বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ির প্রথা ও চাপ: স্ত্রীর বাসস্থানের হক, পর্দা ও সদাচার

বিয়ের পর অনেক নববধূ নতুন সংসারে নানা প্রথা, দাবি ও চাপের মুখে পড়েন: যৌথ রান্নাঘর, সবার সেবা, পর্দার ঘাটতি। আবার স্বামীর ওপরও বাবা-মায়ের হক আছে। এই লেখায় কুরআনের আয়াত, বুখারীর হাদীস এবং দারুল ইফতা লেস্টার (মুফতি মুহাম্মাদ ইবনে আদম), দারুল উলুম দেওবন্দ ও আসকিমামের হানাফি ফতোয়ার আলোকে স্ত্রীর হক ও পরিবারে সদাচারের নিয়ম সাজানো হলো। ফতোয়ার কথাগুলো তাদের নামসহ বলা হয়েছে, আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়। ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে স্থানীয় মুফতির পরামর্শ নিন।

কুরআন: সদ্ভাব ও বাসস্থান

আল্লাহ বলেন, “নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর। অতঃপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ, অনেক কল্যাণ রেখেছেন।” (সূরা নিসা, ৪:১৯)।

বাসস্থান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “যেরূপ গৃহে বাস কর, তাদেরকেও বসবাসের জন্যে সেরূপ গৃহ দাও। তাদেরকে কষ্ট দিয়ে সংকটাপন্ন করো না।” (সূরা তালাক, ৬৫:৬)।

স্ত্রীর বাসস্থানের হক: হানাফি ফতোয়া

দারুল ইফতা লেস্টারের ফতোয়ায় (মুফতি মুহাম্মাদ ইবনে আদম) প্রশ্ন ছিল, স্বামী স্ত্রীকে তার বাবা-মা ও আত্মীয়দের সঙ্গে থাকতে ও রান্নাঘর-গোসলখানা ভাগ করতে বাধ্য করছেন, অথচ আলাদা বাসা ভাড়া করার সামর্থ্য আছে। উত্তরের সারকথা:

  • স্ত্রী আলাদা বাসস্থান দাবি করতে পারেন। স্বামীর ওপর আবশ্যক এমন আশ্রয় দেওয়া, যা চাইলে স্বামীর পরিবারের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত।
  • বাড়ির ভেতরে তালাবদ্ধ করা যায় এমন আলাদা অংশ, যেখানে স্ত্রী নিজের জিনিসপত্র রাখতে পারেন এবং শ্বশুরবাড়ির কেউ ঢুকবে না, তা-ই যথেষ্ট। আলাদা গোসলখানা ও রান্নাঘর থাকলে ভালো, তবে সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে; যেসব পরিবারে সাধারণত এসব ভাগাভাগি হয়, সেখানে শুধু তালাবদ্ধ কক্ষই যথেষ্ট হতে পারে।
  • বাড়ি বড় হলে এবং তালাবদ্ধ আলাদা অংশ থাকলে স্ত্রী সম্পূর্ণ আলাদা বাড়ির জন্য জোর করতে পারেন না।
  • ফতোয়ায় সূরা তালাকের ৬৫:৬ আয়াত এবং দুররুল মুখতার, রদ্দুল মুহতার ও বাদায়িউস সানায়ির উদ্ধৃতি আছে। (এই গ্রন্থ আমরা সরাসরি মেলাইনি।)

দেওবন্দের ফতোয়ায় (নম্বর ৫৯/৬১/এন=১৪৩৩) একই কথা বলা হয়েছে: স্বামী আলাদা বাসস্থান, খাবার ও পোশাক দিতে বাধ্য, এবং স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া তার ঘরে অন্য কাউকে, এমনকি মাহরামকেও, থাকতে দিতে পারেন না। বড় বাড়ি লাগবে না; ঘরের এমন অংশই যথেষ্ট যেখানে প্রয়োজন মেটে, পর্দা রক্ষা হয়, জিনিসপত্র নিরাপদ থাকে এবং অনুমতি ছাড়া কেউ ঢুকতে পারে না। স্ত্রী যদি যৌথ পরিবারে থাকতে নিজে রাজি হন, তা-ও জায়েজ।

