সন্তানের সাথে বন্ধুর মতো সম্পর্ক গড়ে তোলার উপায়
আমাদের অনেক বাবা-মা সন্তানকে খুব ভালোবাসেন, কিন্তু সেই ভালোবাসার কথাটা মুখে বলতে পারেন না। তাঁদের মনে হয়, বেশি আদর দিলে সন্তান মাথায় উঠে যাবে। ফলে ঘরে একটা দূরত্ব তৈরি হয়। সন্তান বাবার সামনে এলে চুপ হয়ে যায়। মাকে সব কথা বললেও বাবাকে কিছুই জানায় না। এই দূরত্বই একদিন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের প্রিয় নবী ﷺ ছোটদের সাথে ছিলেন খুব কোমল। আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার নবীজি ﷺ নাতি হাসানকে চুমু খাচ্ছিলেন। পাশে বসা আকরা ইবনে হাবিস বললেন, “আমার দশটি সন্তান আছে, আমি তাদের কাউকে কখনও চুমু খাইনি।” নবীজি ﷺ তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, যে দয়া করে না, তাকে দয়া করা হয় না (বুখারী, হাদীস ৫৯৯৭)।
আগে শুনুন, তারপর বলুন
সন্তানের সাথে বন্ধুত্বের প্রথম ধাপ হলো মন দিয়ে শোনা। স্কুল থেকে ফিরে সে যখন গল্প শুরু করে, হাতের মোবাইলটা একটু নামিয়ে রাখুন। তার চোখের দিকে তাকান। গল্পটা আপনার কাছে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু তার কাছে সেটাই সারাদিনের সবচেয়ে বড় ঘটনা।
অনেক সময় আমরা শোনার আগেই উপদেশ দিতে বসে যাই। সে বলল, “আজ বন্ধুর সাথে ঝগড়া হয়েছে।” আমরা বলে উঠি, “তোমাকে কতবার বলেছি ওর সাথে মিশবে না!” এভাবে বললে পরের বার সে আর মুখ খুলবে না। তার চেয়ে জিজ্ঞেস করুন, “কী হয়েছিল? তোমার কেমন লেগেছিল?” তারপর দুজনে মিলে ভাবুন, কী করা যায়।
প্রতিদিন একটু সময় আলাদা করে রাখুন
ব্যস্ত দিনে সময় বের করা কঠিন, তা জানি। তবু দিনে অন্তত পনেরো মিনিট শুধু সন্তানের জন্য রাখুন। এই সময়ে পড়ার চাপ থাকবে না, শাসনও থাকবে না। রাতে খাওয়ার পর একসাথে বসে গল্প করতে পারেন। বিকেলে বাড়ির সামনে একটু হাঁটতে পারেন। ছুটির দিনে একসাথে রান্নাঘরে কিছু বানাতে পারেন।
আয়েশা (রা.) বলেন, তিনি একবার নবীজি ﷺ এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করে জিতেছিলেন। পরে আবার দৌড় হলে নবীজি ﷺ জিতলেন এবং হেসে বললেন, এটা ওই দিনের শোধ (আবু দাউদ, হাদীস ২৫৭৮)। পরিবারের সাথে খেলা আর হাসিখুশি সময় কাটানো তাই আমাদের নবীর সুন্নত।
ভুল করলে কীভাবে বলবেন
বন্ধুত্ব মানে এই নয় যে সন্তান যা করবে সবই মেনে নিতে হবে। ভুল করলে বুঝিয়ে বলতেই হবে। তবে বলার ধরনটা কোমল হওয়া চাই। সবার সামনে ধমক দিলে সন্তান লজ্জা পায়, আর লজ্জা থেকে আসে জেদ। একান্তে ডেকে নিয়ে শান্ত গলায় বলুন, কী করেছে, এতে কী সমস্যা হলো, পরের বার কী করলে ভালো হয়।
