তারবিয়াত কী এবং সন্তান গড়ায় মা ও বাবার ভূমিকা
তারবিয়াত কাকে বলে: সন্তান গড়ার সঠিক ধারণা
আমরা সন্তানের পড়াশোনা, খাবার, পোশাক নিয়ে খুব ভাবি। কিন্তু তাকে মানুষ করে গড়ে তোলার আসল কাজটি কী, তা অনেক সময় অস্পষ্ট থাকে। ইসলামের পরিভাষায় এই কাজটির নাম তারবিয়াত।
তারবিয়াত মানে কী
তারবিয়াত অর্থ লালন-পালন ও গড়ে তোলা। এটি শুধু শারীরিক যত্ন নয়। এর মধ্যে আছে শিশুর ঈমান, চরিত্র, আচরণ, অভ্যাস ও চিন্তার বিকাশ। সন্তানকে এমনভাবে বড় করা, যাতে সে আল্লাহকে চেনে, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে এবং দায়িত্বশীল হয়।
কুরআনের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন, “মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।” (সূরা তাহরীম, ৬৬:৬)। এই আয়াত বাবা-মায়ের ওপর সন্তানের দ্বীন ও চরিত্রের দায়িত্ব দেয়।
হাদীসের দায়িত্ব
নবীজি ﷺ বলেছেন, “তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল। নারী তার স্বামীর ঘর ও সন্তানের দায়িত্বশীল।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪০৯)। সন্তান একটি আমানত। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, আমানতের কেমন হক আদায় করেছি।
তারবিয়াতের চারটি স্তম্ভ
১. ভালোবাসা। শিশু আদর ও নিরাপত্তা না পেলে শেখার জন্য মন খোলে না।
২. আদর্শ। শিশু যা দেখে, তা-ই শেখে। মা-বাবার কথা ও কাজের মিল শিশুর সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
৩. শিক্ষা। ঈমান, আদব, নামায, কুরআন ও জীবনের সহজ দক্ষতা ধীরে ধীরে শেখানো।
৪. দোয়া। চেষ্টার পর আল্লাহর কাছে সন্তানের হেদায়েত চাওয়া।
যেসব ভুল ধারণা
- “সন্তান বড় হলে নিজেই শিখবে।” অভ্যাস শৈশবেই গড়ে ওঠে।
- “স্কুল-মাদ্রাসাই তারবিয়াতের জন্য যথেষ্ট।” প্রতিষ্ঠান সহায়তা করে, মূল ভিত্তি ঘরেই তৈরি হয়।
- “কড়া শাসনই একমাত্র পথ।” ভালোবাসা ছাড়া কড়াকড়ি উল্টো ফল দেয়।
- “খাবার-পোশাক দিয়েছি, আর কী লাগে?” এটি দায়িত্বের অর্ধেকও নয়।
আজই শুরু করার তিনটি কাজ
- প্রতিদিন সন্তানের সঙ্গে অন্তত পনেরো মিনিট মন দিয়ে সময় কাটান।
- নিজের আচরণে একটি বিষয় বদলান, যা আপনি সন্তানের মধ্যে দেখতে চান।
- প্রতিদিন সন্তানের জন্য দোয়া করুন।
সন্তানের প্রথম শিক্ষক মা
ইসলাম মাকে কী দায়িত্ব দিয়েছে
নবীজি ﷺ বলেছেন, নারী তার স্বামীর ঘর ও সন্তানের দায়িত্বশীল, আর এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪০৯)। এর সঙ্গে সঙ্গেই ইসলাম মায়ের মর্যাদাও সবচেয়ে বেশি দিয়েছে। সন্তানের সদাচরণের সবচেয়ে বেশি হকদার কে, এ প্রশ্নে নবীজি তিনবার বলেছেন, তোমার মা (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৪৮)।
মায়ের হাতে যে শিক্ষাগুলো
১. আল্লাহর পরিচয়। আকাশ, গাছ, বৃষ্টি, ফল দেখিয়ে “এসব আল্লাহ বানিয়েছেন” বলার মতো সহজ কথা দিয়েই শুরু।