আসকিমামের একটি ফতোয়ায় প্রশ্ন ছিল, শাশুড়ির আচরণ অসহনীয় হলে স্ত্রী কি আলাদা বাসস্থান চাইতে পারেন? উত্তরে বলা হয়েছে, স্ত্রী পর্দার কারণ দেখিয়ে স্বামীর কাছে আলাদা বাসস্থান চাইতে পারেন এবং এমন অনুরোধ করাই পরামর্শযোগ্য, তবে সব ক্ষেত্রে স্বামীকে বাধ্য করা যাবে এমন কোনো স্থির রায় ফতোয়ায় নেই। আহসানুল ফাতাওয়া (৫/৪৭৬) উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে:

  • সচ্ছল দম্পতির ক্ষেত্রে স্বামী সম্পূর্ণ আলাদা বাসস্থান দেবেন।
  • মধ্যবিত্ত ও স্থিতিশীল আয়ের ক্ষেত্রে আলাদা কক্ষ এবং পরিবারের সঙ্গে ভাগ করা হয় না এমন রান্নাঘর ও গোসলখানা।
  • গরিব হলে একটি কক্ষই যথেষ্ট।

পর্দা ও দেবর-ভাশুর

উকবা ইবনে আমির (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ বললেন, “তোমরা নারীদের কাছে একাকী প্রবেশ করা থেকে সাবধান থাকো।” আনসারদের এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, “হামও (স্বামীর আত্মীয়) সম্পর্কে কী?” তিনি বললেন, “স্বামীর আত্মীয় তো মৃত্যুর মতো।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫২৩২)। আসকিমামের ফতোয়ায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, দেবর বা ভাশুরের সঙ্গে মানুষ পর্দা নিয়ে শিথিল থাকে, তাই তাদের সঙ্গে গুনাহে জড়ানোর ঝুঁকি বেশি। দেওবন্দের ফতোয়াতেও একই হাদীস উদ্ধৃত হয়েছে এবং স্বামীর বৃদ্ধ চাচাও গায়রে মাহরাম বলে পর্দা করতে বলা হয়েছে।

সেবা ও কাজ ভাগাভাগি

আসকিমামের ফতোয়ায় ব্যবহারিক পরামর্শ আছে: স্বামীর সঙ্গে আলোচনা করে পর্দার কারণে আলাদা থাকার অনুরোধ জানানো, কাজের লোক রাখা বা কাজ ভাগাভাগির রোস্টার করা, এবং ধৈর্য ও ভদ্রতা বজায় রাখা। লেস্টারের ফতোয়ায় আরও আছে, স্ত্রী শ্বশুর-শাশুড়ির রান্না বা সেবা করতে বাধ্য নন। স্বেচ্ছায় করলে তা ভালো কাজ এবং কৃতজ্ঞতার যোগ্য।

বাবা-মার হকও ভুলে গেলে চলবে না

স্ত্রীর হকের সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের হকও কুরআনে গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। আল্লাহ বলেন, “তাদের সামনে ভালবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলঃ হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৪)। তাই স্বামী ও স্ত্রী, দুজনেরই উচিত নম্রতা বজায় রাখা, এবং বিষয়টি ঝগড়ায় না নিয়ে আলোচনা ও ধৈর্যের মাধ্যমে সমাধান করা।

আসকিমামের ফতোয়ায় সূরা তালাকের আয়াত উদ্ধৃত হয়েছে: “এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্যে তিনিই যথেষ্ট।” (সূরা তালাক, ৬৫:৩)।

সারকথা

  • স্ত্রীর বাসস্থানের হক আছে; অন্তত তালাবদ্ধ আলাদা অংশ।
  • স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া তার ঘরে কাউকে থাকতে দেওয়া যায় না।
  • দেবর-ভাশুর বা স্বামীর আত্মীয়দের সঙ্গে পর্দা রক্ষা জরুরি।
  • স্ত্রী শ্বশুর-শাশুড়ির সেবায় বাধ্য নন, স্বেচ্ছায় করলে তা সম্মানের।
  • বাবা-মায়ের সঙ্গে নম্র আচরণ রাখুন; ঝগড়া নয়, আলোচনা করুন।

আল্লাহ আমাদের পরিবারগুলোতে সদ্ভাব ও শান্তি দিন।

Author

মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * চিহ্নিত।