মীয়তার হক একসঙ্গে আদায় হয়।
শেষ কথা
আপনার আত্মীয়দের মধ্যে কে কঠিন সময় পার করছেন, একটু ভেবে দেখুন। আজই তাঁর খোঁজ নিন। আল্লাহ আমাদের হাত প্রসারিত করার তাওফীক দিন। আমীন।
