মোহর স্ত্রীর প্রাপ্য এবং স্ত্রীর সম্পদে তাঁর সম্মতি

আমাদের সমাজে মোহর নিয়ে নানা ভুল ধারণা আছে। কেউ ভাবেন, এটা বিয়ের একটা আনুষ্ঠানিক সংখ্যা মাত্র। কেউ মনে করেন, বিয়ের সময় লিখে রাখলেই হলো, দেওয়ার দরকার নেই। আবার কোথাও মোহর “বেশি” বা “কম” ধরা নিয়ে দুই পরিবারে দরকষাকষি চলে। অথচ ইসলামে মোহর একটি স্পষ্ট হক। এটা স্ত্রীর প্রাপ্য, স্বামীর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ নয়।

কুরআন কী বলে

আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “তোমরা নারীদের তাদের মোহর খুশিমনে দিয়ে দাও। তারা যদি খুশি হয়ে তার কিছু অংশ তোমাদের ছেড়ে দেয়, তবে তোমরা তা তৃপ্তির সঙ্গে ভোগ করো।” (সূরা নিসা, ৪:৪)

এই আয়াত থেকে কয়েকটি বিষয় বোঝা যায়।

১. মোহর দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব। আয়াতে সরাসরি দিয়ে দেওয়ার নির্দেশ এসেছে।

২. খুশিমনে দিতে হবে। বিরক্তি নিয়ে, চাপে পড়ে বা টালবাহানা করে নয়।

৩. মোহরের মালিক স্ত্রী নিজে। তাঁর বাবা, ভাই বা অন্য কেউ তাঁর অনুমতি ছাড়া তা নিতে পারেন না।

৪. স্ত্রী নিজের ইচ্ছায় ছাড় দিলে তা বৈধ। তবে সেটা হতে হবে তাঁর সত্যিকারের খুশিতে, কোনো চাপ বা লজ্জার কারণে নয়।

জাহিলি যুগের একটি প্রথা ও ইসলামের সংশোধন

ইসলামের আগে অনেক সময় মেয়ের মোহর তার অভিভাবকেরাই নিয়ে নিতেন। কুরআনের এই নির্দেশ সেই প্রথা বন্ধ করে মোহরকে স্ত্রীর নিজের সম্পদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজও যদি কোথাও স্ত্রীর অজান্তে বা অনিচ্ছায় মোহর রেখে দেওয়া হয়, তা এই আয়াতের পরিপন্থী।

মোহর নিয়ে সমাজের কিছু ভুল

  • “মোহর মাফ করে দাও।” অনেক সময় বাসর রাতে বা বিয়ের পর স্ত্রীকে লজ্জায় ফেলে মাফ করিয়ে নেওয়া হয়। এভাবে নেওয়া মাফ প্রকৃত খুশির মাফ নয়। স্ত্রী নিজে ভেবেচিন্তে আন্তরিকভাবে ছাড় দিলে তবেই তা গ্রহণযোগ্য।
  • “তালাকের সময় দেখা যাবে।” মোহর কেবল বিচ্ছেদের জন্য রাখা কোনো জামানত নয়। বিয়ের পর থেকেই এটি স্বামীর ওপর ঋণের মতো ফরজ হয়ে থাকে। সুযোগ হলেই তা আদায় করে দেওয়া উচিত।
  • “মোহর বাড়াচ্ছি মর্যাদার জন্য।” এমন অঙ্ক ধরা ঠিক নয়, যা পরে আদায় করার সামর্থ্যই থাকবে না। আবার অতি অল্প ধরে স্ত্রীর মর্যাদাকে ছোট করাও ঠিক নয়। উভয় পরিবারের সম্মতিতে স্বামীর সামর্থ্য আর স্ত্রীর মর্যাদার ভারসাম্য রেখে নির্ধারণ করাই ভালো।
  • “তালাক দিলে ফেরত চাইব।” আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট বলেছেন, স্ত্রীকে যা দেওয়া হয়েছে, বিচ্ছেদের সময় তা থেকে কিছু ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না, তা যত বড় সম্পদই হোক। (সূরা নিসা, ৪:২০-২১)

মোহরের পরিমাণ নিয়ে সমাজের ভাবনা

বিয়ের আলাপে মোহর নিয়ে অনেক সময় কথা এড়িয়ে যাওয়া হয়। কেউ ভাবেন, এ নিয়ে আলাপ করা লজ্জার। আসলে বিয়ের আগে স্পষ্ট কথা বলে নেওয়াই ভালো। তাতে পরে ভুল বোঝাবুঝি হয় না, আর দুই পরিবারই জানে কী ঠিক হয়েছে।

