যাকাতের হিসাব আর সঠিক হকদারের কাছে পৌঁছানো
রমযান এলেই অনেক পরিবারে একটি প্রশ্ন ঘুরে ফেরে। আমার ওপর কি যাকাত ফরয? ফরয হলে কত দিতে হবে, আর কাকে দিলে আদায় হবে? প্রশ্নগুলো সহজ, কিন্তু উত্তর না জানলে হয় যাকাত বাদ পড়ে, নয়তো ভুল জায়গায় চলে যায়। এই লেখায় দুটি বিষয়ই ধাপে ধাপে সহজ ভাষায় দেখা যাক।
যাকাত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
কুরআনে বহু জায়গায় নামাযের সঙ্গে যাকাতের কথা এসেছে। যেমন, “আর নামায কায়েম কর, যাকাত দান কর এবং নামাযে অবনত হও তাদের সাথে, যারা অবনত হয়।” (সূরা বাকারা, ২:৪৩)। যাকাত ধনীর সম্পদকে পবিত্র করে, আর সমাজের গরিব মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বলেছেন, “তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে।” (সূরা তাওবা, ৯:১০৩)।
কার ওপর যাকাত ফরয
যে পরিমাণ ধনসম্পদ থাকলে যাকাত ফরয হয়, ইসলামি পরিভাষায় তাকে নিসাব বলা হয়। সম্পদের নিসাব হলো সোনা সাড়ে সাত ভরি, রুপা সাড়ে বায়ান্ন ভরি অথবা এর কোনো একটির সমমূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসার পণ্য। যাকাত ফরয হওয়ার জন্য অন্তত নিসাব পরিমাণ সম্পদ পূর্ণ এক বছর থাকতে হয়। যেদিন সম্পদ নিসাব পর্যায়ে পৌঁছাবে, সেদিন থেকেই বছর গণনা শুরু হবে।
হিসাব করার সহজ ধাপ
নিসাব পরিমাণ বা তার বেশি সম্পদের মালিককে যাকাতযোগ্য সব সম্পদের হিসাব অনুযায়ী প্রতি বছর আড়াই শতাংশ, অর্থাৎ চল্লিশ ভাগের এক ভাগ, যাকাত দিতে হয়। কীভাবে এগোবেন, তা এভাবে ভাবতে পারেন।
- একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে নিন, যেমন রমযানের কোনো দিন। প্রতি বছর সেই দিনই হিসাব করুন।
- সেদিন আপনার কাছে যত সোনা, রুপা, নগদ টাকা ও ব্যবসার পণ্য আছে, তার পুরোটাই যাকাতের হিসাবে আসবে। বছরের মধ্যে যেকোনো সময় যে টাকা এসেছে, সেটিও।
- ব্যাংকে রাখা টাকা, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, ফেরত পাওয়ার যোগ্য ঋণ ইত্যাদি প্রয়োজনে হিসাবের মধ্যে ধরতে হবে।
- বিক্রির জন্য না রাখা জায়গাজমি, বাড়ি ও গাড়ি যাকাতের হিসাবে পড়বে না। তবে বিক্রির জন্য রাখা হলে তার বর্তমান বাজারদর হিসাবে আসবে।
- তাৎক্ষণিক পরিশোধযোগ্য ঋণ এবং কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য ঋণের চলমান কিস্তির পরিমাণ অর্থ হিসাব থেকে বাদ যাবে।
চান্দ্রবর্ষ সৌরবর্ষের চেয়ে দশ-এগারো দিন কম। তাই কেউ সৌরবর্ষ ধরে হিসাব করলে আড়াই শতাংশের জায়গায় ২.৫৭৮ শতাংশের মতো দিতে হয়, অথবা অতিরিক্ত দিনের হিসাব আলাদা যোগ করতে হয়। নিজের সম্পদের ধরন জটিল হলে, যেমন যৌথ ব্যবসা, ঋণ বা বিনিয়োগ থাকলে, নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে হিসাব বুঝে নেওয়া নিরাপদ।
যাকাত কারা পাবে
আল্লাহ তাআলা নিজেই যাকাতের খাত ঠিক করে দিয়েছেন, “যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে, এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা তাওবা, ৯:৬০)। সংক্ষেপে আট শ্রেণি: দরিদ্র, নিঃস্ব, যাকাত সংগ্রহকারী, ইসলামের প্রতি হৃদয় আকৃষ্ট করার প্রয়োজন আছে এমন মানুষ, দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, আল্লাহর পথে সংগ্রামরত মানুষ এবং মুসাফির। পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, সন্তান-সন্ততিকে এবং স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে যাকাত দেওয়া যায় না।
ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) বর্ণনা করেন, নবী ﷺ মুআয (রাযিঃ)-কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় বললেন, আল্লাহ তাদের সম্পদের মধ্য থেকে যাকাত ফরয করেছেন, যা ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে আর দরিদ্রদের মাঝে প্রদান করা হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৩৯৫)। অর্থাৎ যাকাতের প্রথম ও মূল হকদার অভাবী মানুষ।
সবচেয়ে বেশি যে ভুলগুলো হয়
অনেকে যাকাতকে সাধারণ সমাজকল্যাণ তহবিল মনে করেন। কিন্তু রাস্তা, সেতু, সাধারণ ভবন, মসজিদ নির্মাণ কিংবা প্রতিষ্ঠানের বেতন-ভাতার মতো খাতে যাকাত ব্যবহার করা সঙ্গত নয় বলে আলেমগণ উল্লেখ করেছেন, কারণ এতে কোনো নির্দিষ্ট দরিদ্র মানুষ সরাসরি মালিক হয় না। তবে কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থীকে টিউশন ফি বা উপবৃত্তি হিসেবে সরাসরি যাকাত দেওয়া যায়। বিধবা বা অভাবী নারীকে সেলাই মেশিন বা ক্ষুদ্র ব্যবসার সরঞ্জাম কিনে দিয়ে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগও বৈধ বলে উল্লেখ আছে।
নিয়ত আর আস্থার জায়গা
যাকাত দেওয়ার আগে প্রাপকের অবস্থা যাচাই করা জরুরি। ভুল মানুষকে আবেগে দিয়ে ফেললে যাকাত আদায় না-ও হতে পারে। দেওয়ার সময় নিয়ত বিশুদ্ধ রাখতে হবে, লোকদেখানো বা মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকলে সওয়াব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কোনো সংস্থার মাধ্যমে দিতে চাইলে এমন প্রতিষ্ঠান বেছে নিন, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আছে। সন্দেহ থাকলে প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে সরাসরি পৌঁছে দেওয়াই উত্তম।
ভালো জিনিস থেকে দিন
যাকাত ও দান দেওয়ার সময় কেবল পুরোনো, ফেলে দেওয়ার মতো জিনিস বা অচল মাল দিয়ে দায় সারা উচিত নয়। কুরআনে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্যে ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না।” (সূরা বাকারা, ২:২৬৭)। প্রাপকের সম্মানের কথা ভেবে সম্মানের সঙ্গে ও ভালোভাবে দিন। এতে দেওয়া আর নেওয়া, দুই পক্ষের মনই প্রশান্ত থাকে।
শেষ কথা
যাকাত দান নয়, এটি গরিবের হক। হিসাব ঠিকমতো করা আর সঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালন করলে সম্পদ পবিত্র হয়, সমাজে ভ্রাতৃত্ব বাড়ে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়মে যাকাত আদায়ের তাওফীক দিন। আমীন।
