শিশুকে ভালোবাসা, নবীজি ﷺ-এর আচরণ ও সত্য বলার অভ্যাস
শিশুকে ভালোবাসা প্রকাশ করা: মুখে বলুন, স্পর্শে জানান
আমরা সন্তানকে ভালোবাসি, সেটা সবাই জানে। কিন্তু সন্তান কি জানে? অনেক বাবা-মা শিশুকে খাওয়ান, পড়ান, পোশাক কিনে দেন, অথচ একটি মিষ্টি কথা বা আদর সারা মাসে কয়েকবারও করেন না।
ভালোবাসা প্রকাশ কেন জরুরি
শিশু বুঝতে চায় তার জায়গা কোথায়। মা-বাবার স্নেহের স্পর্শ, কোমল কথা ও হাসিমুখ শিশুর ভেতরে নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে দেয়। যে শিশু ভালোবাসা পায়, সে সহজে নিজেকে সংশোধন করে।
নবীজি ﷺ বলেছেন, “যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৯৭)। সন্তানের প্রতি দয়া এই নীতির প্রথম প্রয়োগক্ষেত্র।
ভালোবাসা প্রকাশের কয়েকটি সহজ উপায়
১. মুখে বলা। “আমি তোমাকে ভালোবাসি”, “তোমাকে নিয়ে আমি গর্বিত”, “তুমি আমার চোখের শীতলতা।” এই কথাগুলো শিশুর মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে।
২. আদর ও স্পর্শ। মাথায় হাত বুলানো, কোলে নেওয়া, জড়িয়ে ধরা।
৩. চোখে চোখ রেখে কথা শোনা। ফোন বা কাজ সরিয়ে শিশুর কথা শোনা।
৪. একান্ত সময়। প্রতিদিন কিছুক্ষণ শুধু সন্তানের সঙ্গে গল্প, খেলা বা হাঁটা।
৫. ছোট চিঠি বা বার্তা। টিফিন বাক্সে একটি লেখা, “তোমার জন্য দোয়া করছি।”
৬. দোয়া। সন্তানের সামনে তার জন্য দোয়া করা।
ভালোবাসা আর প্রশ্রয় এক নয়
ভালোবাসা মানে সব আবদার মেনে নেওয়া নয়। ভালোবাসা মানে তার কল্যাণ চাওয়া। সঠিক শাসন ভালোবাসারই অংশ, যদি তা স্নেহ ও সম্মানের সঙ্গে হয়।
ভাইবোনের মধ্যে সমতা
প্রত্যেক সন্তানকে আলাদা করে সময় ও ভালোবাসা দিন। একজনকে বেশি আদর করলে অন্যদের মনে অভিমান জন্মায়।
ব্যস্ততার মধ্যেও
ব্যস্ত দিনেও সন্তান ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটি আদর, একটি দোয়া ও “আজ কেমন কাটল?” জিজ্ঞেস করা সম্ভব। এই ছোট অভ্যাস অনেক বড় ফল দেয়।
শিশুদের সঙ্গে নবীজি ﷺ-এর আচরণ
স্নেহ ও দয়া
নবীজি ﷺ বলেছেন, “যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৯৭)।
আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, এক বেদুইন নবীজির কাছে এসে বলল, লোকেরা তাদের ছেলেদের চুমু দেয়, আমরা তো দিই না। নবীজি বললেন, “আল্লাহ তোমার অন্তর থেকে দয়া তুলে নিলে আমি কী করতে পারি?” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৯৮)। ইমাম বুখারী এই হাদীসটি রেখেছেন “শিশুদের প্রতি দয়া করা ও তাদের জড়িয়ে ধরা” অধ্যায়ে।
নামাযের মধ্যেও শিশুর যত্ন
আবু কাতাদা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ তাঁর নাতনি উমামা বিনতে যায়নাবকে কাঁধে নিয়ে নামায পড়তেন। সিজদায় গেলে তাকে নামিয়ে রাখতেন আর দাঁড়ালে আবার তুলে নিতেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫১৬)। শিশুর প্রতি এমন কোমলতা অনন্য।
সালাম ও সম্মান