মোহর নির্ধারণের সময় তিনটি বিষয় মাথায় রাখা যায়:

  • বর পক্ষ যেন এমন অঙ্ক না ধরে, যা আদায়ের কোনো পরিকল্পনা নেই।
  • কনে পক্ষ যেন এত বেশি না চায়, যা বরের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
  • পরিমাণ যা-ই হোক, তা লিখিত থাকুক এবং দুই পক্ষই জানুক।

আদায়ের সুন্দর পদ্ধতি

মোহর আদায়ের সময় স্ত্রীর হাতে সরাসরি দেওয়াই উত্তম। সঙ্গে ভদ্র একটি বাক্য থাকলে আরও ভালো, যেমন, “এটা তোমার হক, আল্লাহ আমাকে আদায়ের তাওফীক দিয়েছেন।” এতে স্ত্রীর মনে সম্মানের অনুভূতি আসে, আর স্বামীর দায়িত্বও পূর্ণ হয়।

যদি পুরো পরিমাণ একসঙ্গে দেওয়া কঠিন হয়, তাহলে স্ত্রীর সম্মতি নিয়ে কিস্তিতে দেওয়াও সম্ভব। তবে সময় পেলেই বাকিটা শোধ করা জরুরি। বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়।

স্ত্রীর সম্পদ ও সংসারের অর্থে কোনো একটি ছক বাঁধা নেই

হানাফী ফিকহের দৃষ্টিতে প্রদত্ত একটি ফতোয়ায় (সিকার্স গাইডেন্স, শাইখ ফারাজ রাব্বানী কর্তৃক যাচাইকৃত) বলা হয়েছে, সংসারের অর্থ কীভাবে সামলানো হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট একটি ছক শরীয়ত বেঁধে দেয়নি। শরীয়ত শুধু একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর। এর বাইরে স্বামী-স্ত্রী পারস্পরিক সম্মতিতে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবস্থা ঠিক করে নিতে পারেন।

স্ত্রীর সম্পদে তাঁর সম্মতি জরুরি

একই ফতোয়ায় বলা হয়েছে, স্ত্রীর সম্পদ খরচ বা ব্যবহারে তাঁর সম্মতি থাকতে হবে। দলিল হিসেবে এসেছে সূরা নিসার ৪:৪ আয়াত, যেখানে স্ত্রী খুশি হয়ে ছেড়ে দিলেই তা ভোগ করা যায়। অর্থাৎ স্ত্রীর মনে সংকোচ বা অনিচ্ছা থাকলে তাঁর সম্পদ ব্যবহার করা ঠিক নয়।

নিজের উপার্জন সংসারে দেওয়া বা না দেওয়া স্ত্রীর ইচ্ছা। তিনি সম্মত হয়ে দিলে সেটি সুন্দর সহযোগিতা। কিন্তু চাপ দিয়ে নেওয়া উচিত নয়।

ভালো ব্যবস্থার তিনটি স্তম্ভ

ওই ফতোয়ার মূল পরামর্শ হলো, যে ব্যবস্থাই হোক, তিনটি জিনিস থাকতে হবে: স্পষ্টতা, পারস্পরিক পরামর্শ ও সম্মতি।

১. স্পষ্টতা। কার আয় কত, কী কী খরচ আছে, কোথায় জমানো আছে, দুজনেই জানুন। লুকোচুরিতে সন্দেহ জন্মায়।

২. পরামর্শ। বড় খরচের আগে দুজনে বসে ঠিক করুন। কুরআনে পারিবারিক সিদ্ধান্তে পরস্পরের পরামর্শের গুরুত্ব এসেছে।

৩. সম্মতি। একজনের টাকা অন্যজনের ইচ্ছায় নয়, সম্মতিতে ব্যবহার হোক।

কয়েকটি ব্যবহারিক পরামর্শ

  • মাসে একবার সংসারের খরচ নিয়ে শান্তভাবে বসুন।
  • জরুরি ও অপ্রয়োজনীয় খরচ আলাদা করুন।
  • কিছু টাকা সঞ্চয়ের জন্য আলাদা রাখুন।
  • আলোচনার সময় একে অপরকে দোষারোপ না করে সমাধান খুঁজুন।

শেষ কথা

মোহর মানে স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর প্রতি সম্মান ও দায়বদ্ধতার প্রকাশ। এটি যথাসময়ে ও খুশিমনে আদায় করলে দাম্পত্য সম্পর্কে আস্থা আরও গভীর হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালনের তাওফীক দিন।

Author