ওয়াদা রক্ষা এবং আমানত ফেরত দেওয়া: বিশ্বস্ত প্রতিবেশীর পরিচয়
পাড়ায় কার কথায় ভরসা করা যায়, তা সবাই জানে। কেউ বললে “কাল সকালেই দিয়ে দেব” আর ঠিক সময়ে দিয়ে দেন। কারও ঘরে চাবি রেখে নিশ্চিন্তে সফরে যাওয়া যায়, কারও কাছে রাখা জিনিস কখনো হারায় না। আবার কেউ আছেন, যাঁর প্রতিশ্রুতি পালন হয় না, যাঁর কাছে ধার দিলে ফেরত আসতে বছর কেটে যায়। ইসলাম মুমিনের সবচেয়ে মৌলিক গুণগুলোর মধ্যে ওয়াদা রক্ষা ও আমানতদারিকে রেখেছে। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক টেকাতে এই দুটি গুণের বিকল্প নেই।
ওয়াদা পূর্ণ করার নির্দেশ
আল্লাহ তাআলা বলেন, “মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করো।” (সূরা মায়িদা, ৫:১) অন্যত্র বলেছেন, “অঙ্গীকার পূর্ণ করো। নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:৩৪)
অর্থাৎ ওয়াদা শুধু সামাজিক ভদ্রতা নয়, আখিরাতে এর হিসাব দিতে হবে। ছোট ওয়াদাও এর ব্যতিক্রম নয়। “আসছি”, “দেখব”, “কাল দিয়ে যাব”, এসব কথাও প্রতিশ্রুতি। না পারলে আগে থেকে জানানো, অন্তত ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত।
কুরআনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ আছে: “মুমিনগণ! তোমরা যা কর না, তা কেন বল? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর কাছে খুবই অসন্তোষজনক।” (সূরা সাফ, ৬১:২-৩) তাই যা করতে পারব না, তা বলে ফেলা থেকেও সাবধান থাকা দরকার।
মুনাফিকের তিনটি চিহ্ন
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন, মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন খিয়ানত করে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৩; আরও দেখুন হাদীস ২৭৪৯)
এই হাদীসের ভাষা কঠিন। যে তিনটি আচরণ আমাদের সমাজে প্রায় স্বাভাবিক বলে ধরা হয়, নবীজি ﷺ সেগুলোকে মুনাফিকির চিহ্ন বলেছেন। নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার: আমি কি কথায় সত্যবাদী, ওয়াদায় অটল, আমানতে বিশ্বস্ত?
আমানত কাকে বলে
আমানত শুধু টাকা-পয়সা বা জিনিসপত্র নয়। কারও কাছে রাখা সম্পদ, কারও গোপন কথা, কারও সন্তান বা ঘরবাড়ি দেখে রাখার দায়িত্ব, সবই আমানত। আল্লাহ নির্দেশ দেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদিগকে নির্দেশ দেন যে, তোমরা যেন প্রাপ্য আমানতসমূহ প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দাও।” (সূরা নিসা, ৪:৫৮)
আরও বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, খেয়ানত করো না আল্লাহর সাথে ও রাসূলের সাথে এবং খেয়ানত করো না নিজেদের পারস্পরিক আমানতে জেনে-শুনে।” (সূরা আনফাল, ৮:২৭)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন, যে তোমার কাছে আমানত রেখেছে, তাকে তা ফিরিয়ে দাও। (জামে তিরমিযী, হাদীস ১২৬৪; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৩৫৩৫)
আমানত ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি দিক মনে রাখা ভালো:
- সময়মতো ফেরত। ব্যবহারের পর বা প্রয়োজন শেষ হলে দেরি না করা।
- সুন্দর অবস্থায় ফেরত। ধার নেওয়া জিনিস যত্ন করে ব্যবহার করা এবং পরিষ্কার করে ফেরত দেওয়া।
- গোপন কথার হেফাজত। প্রতিবেশী যা বিশ্বাস করে বলেছেন, তা অন্যের কাছে প্রকাশ না করা।
- অনুপস্থিতিতে হেফাজত। প্রতিবেশীর বাড়ি বা সন্তানের প্রতি নজর রাখার দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করা।
ওয়াদা ও আমানতের প্রতিদান
আল্লাহ তাঁর সফল বান্দাদের গুণ বলতে গিয়ে বলেন, “যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকে … তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা শীতল ছায়াময় উদ্যানের উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা তাতে চিরকাল থাকবে।” (সূরা মুমিনুন, ২৩:৮-১১) সুতরাং ওয়াদা রক্ষা ও আমানতদারি জান্নাতের পথে সফল মুমিনের পরিচয়।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধরো, কারণ সত্য নেক কাজের দিকে নিয়ে যায় এবং নেক কাজ জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। সর্বদা সত্য বললে ও সত্যকে স্বভাব বানালে আল্লাহর কাছে তাকে সত্যবাদী লেখা হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৮৯)
ধার ও ঋণ ফেরতের একটি দৃষ্টান্ত
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তির ঘটনা বলেছেন। সে অন্য একজনের কাছে এক হাজার দীনার ঋণ চাইল। ঋণদাতা সাক্ষী ও জামিন চাইলে সে বলল, সাক্ষী ও জামিন হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। ঋণদাতা তা মেনে নিয়ে নির্দিষ্ট মেয়াদে ঋণ দিল। সময়মতো ফেরত দিতে সে বহু চেষ্টা করেও কোনো নৌযান পেল না। তখন সে একটি কাঠে ছিদ্র করে দীনারগুলো ও একটি চিঠি ভরে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দিল। ঋণদাতা পরে সেই কাঠ পেয়ে অর্থ পেল। ঋণগ্রহীতা পরে নিজেও এক হাজার দীনার নিয়ে হাজির হলে ঋণদাতা বলল, আল্লাহ তোমার পক্ষ থেকে তা পৌঁছে দিয়েছেন, তুমি তোমার এক হাজার দীনার নিয়ে সুপথে ফিরে যাও। (সহীহ বুখারী, হাদীস ২২৯১) ঘটনাটি ঋণ পরিশোধের আন্তরিক দায়বোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
কুরআনেও বলা হয়েছে, যাকে বিশ্বাস করা হয়, তার উচিত অন্যের প্রাপ্য পরিশোধ করা এবং নিজের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করা। (সূরা বাকারা, ২:২৮৩)
কীভাবে অভ্যাস গড়ব
- ওয়াদা করার আগে ভাবুন, আমি এটা রাখতে পারব কি না।
- সময় বা তারিখ দিলে তা মনে রাখার জন্য লিখে রাখুন।
- সন্তানদের সামনেও ছোট ওয়াদা রাখুন, কারণ তারা আপনাকে দেখেই শিখবে।
- কারও কাছ থেকে কিছু ধার নিলে ফেরত দেওয়ার তারিখ ঠিক করে নিন।
- অপারগ হলে লজ্জা না করে আগে জানান।
শেষ কথা
যাঁর কথায় ভরসা করা যায়, যাঁর হাতে আমানত নিরাপদ থাকে, তাঁকে সবাই ভালোবাসে। ইসলাম আমাদের সেই মানুষ হতে বলে। আজ থেকেই ছোট ওয়াদাগুলো রাখার চেষ্টা শুরু করুন। আল্লাহ আমাদের সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত করুন।
