স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য মেটানোর সুন্দর পথ

কোনো সংসারেই সবসময় সব কিছু ঠিক থাকে না। দুজন আলাদা পরিবেশে বড় হওয়া মানুষ এক ছাদের নিচে থাকলে মতের অমিল তো হবেই। চা ঠান্ডা হয়ে গেছে, জামাটা ঠিকমতো ভাঁজ হয়নি, বাবা-মায়ের সাথে কেমন আচরণ হলো, এমন ছোট ছোট কথা থেকেই মন কষাকষি শুরু হয়। আসলে মনোমালিন্য হওয়া খারাপ কিছু নয়। খারাপ হলো সেটা না মিটিয়ে মনের ভেতর জমিয়ে রাখা।

আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেছেন, তাঁর নিদর্শনের মধ্যে আছে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও, আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া রেখেছেন (সূরা রূম, ৩০:২১)। এই ভালোবাসা ও দয়াই সংসারের আসল পুঁজি। ঝগড়ার মুহূর্তেও কথাটা মনে রাখা দরকার।

রাগের সময় থেমে যান

রাগের মাথায় বলা কথা সবচেয়ে বেশি আঘাত দেয়। তখন যা মুখে আসে বলে ফেললে পরে আফসোস হয়, কিন্তু কথা তো আর ফেরানো যায় না। নবীজি ﷺ বলেছেন, শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়। শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে সামলে রাখে (বুখারী, হাদীস ৬১১৪)।

রাগ উঠলে কিছুক্ষণের জন্য আলাদা হয়ে যান। এক গ্লাস পানি খান, অযু করে নিন, অন্য ঘরে গিয়ে একটু বসুন। বলে যান, “আমি এখন রেগে আছি, একটু পরে কথা বলি।” এতে সম্পর্ক ভাঙে না, রাগটাও ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায়।

দোষ নয়, সমস্যার কথা বলুন

ঝগড়ায় আমরা সাধারণত বলি, “তুমি সবসময় এমন করো”, “তুমি কখনও বোঝো না।” এ কথাগুলো মানুষটাকেই আক্রমণ করে, আর আক্রান্ত মানুষ নিজেকে বাঁচাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আসল সমস্যাটা তখন চাপা পড়ে যায়।

তার বদলে নিজের অনুভূতির কথা বলুন। যেমন, “তুমি দেরি করে ফিরলে আমার খুব দুশ্চিন্তা হয়।” কিংবা, “কাজের চাপে আমি একটু একা বোধ করছি।” এভাবে বললে অন্যজন আঘাত না পেয়ে আপনার কষ্টটা বুঝতে পারেন।

গুণগুলোর দিকে তাকান

আমরা কখনও কখনও একে অপরের দোষগুলোই বেশি দেখি। অথচ নবীজি ﷺ বলেছেন, কোনো মুমিন পুরুষ যেন মুমিন নারীকে ঘৃণা না করে। তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলে অন্য একটি স্বভাব পছন্দ হবে (মুসলিম, হাদীস ১৪৬৯)।

নিজের সঙ্গীর তিনটি ভালো গুণ মনে মনে ভেবে নিন। সে কতটা পরিশ্রম করে, সন্তানকে কতটা ভালোবাসে, কঠিন সময়ে কীভাবে পাশে ছিল। এটা মনে পড়লে ঝগড়ার মাঝেও মন নরম হয়ে আসে।

ক্ষমা চাওয়াটা ছোট কাজ নয়

অনেকে ভাবেন, আগে ক্ষমা চাইলে হেরে যাব। অথচ সংসারে কেউ একা হারে না, হয় দুজন একসাথে জেতে, নয়তো দুজনেই হারে। ভুল আপনার হোক বা না হোক, সম্পর্কের জন্য প্রথমে হাত বাড়িয়ে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। একটা সহজ কথা, “আমি দুঃখিত, চলো ভুলে যাই”, অনেক সময় বড় বড় দেয়াল ভেঙে দেয়।

নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে নিজের পরিবারের কাছে সর্বোত্তম, আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম (তিরমিযী, হাদীস ৩৮৯৫)। এ কথা মনে রাখলে বোঝা যায়, সংসারে প্রথমে নরম হওয়া লজ্জার নয়, গৌরবের।

