পরিবারে আলোচনা ও পরামর্শের সুন্দর অভ্যাস

আমাদের ঘরে রোজ ছোট-বড় অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আজ কী রান্না হবে, ছেলেমেয়ে কোন স্কুলে পড়বে, ঈদে কোথায় যাওয়া হবে, বাড়ি মেরামত কবে হবে, কে কোন দায়িত্ব নেবে। এসব যদি একজন মানুষ একাই ঠিক করে ফেলেন, তবে বাকিদের মনে ক্ষোভ জমে। আর সবাই মিলে আলোচনা করে নিলে সিদ্ধান্তও ভালো হয়, ঘরের পরিবেশও সুন্দর থাকে।

কোরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, তাদের কাজকর্ম পরস্পর পরামর্শের ভিত্তিতে হয় (সূরা শূরা, ৪২:৩৮)। আর নবীজি ﷺ কে আল্লাহ বলেছেন, কাজকর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯)। যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন, তিনিও সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করতেন। তাহলে আমাদের ঘরেও এই সুন্দর অভ্যাস থাকা উচিত।

পরামর্শ মানে সবার কথা শোনা

পরামর্শ মানে লোক দেখানো জিজ্ঞাসা নয়। মন দিয়ে সবার কথা শোনা, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া। অনেক সময় ঘরের সবচেয়ে ছোট সদস্যের কাছ থেকেও ভালো বুদ্ধি আসে। কিশোর ছেলেমেয়েকে কোনো সিদ্ধান্তে জিজ্ঞেস করলে তার আত্মবিশ্বাস বাড়ে। বৃদ্ধ বাবা-মা নিজেদের সম্মানিত মনে করেন। আর স্ত্রীর মত নেওয়া হলে সংসারে তাঁর মর্যাদা ও দায়িত্ববোধ দুটোই বাড়ে।

হুদাইবিয়ার সন্ধির পর সাহাবীরা যখন মন খারাপ করে বসে ছিলেন, তখন নবীজি ﷺ উম্মে সালামা (রা.) এর কাছে পরামর্শ চেয়েছিলেন। তিনি একটি সুন্দর পরামর্শ দিলেন, আর নবীজি ﷺ সেটা গ্রহণ করলেন (বুখারী, হাদীস ২৭৩১)। স্ত্রীর পরামর্শ নিতে নবীজি ﷺ কখনও সংকোচ করেননি।

আলোচনার জন্য সময় ও জায়গা ঠিক করুন

বড় কোনো বিষয়ে কথা বলার জন্য উপযুক্ত সময় বেছে নিন। দৌড়ঝাঁপের মধ্যে বা রাগের মাথায় আলোচনা করলে ভুল সিদ্ধান্তের ভয় থাকে। রাতের খাবারের পর সবাই যখন একসাথে বসেন, সেটা ভালো সুযোগ। মোবাইল আর টিভি বন্ধ করে দিন। সবাই নরম গলায় নিজের মত বলুন।

বাড়ি কেনা, ছেলেমেয়ের বিয়ে বা ব্যবসা শুরুর মতো বড় সিদ্ধান্তে আগে স্বামী-স্ত্রী একান্তে কথা বলে নিন। তারপর দরকার হলে পরিবারের বড়দের সাথে আলাপ করুন।

আলোচনার আদব

আলোচনা তখনই সুন্দর হয়, যখন সবাই কিছু আদব মেনে চলেন। কেউ কথা বললে মাঝখানে থামাবেন না। অন্যের মত পছন্দ না হলেও ঠাট্টা করবেন না। কারও কথার জবাবে তার পুরনো ভুলের খোঁটা দেবেন না। গলা চড়াবেন না। নিজের মতটাই ঠিক, এমন জেদও ধরবেন না।

নবীজি ﷺ বলেছেন, যার ভেতরে কোমলতা নেই, সে সব কল্যাণ থেকে বঞ্চিত (মুসলিম, হাদীস ২৫৯২)। আলোচনার সময় কোমলতা ধরে রাখাই সবচেয়ে বড় আদব।