২. ছোট ছোট দোয়া। খাওয়ার আগে “বিসমিল্লাহ”, ঘুমানোর আগে দোয়া, সালাম দেওয়া।
৩. সত্য ও সততা। মা সত্য কথা বললে সন্তানও শেখে।
৪. আদব। বড়দের সম্মান, ভাইবোনের প্রতি দয়া, অন্যের জিনিস না নেওয়া।
৫. আবেগ সামলানো। রাগ, কান্না, হিংসা মোকাবিলায় মায়ের কাছ থেকে শিশু শেখে।
ছোট পদ্ধতি, বড় ফল
- গল্প বলা। নবীদের গল্প, সাহাবিদের গল্প, ঘুমের আগে।
- একসঙ্গে ইবাদত। মা নামায পড়লে সন্তান পাশে এসে দাঁড়ায়।
- কথা বলা। সন্তান কী ভাবছে, কী ভয় পাচ্ছে, তা জানা।
- প্রশংসা ও সংশোধন। ভালো কাজে উৎসাহ, ভুলে কোমল সংশোধন।
ব্যস্ত মায়ের জন্য
কর্মজীবী মা বা সংসারের কাজে ব্যস্ত মা অনেক সময় অপরাধবোধে ভোগেন। মনে রাখবেন, সময়ের পরিমাণ নয়, মনোযোগের গভীরতাই আসল। প্রতিদিন কয়েক মিনিট মন দিয়ে সন্তানের সঙ্গে সময় কাটালে তার ছাপ পড়ে।
বাবা-মা মিলে
মা একা নন। বাবা ও পরিবারের বড়দের সহযোগিতা পেলে মা আরও ভালোভাবে তারবিয়াত দিতে পারেন। মায়ের কাজের মূল্য দেওয়া ও তাঁকে সম্মান জানানো সংসারের সবার দায়িত্ব।
সন্তানের তারবিয়াতে বাবার ভূমিকা
কুরআন ও হাদীসের দায়িত্ব
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।” (সূরা তাহরীম, ৬৬:৬)। নবীজি ﷺ বলেছেন, “পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল এবং তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪০৯)।
লুকমান (আঃ) থেকে শিক্ষা
কুরআনে লুকমান হাকীম তাঁর ছেলেকে যে উপদেশ দিয়েছেন, তা বাবার তারবিয়াতের একটি সুন্দর নমুনা (সূরা লুকমান, ৩১:১৩-১৯)। তিনি বলেছিলেন:
- আল্লাহর সঙ্গে শরীক করো না।
- নামায কায়েম করো।
- ভালো কাজের আদেশ দাও, মন্দ থেকে নিষেধ করো।
- বিপদে ধৈর্য ধরো।
- অহংকার করে মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না।
- চলনে মধ্যপন্থা রাখো, কণ্ঠস্বর নিচু রাখো।
লক্ষ করার বিষয়, তিনি “বৎস” বলে স্নেহের সঙ্গে ডেকেছেন।
বাবা কী করতে পারেন
১. সময় দেওয়া। প্রতিদিন কিছু সময় শুধু সন্তানের জন্য রাখুন। ছুটির দিনে একসঙ্গে বাইরে যান, খেলুন।
২. নামাযে সঙ্গে নেওয়া। ছেলেদের মসজিদে নিয়ে যাওয়া, মেয়েদের সঙ্গে ঘরে একসঙ্গে নামায পড়া।
৩. আদর্শ হওয়া। বাবার সততা, ধৈর্য ও আমল সন্তানের সবচেয়ে বড় শিক্ষক।
৪. সিদ্ধান্তে অংশ নেওয়া। সন্তানের শিক্ষা, বন্ধু ও অভ্যাস নিয়ে নজর রাখা।
৫. মায়ের সম্মান। সন্তানের সামনে স্ত্রীর প্রতি সম্মান দেখানো।
৬. স্নেহ প্রকাশ। কোলে নেওয়া, মাথায় হাত রাখা, আদর করা।
সতর্কতা
কড়া শাসন আর কোনো ভালোবাসা না, এমন বাবা সন্তানের কাছ থেকে দূরে সরে যান। আবার সবকিছুতে প্রশ্রয় দিলে সন্তান সীমা শেখে না। ভালোবাসা ও শৃঙ্খলার মধ্যপথ বেছে নিন।
প্রবাসী বা ব্যস্ত বাবা
দূরে থাকলেও ফোনে নিয়মিত কথা বলুন। সন্তানের পড়া, দিনের খবর জিজ্ঞেস করুন। তার জন্য দোয়া করুন।
যে বাবা সন্তানের কাছে আদর্শ ও ভরসার ঠিকানা হন, তিনি দুনিয়া ও আখিরাতে সবচেয়ে বড় সম্পদ রেখে যান।