তৃতীয় কাউকে জড়াবেন না

ঝগড়ার পর অনেকে রাগে মা-বাবা বা আত্মীয়দের কাছে নালিশ করেন। এতে ছোট ব্যাপারও বড় হয়ে যায়। কারণ তাঁরা শুধু একটি পক্ষের কথা শোনেন, আর আপনাকে ভালোবাসেন বলে আপনার সঙ্গীর প্রতি তাঁদের মনে কষ্ট জমে। পরে আপনারা মিটমাট করে নিলেও তাঁদের মনের কষ্ট থেকে যায়।

নিজেদের কথা নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নেওয়াই ভালো। সত্যিই সমাধান না হলে এমন কোনো বিচক্ষণ ও দ্বীনদার মুরব্বির সাহায্য নিন, যিনি দুই পক্ষের প্রতি সমান ন্যায়বিচার করবেন এবং কথা বাইরে ছড়াবেন না।

প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালোবাসা

সম্পর্ক ভালো রাখার আসল কাজটা ঝগড়ার সময় হয় না, হয় ঝগড়ার আগের দিনগুলোতে। সকালে সালাম দিয়ে কথা শুরু করুন। সন্ধ্যায় কাজ থেকে ফিরে একটু হাসিমুখে কথা বলুন। রান্না ভালো হলে প্রশংসা করুন। অফিসের কাজ শেষে ঘরের কাজে একটু হাত লাগান। এই ছোট অভ্যাসগুলো সম্পর্কের ভেতর এমন একটা ভিত গড়ে, যা সহজে নড়ে না।

মিটমাটের পর কী করবেন

অনেক সময় ঝগড়া মিটে যায়, কিন্তু মনের ভেতর একটা খচখচানি থেকে যায়। তাই মিটমাটের পর কিছুটা সময় একসাথে কাটান। হাতে হাত রেখে চা খান, একটু হাঁটতে বের হোন, কিংবা পুরনো কোনো মজার স্মৃতি মনে করুন। এতে মন থেকে তিক্ততা ধীরে ধীরে সরে যায়। আর যে বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল, পরের বার সেটা কীভাবে সামলাবেন, দুজনে মিলে ঠিক করে নিন। যেমন, কাজের চাপে দেরি হলে আগে একটা বার্তা পাঠিয়ে দেওয়া, কিংবা বাবা-মায়ের সাথে আচরণ নিয়ে আগে থেকে কথা বলে রাখা। এই ছোট সমঝোতাগুলোই ভবিষ্যতের অনেক ঝগড়া আটকে দেয়।

কখনও কখনও দুজনেই ক্লান্ত থাকেন, তখন ছোট বিষয়ও বড় মনে হয়। এমন দিনে একজন আরেকজনকে একটু বেশি জায়গা দিন। সব কিছু বোঝাতে না গিয়ে শুধু বলুন, “আজ তোমাকে একটু ক্লান্ত দেখাচ্ছে, চলো আগে কিছু খেয়ে নিই।” এই সহমর্মিতাটুকু অনেক সময় যেকোনো যুক্তির চেয়ে বেশি কাজ করে।

শেষ কথা

মনোমালিন্য হবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিটি মনোমালিন্য যেন সম্পর্ককে আরও গভীর করে, সেই চেষ্টা আমাদের করতে হবে। রাতে ঘুমানোর আগে একজন আরেকজনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন, আর একসাথে দুআ করুন।

আল্লাহ আমাদের প্রতিটি সংসারে ভালোবাসা, দয়া ও শান্তি দান করুন। আমীন।

Author

  • আমির হামজাহ

    আমির হামজাহ জামিয়াতু ইবরাহীম, মাহমুদনগর, সাইনবোর্ড, ঢাকার একজন শিক্ষক, লেখক ও অভিজ্ঞ মুফতি। তিনি প্রায় ৭ বছর ধরে ইসলামী বিষয় নিয়ে লেখালেখি ও ব্লগিং করছেন। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিবার, বিবাহ, দাম্পত্য জীবন ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। তিনি ইসলামিক কার্যক্রম ও দাওয়াহর সঙ্গে যুক্ত এবং পরিবার BD (PoribarBD.com)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক।

মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * চিহ্নিত।