মেয়েকে “পরের ঘরের” ভাবা: ইসলাম মেয়ের কী মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে
“মেয়ে তো পরের ঘরে চলে যাবে”, এই কথাটা আমরা বহুবার শুনেছি। এই ভাবনা থেকেই কখনো মেয়ের পড়াশোনা, যত্ন বা অধিকার নিয়ে অবহেলা তৈরি হয়। আবার বিয়ের পর মেয়ের স্বামীর ঘরেও নানা দাবি আর প্রথার চাপ আসে। ইসলাম কন্যাসন্তান ও নারীকে কী মর্যাদা দিয়েছে, তা প্রথম আলোর দুটি লেখা ও হাদীস-কুরআনের আলোকে দেখা যাক।
জাহেলি যুগের মানসিকতা ও কুরআনের নিন্দা
প্রথম আলোর “কন্যাসন্তান: ইসলাম যা বদলে দিয়েছে” লেখাটি মনে করিয়ে দেয়, আরব সমাজে কন্যাসন্তানের জন্ম লজ্জার বিষয় ছিল। কুরআন সেই চিত্র এঁকেছে: “যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেয়া হয়, তখন তারা মুখ কাল হয়ে যায় এবং অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে।” (সূরা নাহল, ১৬:৫৮)। পরের আয়াতে আছে, “তাকে শোনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে মুখ লুকিয়ে থাকে। সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে থাকতে দেবে, না তাকে মাটির নীচে পুতে ফেলবে। শুনে রাখ, তাদের ফয়সালা খুবই নিকৃষ্ট।” (সূরা নাহল, ১৬:৫৯)।
কেয়ামতের দিন জীবন্ত পুঁতে ফেলা কন্যার প্রসঙ্গে কুরআন বলে, “যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে, কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হল?” (সূরা তাকভীর, ৮১:৮-৯)। লেখাটি ইমাম কুরতুবির তাফসিরের উদ্ধৃতিতে বলেছে, প্রশ্নটি হত্যাকারীকে নয়, নিহতকে করা হবে, যা এক তীব্র বক্তব্য।
আজ আমরা কন্যাসন্তানকে মেরে ফেলি না, কিন্তু “পরের ঘরের” ভাবনায় তার প্রতি অবহেলা করলে একই মানসিকতার ছায়া থেকে যায়। সন্তান দান আল্লাহর ইচ্ছা: “তিনি যা ইচ্ছা, সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা-সন্তান এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন।” (সূরা শূরা, ৪২:৪৯)।
কন্যা লালন-পালনের মর্যাদা
আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি এই কন্যাদের দায়িত্বে পরীক্ষিত হয় এবং তাদের সঙ্গে উদারভাবে আচরণ করে, তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে ঢাল হবে (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৯৫)।
আয়েশা (রাঃ)-এর আরেকটি বর্ণনায় আছে, নবীজি ﷺ বলেছেন, কন্যাসন্তানের কোনো পরীক্ষায় পড়ে যে তাদের ব্যাপারে ধৈর্য ধরে, তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুনের আড়াল হবে (জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯১৩)। প্রথম আলোর অপর লেখাটি এ ধরনের আরও কয়েকটি হাদীস উল্লেখ করেছে (যেমন তিনটি কন্যা বা বোনের প্রতি সদাচার, মুসনাদে আহমাদ ও আদাবুল মুফরাদের সূত্রে)। সেগুলো মূল সংকলনে মিলিয়ে দেখা হয়নি বলে এখানে বিস্তারিত দেওয়া হলো না।
আনাস (রাঃ)-এর সূত্রে সহীহ মুসলিমে আছে, যে ব্যক্তি দুটি কন্যাকে ভালোভাবে লালন-পালন করে প্রাপ্তবয়স্ক করে, কিয়ামতের দিন সে ও নবীজি ﷺ কাছাকাছি থাকবেন (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৩১)। প্রথম আলোর লেখাটি বলেছে, নবীজি এ কথা বোঝাতে দুই আঙুল একসঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়েছিলেন।