ইস্তিখারা ও আল্লাহর ওপর ভরসা

বড় সিদ্ধান্তের সময় পরামর্শের পাশাপাশি আল্লাহর কাছেও সাহায্য চাওয়া সুন্নত। নবীজি ﷺ সাহাবীদের যেমন কোরআনের সূরা শেখাতেন, তেমনই সব কাজে ইস্তিখারার দুআ শেখাতেন (বুখারী, হাদীস ১১৬২)। দুআয় আল্লাহর কাছে কল্যাণকর পথ চেয়ে নিন, তারপর পরামর্শ করে যে পথ ভালো মনে হয় সে পথে এগোন, আর আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। কোরআনে আছে, যখন সংকল্প করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৫৯)।

মতভেদ হলে কী করবেন

আলোচনার পরও সবাই একমত নাও হতে পারেন। তখন কী করা যায়? যার বিষয়ে সিদ্ধান্ত, তার ওপর প্রভাব পড়ে সবচেয়ে বেশি, তাই তার মতকে প্রাধান্য দিন। অথবা সব মতের মধ্যে যেটা সবচেয়ে কল্যাণকর, সেটা বেছে নিন। যাদের মত নেওয়া হলো না, তাঁরা যেন মন খারাপ না করেন। আর সিদ্ধান্ত ভুল হলে একজনকে দোষ না দিয়ে সবাই মিলে দায়িত্ব নিন। এতে সংসারের বন্ধন আরও শক্ত হয়।

ছোটদের অংশগ্রহণ

ঘরের আলোচনায় ছোটদের জায়গা দিলে তারা দায়িত্ব শিখতে পারে। ঈদে কী কেনা হবে, বেড়াতে কোথায় যাওয়া হবে, ঘরের কোন দেয়ালে কী রং হবে, এসব বিষয়ে তাদের মত জিজ্ঞেস করুন। তাদের মত সবসময় রাখা না গেলে কেন রাখা গেল না, বুঝিয়ে বলুন। এতে তারা বোঝে, সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো হয় না।

গোপন কথা গোপন রাখুন

পরিবারের ভেতরের আলোচনা বাইরে ছড়ানো উচিত নয়। নবীজি ﷺ বলেছেন, মজলিসের কথা আমানত (আবু দাউদ, হাদীস ৪৮৬৮)। স্বামী-স্ত্রীর কথা, সন্তানের সমস্যা, সংসারের আর্থিক অবস্থা, এসব বাইরের মানুষের কাছে গল্পের মতো করে বলা ঠিক নয়। এতে সম্পর্কে অবিশ্বাস জন্ম নেয়।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর কী করবেন

আলোচনা শেষ হলে সিদ্ধান্তটা সবাইকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিন। কে কী দায়িত্ব নেবে, কাজটা কবে নাগাদ হবে, এসব ঠিক করে নিন। অনেক সময় আলোচনা হয়, কিন্তু কার কী করার কথা, তা কেউ ঠিকমতো মনে রাখে না। ফলে পরে আবার ঝগড়া বাধে। কাগজে বা মোবাইলে ছোট করে লিখে রাখলে ভুল বোঝাবুঝি কমে। কিছুদিন পর আবার বসে দেখে নিন, সিদ্ধান্তটা কেমন কাজ করছে। দরকার হলে বদলে নিন। এতে সবাই বুঝতে পারে, তাদের কথার মূল্য আছে।

শেষ কথা

পরিবারে পরামর্শের অভ্যাস একদিনে গড়ে ওঠে না। ছোট ছোট বিষয় থেকে শুরু করুন। আজ রাতের খাবারের সময় সবাইকে জিজ্ঞেস করুন, আগামী সপ্তাহান্তে আমরা কী করতে পারি? সবার কথা শুনুন, একসাথে ঠিক করুন। দেখবেন, ঘরের পরিবেশ ধীরে ধীরে আরও আপন হয়ে উঠছে।

আল্লাহ আমাদের প্রতিটি পরিবারে পরামর্শ, ভালোবাসা ও শান্তি দান করুন। আমীন।

Author

  • আমির হামজাহ

    আমির হামজাহ জামিয়াতু ইবরাহীম, মাহমুদনগর, সাইনবোর্ড, ঢাকার একজন শিক্ষক, লেখক ও অভিজ্ঞ মুফতি। তিনি প্রায় ৭ বছর ধরে ইসলামী বিষয় নিয়ে লেখালেখি ও ব্লগিং করছেন। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিবার, বিবাহ, দাম্পত্য জীবন ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। তিনি ইসলামিক কার্যক্রম ও দাওয়াহর সঙ্গে যুক্ত এবং পরিবার BD (PoribarBD.com)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক।