খুলা: স্ত্রীর পক্ষ থেকে বিচ্ছেদের শরীয়তসম্মত পথ ও তালাকের পর মোহর ও অন্যান্য পাওনা
তালাকের অধিকার শরীয়তে মূলত স্বামীর হাতে। কিন্তু স্ত্রী যদি কোনোভাবেই সংসার করতে না পারেন, তবে তাঁর কি কোনো পথ নেই? আছে। সেই পথের নাম খুলা।
খুলা কী
খুলা মানে স্ত্রী কিছু অর্থ বা মোহরের অধিকার ছেড়ে দিয়ে স্বামীর সম্মতিতে বিয়ে বিচ্ছিন্ন করা। কুরআনে বলা হয়েছে, যদি তোমরা আশঙ্কা কর যে তারা আল্লাহর সীমা রক্ষা করতে পারবে না, তবে স্ত্রী যা দিয়ে মুক্তি পেতে চায়, তাতে উভয়ের কোনো গুনাহ নেই (সূরা বাকারা, আয়াত ২২৯)।
হাদীসেও এর দৃষ্টান্ত আছে। সাবিত ইবনে কায়সের স্ত্রী নবীজি ﷺ-এর কাছে এসে বললেন, আমি তাঁর চরিত্র বা দ্বীনের ব্যাপারে অভিযোগ করছি না, কিন্তু আমি অকৃতজ্ঞতার আশঙ্কা করছি। নবীজি ﷺ বললেন, তুমি কি তাঁর বাগান ফিরিয়ে দেবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন নবীজি ﷺ সাবিতকে বললেন, বাগান নাও এবং তাকে এক তালাক দিয়ে দাও (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫২৭৩)।
হানাফী মাযহাবের নিয়ম
মুফতি মুহাম্মাদ ইবনে আদম আল-কাওছারীর ফতোয়ার সারকথা:
- খুলার জন্য স্বামীর সম্মতি লাগে। চার মাযহাবেই এ বিষয়ে একমত।
- কাজি বা আদালত ছাড়াও পরস্পরের সম্মতিতে খুলা হতে পারে।
- বিনিময়ের পরিমাণ উভয়ের সম্মতির ওপর নির্ভর করে।
- স্বামী যদি দোষী হন, তবে তাঁর জন্য বিনিময় নেওয়া বৈধ নয়। বরং তা কবীরা গুনাহ। স্ত্রী যদি দোষ ছাড়াই আলাদা হতে চান, তবে স্বামী কিছু নিতে পারেন, তবে মোহরের বেশি না নেওয়াই উত্তম।
- খুলা একটি বায়েন তালাক। এতে স্বামী রুজু করতে পারেন না। তবে দুজন চাইলে নতুন বিয়ে করে ফিরতে পারেন।
- এতে স্ত্রীকে তিন হায়েয পর্যন্ত ইদ্দত পালন করতে হয়।
খুলা কখন উচিত
শুধু অল্প বিরক্তি বা সামান্য অসন্তোষে খুলা চাওয়া উচিত নয়। নবীজি ﷺ বলেছেন, যে নারী বিনা কারণে স্বামীর কাছে তালাক চায়, তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধ হারাম (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২২২৬; জামে তিরমিযী, হাদীস ১১৮৭)। তবে সত্যিকারের কষ্ট যেমন মারধর, দীর্ঘদিন ভরণপোষণ না দেওয়া, চরিত্রে গুরুতর সমস্যা, কিংবা এমন অমিল যেখানে একসঙ্গে থাকলে আল্লাহর হক নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে, সেখানে খুলার পথ বৈধ।
স্বামীর জন্য
স্ত্রী আন্তরিক কষ্টে খুলা চাইলে তাঁকে আটকে রাখা বা কষ্ট দেওয়া উচিত নয়। মোহর ফেরতের নামে বাড়তি দাবি করাও জুলুম।
আদালত ও আলেমের ভূমিকা
