বিদআত তালাক: এর ক্ষতি ও পরিণতি ও এক, দুই ও তিন তালাকের হুকুম
আমাদের সমাজে তালাক বলতে অনেকে বোঝেন এক নিঃশ্বাসে তিনবার “তালাক” বলা। অথচ এটাই সবচেয়ে ক্ষতিকর ও ভুল পদ্ধতি। একে বলা হয় বিদআত তালাক, অর্থাৎ শরীয়তের শেখানো পথের বাইরের তালাক।
বিদআত তালাক কী
হানাফী ফিকহের গ্রন্থগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী বিদআত তালাক হলো:
- একই বাক্যে বা একই বৈঠকে তিন তালাক দেওয়া
- এক পবিত্রতার সময়ে একাধিক তালাক দেওয়া
- সহবাসের পর একই পবিত্রতার সময় তালাক দেওয়া
- হায়েযের সময় তালাক দেওয়া
হুকুম: কার্যকর হলেও গুনাহ
সাউথ আফ্রিকার দারুল উলূম আবুবকরের মুফতি সিরাজ দেসাই লিখেছেন, এসব তালাক গুনাহের কাজ, কিন্তু তালাক কার্যকর হয়ে যায় এবং স্ত্রী আর স্ত্রী থাকেন না। তাই এই কাজে দুই দিক দিয়ে ক্ষতি। একদিকে আল্লাহর অবাধ্যতার গুনাহ, অন্যদিকে সংসার ভেঙে যাওয়ার বাস্তব ক্ষতি।
নবীজি ﷺ-এর অসন্তোষ
এক ব্যক্তি এক সঙ্গে তিন তালাক দিয়েছিলেন, এই খবর পেয়ে নবীজি ﷺ রেগে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, “আমি তোমাদের মাঝে থাকতেই আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা করা হচ্ছে?” (সুনানে নাসায়ী, হাদীস ৩৪০১)। এক সাহাবি এমনকি জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি লোকটাকে হত্যা করব না? এই ঘটনা দেখায়, এক সঙ্গে তিন তালাক দেওয়া কতটা অপছন্দনীয়। (এই বর্ণনার সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে এই কাজ যে অনুচিত, সে বিষয়ে আলেমদের সবার ঐকমত্য আছে।)
বিদআত তালাকে কী ক্ষতি হয়
- ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়। তিন তালাক একসঙ্গে পড়ে গেলে স্বামী আর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন না। আবার একসঙ্গে থাকতে চাইলেও সরাসরি বিয়ে করা যায় না (সূরা বাকারা, আয়াত ২৩০)।
- পরে আফসোস, লজ্জা আর টানাপোড়েন তৈরি হয়।
- অনেকে তখন অনিয়মিত উপায় খোঁজেন, যেমন হিল্লা বিয়ে, যা আরও বড় গুনাহ।
- সন্তান ও দুই পরিবারের ক্ষতি হয়।
কী করা উচিত
প্রথমত, তালাকের শব্দ মুখে আনার আগে ভাবুন। দ্বিতীয়ত, যদি সত্যিই প্রয়োজন হয়, তবে আহসান পদ্ধতিতে এক তালাক দিন। অনলাইনে অল্প তথ্যে ফতোয়া নেওয়া ঠিক নয়, কারণ শব্দ, সময় ও অবস্থার ছোট পার্থক্যেও হুকুম বদলে যায়।
উপসংহার
তালাকের শব্দ কোনো খেলার জিনিস নয়। আল্লাহর দেওয়া নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজের জীবনকে জটিল করার চেয়ে নিয়ম মেনে চলাই নিরাপদ।
এক, দুই ও তিন তালাকের হুকুম
তালাকের সংখ্যা অনুযায়ী বিধানও আলাদা। এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি দেখা যায়। হানাফী মাযহাবের নির্ভরযোগ্য ফতোয়া অনুযায়ী এখানে মূল কথাগুলো সাজিয়ে দেওয়া হলো।
এক তালাক (রাজয়ী)
স্পষ্ট শব্দে, যেমন “তোমাকে তালাক দিলাম”, এক তালাক দিলে তা রাজয়ী তালাক হয়। অর্থাৎ ইদ্দতের মধ্যে স্বামী চাইলে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারেন। এতে স্ত্রীর অনুমতি লাগে না। আর ইদ্দত শেষ হয়ে গেলে নতুন বিয়ে করে ফিরে আসা যায়, এতে স্বামী মাত্র দুটি তালাকের অধিকার নিয়ে ফেরেন।
দুই তালাক
দুই তালাক দিলে তাও রাজয়ী থাকে, ইদ্দতের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু এরপর স্বামীর হাতে মাত্র একটি তালাক বাকি থাকে। এখানে সতর্ক থাকা জরুরি, কারণ পরে আবার একবার ভুল হলে আর ফিরে আসার সুযোগ থাকে না। কুরআনে বলা হয়েছে, তালাক দুইবার। এরপর হয় ভালোভাবে রেখে দেওয়া, নয় সুন্দরভাবে ছেড়ে দেওয়া (সূরা বাকারা, আয়াত ২২৯)।
তিন তালাক
তিন তালাক হয়ে গেলে স্ত্রী স্বামীর জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যান। এ অবস্থাকে বলে তালাকে মুগাল্লাযা। কুরআনে এসেছে, স্বামী যদি তৃতীয় তালাক দেয়, তবে স্ত্রী ওই স্বামীর জন্য হালাল হবেন না, যতক্ষণ না তিনি অন্য স্বামীকে বিয়ে করেন (সূরা বাকারা, আয়াত ২৩০)।
এক বৈঠকে তিন তালাক
ইসলামিক ফতোয়া সংগ্রহে মুফতি ইবরাহীম দেসাইসহ হানাফী মুফতিগণ বলেছেন, একবারে তিন তালাক দিলে (যেমন “তোমাকে তিন তালাক”) তিনটি তালাকই কার্যকর হয়ে যায়। ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালিক, ইমাম শাফিয়ী ও ইমাম আহমাদ রহ. সহ জমহুর আলেমের মত এটিই। সাহাবি উসমান রা. ফয়সালা দিয়েছিলেন, যে ব্যক্তি স্ত্রীকে হাজার তালাক দেয়, তার স্ত্রী তিন তালাকেই পৃথক হয়ে যায়। এই কাজ গুনাহ, কিন্তু তালাক পড়ে যায়।
তিন তালাকের পর ফিরে আসা
তিন তালাকের পর স্ত্রী প্রথম স্বামীর জন্য তখনই হালাল হবেন, যখন:
- ইদ্দত শেষ হবে,
- অন্য কাউকে সঠিক নিয়মে বিয়ে করবেন,
- দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে প্রকৃত দাম্পত্য মিলন হবে,
- স্বাভাবিকভাবে তালাক বা মৃত্যুর মাধ্যমে বিয়ে শেষ হবে,
- আবার ইদ্দত পূর্ণ হবে।
এর পরই কেবল প্রথম স্বামী নতুন বিয়ের মাধ্যমে ফিরতে পারেন।
সাবধানতা
- “তালাক”, “ছেড়ে দিলাম” ইত্যাদি শব্দ ভাবার আগে উচ্চারণ করবেন না।
- ঘটনা সম্পর্কে শব্দ, সংখ্যা ও সময় লিখে নিয়ে যান, যাতে সঠিক ফতোয়া পাওয়া যায়।
