অনুমতি নিয়ে ঘরে প্রবেশের আদব
ঘর মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। এখানে সে বিশ্রাম নেয়, পোশাক বদলায়, পরিবারের সঙ্গে নিজের মতো সময় কাটায়। কেউ অনুমতি না নিয়ে হঠাৎ ঢুকে পড়লে সেই নিরাপত্তা নষ্ট হয়। কাজেই অন্যের ঘরে ঢোকার আগে অনুমতি চাওয়া ইসলামের একটি সুন্দর শিষ্টাচার, যা লজ্জাশীলতা ও পর্দার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
কুরআনের নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারও ঘরে অনুমতি না নিয়ে এবং গৃহবাসীদের সালাম না দিয়ে প্রবেশ করো না। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখো (সূরা নূর, ২৪:২৭)।
আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অনুমতি চাওয়ার সময় সালাম দিয়ে বলা উচিত, “আসসালামু আলাইকুম, আমি কি ঢুকতে পারি?” অনুমতি ছাড়া হঠাৎ ঢুকে পড়ার চেয়ে এটি মুমিনের জন্য অনেক উত্তম।
পরিবারের ভেতরেও অনুমতি
সূরা নূরের ৫৮-৫৯ নম্বর আয়াতে পরিবারের ভেতরের জন্যও আদব শেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা এখনও প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে আসার আগে অনুমতি নেয়। সময় তিনটি হলো ফজরের নামাযের আগে, দুপুরে যখন তোমরা বিশ্রামের জন্য পোশাক খুলে রাখো এবং এশার নামাযের পর। এই তিন সময় তোমাদের জন্য গোপনীয়তার সময় (সূরা নূর, ২৪:৫৮)। আর সন্তানরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে তাদেরও সব সময় অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হবে (সূরা নূর, ২৪:৫৯)।
এই আয়াত থেকে আমরা শিখি, ঘরের ছোটরাও বাবা-মায়ের ঘরে ঢোকার আগে দরজায় টোকা দিয়ে অনুমতি নেবে। এই অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই শেখানো ভালো।
অনুমতি চাওয়ার কারণ
সাহল ইবনে সাদ (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি নবীজি ﷺ-এর ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিল। তখন নবীজি ﷺ-এর হাতে একটি চিরুনি ছিল, যা দিয়ে তিনি মাথা চুলকাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, আমি যদি জানতাম তুমি উঁকি দিচ্ছ, তাহলে এটি দিয়ে তোমার চোখে খোঁচা দিতাম। অনুমতি চাওয়ার বিধান তো দৃষ্টির কারণেই রাখা হয়েছে (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬২৪১)।
অর্থাৎ অনুমতির উদ্দেশ্য হলো, ঘরের ভেতরের গোপন জিনিসের ওপর যেন চোখ না পড়ে। তাই উঁকি দেওয়া একেবারেই উচিত নয়।
সাহাবীদের আদর্শ
আবু মূসা আশআরী (রা.) একবার উমর (রা.)-এর ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনবার অনুমতি চেয়েও সাড়া না পেয়ে তিনি ফিরে গেলেন। পরে উমর (রা.) জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন, নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমাদের কেউ তিনবার অনুমতি চাইলে এবং অনুমতি না পেলে ফিরে যাবে (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬২৪৫)। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, অনুমতি না পেলে বারবার জোর করা উচিত নয়। ফিরে যাওয়াই সম্মানজনক।
অনুমতি চাওয়ার সুন্দর নিয়ম
- আগে সালাম, পরে অনুমতি। আবু দাউদের এক বর্ণনায় এসেছে, এক ব্যক্তি শুধু “আমি কি প্রবেশ করব?” বলে অনুমতি চাইলে নবীজি ﷺ তাকে সালাম দিয়ে অনুমতি চাইতে শেখান (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৫১৭৭)।
- নিজের পরিচয় দিন। দরজায় গিয়ে নিজের নাম বা পরিচয় জানান।
- দরজার ঠিক সামনে দাঁড়াবেন না। একপাশে দাঁড়ান, যাতে ভেতরে সরাসরি দৃষ্টি না পড়ে।
- উঁকি দেবেন না।
- ধৈর্য ধরুন। ঘরের মালিক বেরিয়ে আসতে সময় নিতে পারেন।
- অনুমতি না পেলে ফিরে যান। এতে মন খারাপ করার কিছু নেই।
নিজের ঘরে ঢোকার সময়
আলেমদের বর্ণনা অনুযায়ী, নিজের স্ত্রীর কাছে প্রবেশের জন্য অনুমতি চাওয়া ওয়াজিব নয়। তবে উত্তম হলো আগে থেকে জানান দেওয়া, যাতে স্ত্রী অপ্রস্তুত অবস্থায় না পড়েন। যেমন গলা খাঁকারি দেওয়া বা জুতার শব্দ করা মুস্তাহাব। ইবনে মাসউদ (রা.) ঘরে ঢোকার আগে গলা খাঁকারি দিতেন। আর ঘরে যদি মা, বোন বা প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে থাকেন, তাহলে বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী তাঁদের কাছে প্রবেশের আগে অনুমতি নিতে হবে।
রাতে হঠাৎ ঘরে ফেরা
আলেমরা এ প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, কেউ দীর্ঘ সফর থেকে ফিরলে রাতে হঠাৎ ঘরে না ঢোকাই ভালো। এর উদ্দেশ্য হলো স্ত্রীর দোষ-ত্রুটি খুঁজতে না যাওয়া। আগে জানিয়ে ফিরলে ঘরের মানুষ প্রস্তুত থাকতে পারে, আর সম্পর্কের সম্মানও বজায় থাকে। সফর শেষে ঘরে আসার সময়ও তাই একটি ফোন বা বার্তা ভালো আদব।
ঘরে এই আদব চালু করার উপায়
- ছোটদের শেখান, বাবা-মায়ের ঘরে ঢোকার আগে দরজায় টোকা দেবে।
- বাবা-মাও সন্তানদের কিশোর বয়সে তাদের ঘরে ঢোকার আগে অনুমতি চাইলে তারা সম্মান শেখে।
- দরজা বন্ধ থাকলে তা সম্মান করার অভ্যাস করুন।
- অতিথি আসার সময় আগে জানিয়ে আসতে বলুন বা নিজেও আগে জানিয়ে যান।
- ফোনেও অনুমতি নেওয়ার আদব রাখুন। রাত-বিরাতে বা বিশ্রামের সময় ফোন না করাই ভালো।
মনে রাখবেন, অনুমতি চাওয়া মানে অন্যকে ছোট করা নয়, বরং সম্মান জানানো। যে অতিথি এই আদব মানেন, গৃহস্থ তাঁকে আরও খুশি মনে বরণ করেন।
ফোনেও একই কথা। কাউকে কল করার আগে বার্তা পাঠিয়ে জেনে নিন, কথা বলার সময় সুবিধাজনক কি না। এটিও অনুমতি চাওয়ার একটি আধুনিক রূপ।
শেষ কথা
অনুমতি চাওয়া ছোট একটি আদব, কিন্তু এর ভেতরে অন্যের মর্যাদা ও গোপনীয়তার প্রতি সম্মান লুকিয়ে আছে। এই অভ্যাস ঘরের পরিবেশকে আরও শান্ত করে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে উত্তম আদব শেখার তাওফীক দিন। আমীন।