আনাস (রাঃ) একদল শিশুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দিলেন এবং বললেন, নবীজি ﷺ এমনই করতেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬২৪৭)। ইমাম বুখারী এই হাদীসের অধ্যায়ের নাম রেখেছেন “শিশুদের সালাম দেওয়া”। এতে শিশুরা সম্মান ও আত্মবিশ্বাস পায়।
ধৈর্য ও ভুলে সংশোধন
আনাস (রাঃ) দশ বছর নবীজির সেবা করেছেন। তিনি বলেছেন, নবীজি কখনো আমাকে “উফ” বলেননি এবং কোনো কাজ করলে “কেন করলে” বা না করলে “কেন করোনি” বলে ধমক দেননি (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০৩৮)। এটি ধৈর্যের এক অসাধারণ উদাহরণ।
আমাদের জন্য শিক্ষা
- শিশুকে চুমু ও আদর করতে লজ্জা পাবেন না।
- শিশুকে সালাম দিন, তার নাম ধরে ডাকুন।
- ধৈর্য ধরুন, ভুলে কোমল হোন।
- তার কথা মন দিয়ে শুনুন।
- তাকে দায়িত্ব ও আত্মবিশ্বাস দিন।
শিশুকে সত্য বলার অভ্যাস শেখানো
সত্যের মর্যাদা
নবীজি ﷺ বলেছেন, “সত্য নেকির পথ দেখায়, আর নেকি জান্নাতে নিয়ে যায়। মানুষ সত্য বলতে বলতে আল্লাহর কাছে সত্যবাদী হিসেবে লিখিত হয়। আর মিথ্যা পাপের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপ জাহান্নামে নিয়ে যায়।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০৯৪)।
শিশু কেন মিথ্যা বলে
- শাস্তির ভয়ে।
- কল্পনা ও খেলার ঘোরে।
- মা-বাবাকে খুশি করতে।
- নিজের ভুল লুকোতে।
- অন্যদের মিথ্যা বলতে দেখে।
মা-বাবার করণীয়
১. নিজেরা সত্য বলুন। “বাবা বাড়িতে নেই বলো”, এ ধরনের ছোট মিথ্যাও শিশু ধরে ফেলে এবং শেখে।
২. সত্য বলার জন্য পুরস্কার দিন। ভুল স্বীকার করলে ধমক নয়, বরং বলুন, “সত্য বলেছ বলে আমি খুশি।” তারপর ভুলটি শান্তভাবে ঠিক করুন।
৩. প্রতিশ্রুতি রাখুন। আবদুল্লাহ ইবনে আমের (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ তাঁর মাকে বলেছিলেন, “তুমি কি ওকে কিছু দিতে চেয়েছিলে?” মা বললেন, খেজুর দিতে চেয়েছিলাম। নবীজি বললেন, “তুমি কিছু না দিলে তোমার নামে একটি মিথ্যা লেখা হতো।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৯১)। শিশুকে ভুলিয়ে রাখতে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেবেন না।
৪. সত্যবাদীদের গল্প বলুন। সত্যবাদিতার গুণের কথা গল্পের মতো করে শোনান।
৫. ভয় না দেখিয়ে আস্থা দিন। “সত্য বললে তুমি বিপদে পড়বে না। আমি তোমার পাশে আছি।”
মিথ্যা ধরা পড়লে কী করবেন
- রাগে চিৎকার না করে শান্ত থাকুন।
- সত্য বলার সুযোগ দিন, “তুমি কি আবার ভেবে বলবে?”
- ভুলের ফল বুঝিয়ে দিন।
- পুনরাবৃত্তি হলে সহজ ও যুক্তিসংগত পরিণতি ঠিক করুন, অপমান নয়।
বয়স অনুযায়ী পার্থক্য
ছোট শিশু কল্পনা ও বাস্তব গুলিয়ে ফেলে। তাকে আস্তে আস্তে পার্থক্য বুঝিয়ে দিন। বড় শিশুর ক্ষেত্রে কারণ খুঁজুন, সে কীসের ভয়ে মিথ্যা বলছে।
সত্যবাদী সন্তান মা-বাবার আস্থা, সমাজের আস্থা এবং আল্লাহর ভালোবাসা পায়। এই অভ্যাসটি গড়ে তোলার জন্য শৈশবই সবচেয়ে ভালো সময়।