লেখাটি আরও বলেছে, বিয়ের আগ পর্যন্ত কন্যার ভরণপোষণ পিতার দায়িত্ব। ইবনে কুদামা (আল-মুগনি, ৮/১৬৯) এই দায়িত্বকে ঐচ্ছিক নয়, বাধ্যতামূলক বলেছেন।
“ধরে” নয়, অধিকারসহ
প্রথম আলোর দুটি লেখা মিলিয়ে দেখা যায়, কন্যার কিছু অধিকার ইসলাম স্পষ্ট করে দিয়েছে:
১. উত্তরাধিকার। “পিতা-মাতা ও আত্নীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্নীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; অল্প হোক কিংবা বেশী। এ অংশ নির্ধারিত।” (সূরা নিসা, ৪:৭)। লেখাটি আল-হিদায়া (৪/৪৮৫) থেকে উদ্ধৃত করেছে, জোর করে অংশ লিখিয়ে নেওয়া বা বঞ্চিত করা শরিয়তের দৃষ্টিতে বাতিল।
২. বিয়েতে সম্মতি। ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, এক কুমারী মেয়ে নবীজি ﷺ-এর কাছে এসে জানাল, তার অসম্মতিতে তার বাবা তাকে বিয়ে দিয়েছেন (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২০৯৬)। লেখাটির বর্ণনা অনুযায়ী নবীজি তাকে বিয়ে বহাল রাখা বা বাতিল করার অধিকার দিয়েছিলেন।
৩. মোহর। “আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশীমনে।” (সূরা নিসা, ৪:৪)। লেখাটি ইবনে আবিদিনের (রদ্দুল মুহতার, ৩/১০২) উদ্ধৃতিতে বলেছে, মোহরের ওপর অভিভাবকের কোনো আইনগত দাবি নেই।
বিয়ের পর
বিয়ের পর মেয়ে স্বামীর ঘরে গেলেও তার মর্যাদা বা অধিকার কমে না। কুরআনের নির্দেশ হলো, “নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর।” (সূরা নিসা, ৪:১৯)। একই আয়াতের আগের অংশে বলা হয়েছে, বলপূর্বক নারীদের উত্তরাধিকারে গ্রহণ করা হালাল নয় এবং তাদের আটকে রেখে তাদের দেওয়া কিছু অংশ নিয়ে নেওয়াও ঠিক নয়। অন্য আয়াতে মোহরের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “নারীরা তোমাদের কাছে থেকে সুদৃঢ় অঙ্গীকার গ্রহণ করেছে।” (সূরা নিসা, ৪:২১)।
এই নির্দেশগুলোর আলোকে বলা যায়, মেয়ের ওপর অন্যায় দাবি চাপানো, মোহর বা সম্পত্তির অংশ আত্মসাৎ করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে মেলে না। প্রথম আলোর লেখাটির মূল বক্তব্যও তাই: উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চনা, জোরপূর্বক বিয়ে ও মোহর আত্মসাতের মতো ঘটনা অনেক মুসলিম পরিবারে এখনো ঘটে। প্রশ্নটি তাই ধর্মের নয়, চর্চার।
পরিবারের জন্য করণীয়
- মেয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যত্নে ছেলের মতোই মনোযোগ দিন।
- “মেয়ে পরের ঘরে যাবে” কথাটি এমনভাবে বলবেন না, যাতে সে নিজেকে বোঝা ভাবে।
- বিয়ের সময় মেয়ের মত জানুন, তার মোহর ও অধিকার তার হাতে রাখুন।
- সম্পত্তিতে তার ন্যায্য অংশ বঞ্চিত করবেন না।
- বিয়ের পর যৌতুক বা উপহারের চাপ দেবেন না, আর মেয়ের স্বামীর ঘরেও তার মর্যাদা রক্ষায় পাশে থাকুন।
কন্যাসন্তান আল্লাহর রহমত ও পরীক্ষা, দুটোই। যারা তাকে সম্মানের সঙ্গে লালন করে, তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে বিরাট সুসংবাদ।