নবীজি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ কোমল, তিনি সব কাজে কোমলতা পছন্দ করেন (বুখারী, হাদীস ৬০২৪)। কঠোরতা যা শেখাতে পারে না, কোমলতা তা শিখিয়ে দেয়।
বয়স অনুযায়ী বন্ধুত্বের ধরন
ছোট শিশুর কাছে বন্ধুত্ব মানে কোলে নেওয়া, গল্প শোনানো, একসাথে খেলা। একটু বড় হলে সে চায় তার কথার দাম দেওয়া হোক, ছোট ছোট সিদ্ধান্তকে সম্মান করা হোক। কিশোর বয়সে সে চায়, আপনি যেন তাকে বিচার না করে বোঝেন। ছয় বছরের সন্তানের জন্য যে আচরণ চলে, পনেরো বছরের ছেলেমেয়ের জন্য তা চলে না। তাই সন্তানের সাথে সাথে নিজেকেও একটু একটু বদলে নিন, কিন্তু ভালোবাসার জায়গাটা সবসময় একই রাখুন।
নিজের ভুলও স্বীকার করুন
আমরা বড়রাও ভুল করি। কখনও রাগের মাথায় সন্তানকে কড়া কথা বলে ফেলি, পরে মনে হয়, ঠিক করিনি। তখন সহজ করে বলে দিন, “আমি রেগে গিয়ে ওভাবে বলে ফেলেছি, আমি দুঃখিত।” এতে আপনার মর্যাদা একটুও কমে না। বরং সন্তান শেখে, ভুল হলে ক্ষমা চাইতে হয়। আর সে আপনাকে আরও বেশি বিশ্বাস করতে শুরু করে।
বিশ্বাসের জায়গাটা তৈরি করুন
সন্তান যদি জানে, সত্যি কথা বললে বাবা-মা রাগ করবেন না, বরং পাশে দাঁড়াবেন, তাহলে সব কথা সে আপনাকেই বলবে। আর যদি জানে, সত্যি বললে মার খেতে হবে, সে মিথ্যা বলতে শিখবে। সত্যবাদী সন্তান চাইলে আগে নিরাপদ পরিবেশ গড়তে হবে।
ছোট ছোট প্রশংসা করতে ভুলবেন না। “আজ ঘর গুছিয়েছ, বাহ, দেখতে কী সুন্দর লাগছে!” “আজ ছোট ভাইকে সাহায্য করেছ, আমার খুব ভালো লেগেছে।” এই কথাগুলো সন্তানের মনে অনেকদিন থেকে যায়।
ছোট একটা অভ্যাস, বড় পরিবর্তন
প্রতি সপ্তাহে একটা দিন ঠিক করুন, যেদিন পুরো পরিবার একসাথে রাতের খাবার খাবে। সেদিন কেউ মোবাইল ধরবে না। সবাই সপ্তাহের একটা ভালো আর একটা কঠিন ঘটনার কথা বলবে। বাচ্চারা এতে বুঝতে পারে, ঘরের সবাই তাদের কথা শুনতে চায়।
শেষ কথা
সন্তান আমাদের কাছে আল্লাহর আমানত। তাদের শরীরের যত্ন নেওয়া যেমন জরুরি, মনের যত্ন নেওয়াও তেমনই জরুরি। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা নিজেদের ও নিজেদের পরিবারকে আগুন থেকে বাঁচাও (সূরা তাহরীম, ৬৬:৬)। এই দায়িত্ব পালন করতে হলে সবার আগে সন্তানের মনের কাছাকাছি যেতে হবে।
আজ রাতেই চেষ্টা করে দেখুন। ঘুমানোর আগে সন্তানের পাশে বসে জিজ্ঞেস করুন, “আজকের দিনটা কেমন গেল?” তারপর শুধু শুনুন। দেখবেন, একদিন সে নিজেই আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে উঠেছে।
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের নেককার করুন এবং আমাদের ঘরকে ভালোবাসা ও শান্তিতে ভরে দিন। আমীন।
