ঈমান বাড়ে-কমে কীভাবে ও তাওবা ও আল্লাহর রহমত

কখনো আমরা অনুভব করি ঈমান ঝলমল করছে, আবার কখনো মন ভারী ও ইবাদতে আগ্রহহীন। এটি স্বাভাবিক। তাহলে ঈমান কি সত্যিই বাড়ে ও কমে? এ নিয়ে আলেমদের বক্তব্য একটু সূক্ষ্ম, তাই মন দিয়ে পড়ুন।

কুরআনে বাড়ার কথা

আল্লাহ বলেছেন, “মুমিন তো তারাই, যাদের সামনে আল্লাহর আয়াত তিলাওয়াত করা হলে তাদের ঈমান বেড়ে যায়” (সূরা আনফাল, আয়াত ২)। আরও এসেছে, “তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করেছেন, যাতে তাদের ঈমানের সঙ্গে আরও ঈমান বেড়ে যায়” (সূরা ফাতহ, আয়াত ৪)।

হানাফী আলেমদের ব্যাখ্যা

মাথাবাহর শায়খ ওমর সুবেদার হানাফী মাযহাবের অবস্থান জানিয়েছেন। ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর আল-ফিকহুল আকবার গ্রন্থ অনুযায়ী ঈমানের মূল বিষয়গুলো (আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব ইত্যাদির প্রতি বিশ্বাস) কমে না, বাড়েও না। কিন্তু বিশ্বাসের দৃঢ়তা ও গভীরতা বাড়ে-কমে। মোল্লা আলী কারী ও ইমাম রাযি রহ. এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন।

সহজ উদাহরণ: দুজন লোকই জানে যে, আগুনে হাত দিলে পুড়ে যায়। একজন শুধু শুনেছে, আরেকজন নিজের চোখে দেখেছে। দুজনের বিশ্বাস আছে, কিন্তু দ্বিতীয়জনের বিশ্বাস বেশি দৃঢ়। ইবরাহীম (আ.) আল্লাহর কাছে বলেছিলেন, “আমার অন্তর যেন প্রশান্ত হয়” (সূরা বাকারা, আয়াত ২৬০)।

আরেকটি দিক হলো আমল। হানাফী মাযহাবে আমল ঈমানের মূল অংশ নয়, বরং ঈমানের ফল। তাই আমলের মাধ্যমে ঈমানের নূর ও শক্তি বাড়ে, গুনাহে তা ম্লান হয়। এই সূক্ষ্ম পার্থক্য আলেমদের মতভেদের মূল।

ঈমান কমার কারণ

  • গুনাহে লিপ্ত থাকা ও তওবা না করা।
  • আল্লাহর যিকির থেকে দূরে থাকা।
  • অসৎসঙ্গ।
  • দুনিয়ার মোহে ডুবে যাওয়া।
  • ইলম না শেখা।

নবীজি ﷺ বলেছেন, “মুমিন বান্দা যখন গুনাহ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে। তওবা করলে তা পরিষ্কার হয়” (জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৩৩৪)।

ঈমান বাড়ানোর উপায়

আগামী লেখায় এ বিষয়ে বিস্তারিত থাকবে। সংক্ষেপে:

  1. কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ বোঝা।
  2. আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা।
  3. নামায, যিকির, দোয়া।
  4. নেককারদের সঙ্গ।
  5. মৃত্যু ও আখিরাতের স্মরণ।
  6. সদকা ও মানুষের সেবা।

নবীজি ﷺ-এর দোয়া

“ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কালবী আলা দ্বীনিকা।” অর্থাৎ হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী, আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন (জামে তিরমিযী, হাদীস ২১৪০)।

তাওবা ও আল্লাহর রহমত

আমরা সবাই ভুল করি। নবীজি ﷺ বলেছেন, “প্রত্যেক আদম সন্তানই ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা তওবা করে” (জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪৯৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪২৫১)। তাই গুনাহ হয়ে গেলে নিরাশ হওয়া নয়, আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই করণীয়।

আল্লাহর আহ্বান

আল্লাহ বলেছেন, “বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন। তিনিই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (সূরা যুমার, আয়াত ৫৩)।

আল্লাহ কত খুশি হন

নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমাদের কেউ মরুভূমিতে তার বাহন হারিয়ে ফেলার পর যখন তা ফিরে পায়, তখন যতটা খুশি হয়, আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় তার চেয়েও বেশি খুশি হন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩০৮; সহীহ মুসলিম)।

তওবার শর্ত

ফকীহ ও আলেমগণ খাঁটি তওবার জন্য এই শর্তগুলো বলেছেন:

  1. গুনাহ ছেড়ে দেওয়া।
  2. অতীতের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
  3. ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প।
  4. যদি মানুষের হক নষ্ট হয়ে থাকে, তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।

আল্লাহ বলেছেন, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা কর” (সূরা তাহরীম, আয়াত ৮)।

কখন পর্যন্ত তওবা কবুল

নবীজি ﷺ বলেছেন, “আল্লাহ বান্দার তওবা কবুল করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠে এসে পৌঁছে” (জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৫৩৭)। তাই দেরি না করে আজই ফিরে আসুন।

শয়তানের চাল

  • “এত গুনাহ করেছি, আল্লাহ আর ক্ষমা করবেন না।” এটি নিরাশা। আল্লাহ বলেছেন, রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।
  • “পরে তওবা করব।” এটি সময় নষ্ট। মৃত্যুর সময় কেউ জানে না।
  • “বারবার ভুল করি, তাই তওবা কেন?” যতবার ভুল হয়, ততবার তওবা করুন।

তওবার পর কী

  • নেক আমল বাড়িয়ে দিন। আল্লাহ বলেছেন, “যে তওবা করে, ঈমান আনে ও নেক আমল করে, আল্লাহ তার গুনাহকে নেকিতে বদলে দেবেন” (সূরা ফুরকান, আয়াত ৭০)।
  • যে পরিবেশে গুনাহ হয়, তা এড়িয়ে চলুন।
  • সালাতুত তাওবা পড়তে পারেন (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫২১; জামে তিরমিযী, হাদীস ৪০৬)।

Author