স্বামী রাজি না হলে বা পাওয়া না গেলে স্ত্রী কী করবেন, সে বিষয়ে ভিন্ন আলোচনা আছে। হানাফী ফিকহে এমন ক্ষেত্রে কাজি বা আদালতের ভূমিকা এবং শর্তাবলি জটিল।
তালাকের পর মোহর ও অন্যান্য পাওনা
তালাকের পর ঝগড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো টাকাপয়সা। কে কী পাবেন, কে কী দেবেন, এ নিয়ে কথা বাড়ে। শরীয়ত এখানে স্পষ্ট নিয়ম দিয়েছে, যা মানলে বহু ঝগড়া এড়ানো যায়।
মোহর স্ত্রীর হক
মোহর বিয়ের সময় স্ত্রীকে দেওয়ার কথা বলা হয়। কুরআনে আছে, “তোমরা স্ত্রীদের মোহর খুশি মনে দিয়ে দাও” (সূরা নিসা, আয়াত ৪)। যদি বিয়ের সময় মোহর পরিশোধ না হয়ে থাকে, তবে তা স্বামীর ওপর ঋণ। তালাক হলেও সেই ঋণ বাকি থাকে এবং স্বামীকে আদায় করতে হয়।
সহবাসের আগে তালাক হলে
আয়াতে দুটি অবস্থার কথা এসেছে:
- মোহর নির্ধারিত ছিল, কিন্তু সহবাস বা নির্জনবাসের আগে তালাক হলে নির্ধারিত মোহরের অর্ধেক দিতে হবে (সূরা বাকারা, আয়াত ২৩৭)।
- মোহর নির্ধারিত ছিল না, তখন স্বামী নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু উপহার বা পোশাক দেবেন (সূরা বাকারা, আয়াত ২৩৬)।
আর সহবাস বা বৈধ নির্জনবাস হয়ে থাকলে পুরো মোহর দিতে হয়।
ভরণপোষণ ও বাসস্থান
দারুল ইফতা লেস্টারের ফতোয়া অনুযায়ী ইদ্দতের সময় স্বামীর ওপর স্ত্রীর খোরপোষ দেওয়া ওয়াজিব, তালাক রাজয়ী হোক বা বায়েন। আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে বাস কর, তাদেরও সেখানে বাস করতে দাও এবং তাদের কষ্ট দিও না” (সূরা তালাক, আয়াত ৬)। ইদ্দত শেষ হলে সাধারণ খোরপোষের দায়িত্ব আর থাকে না।
বিয়েতে স্ত্রীকে দেওয়া উপহার
বিয়েতে স্ত্রীকে যা উপহার দেওয়া হয়েছে, গয়না বা সম্পদ, তা সাধারণত স্ত্রীর মালিকানা। আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা যদি এক স্ত্রীর জায়গায় আরেক স্ত্রী আনতে চাও এবং একজনকে অনেক সম্পদও দিয়ে থাক, তবে তা থেকে কিছু ফেরত নিও না” (সূরা নিসা, আয়াত ২০)। তবে ঘটনা অনুযায়ী স্থানীয় প্রথা ও পক্ষগুলোর সম্মতি দেখা হয়। তাই কোনটি উপহার, কোনটি ঋণ, কোনটি বাপের বাড়ির দেওয়া সামগ্রী, তা স্পষ্ট করে নিন।
কী করবেন
- বিয়ের কাবিননামা বের করে দেখুন কত মোহর, কত পরিশোধ হয়েছে।
- অমীমাংসিত বিষয় লিখে রাখুন।
- আপসে মীমাংসা করুন, এবং আল্লাহর ভয় রাখুন। অন্যের হক মেরে দিলে আখিরাতে জবাবদিহি করতে হবে।
- আইনি কাজের ক্ষেত্রে দেশের আইন মেনে চলুন এবং শরীয়তের বিধান অনুযায়ী পরামর্শ নিন।
স্ত্রীর জন্য
যদি আপনার মোহর বা কোনো পাওনা মাফ করে দিতে চান, সেটি আপনার স্বাধীন সিদ্ধান্ত। চাপ বা ভয়ে মাফ করা শুদ্ধ নয়। সন্তুষ্টচিত্তে মাফ করলে তা সদকার মতো সওয়াবের কাজ।
