রোযা: নিয়ত, যা রোযা ভাঙে এবং যা ভাঙে না

রমযানের রোযা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, “ইসলাম পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত” (বুখারী; মুসলিম)। আল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের ওপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর” (সূরা বাকারা, ২:১৮৩)। রোযা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ওঠে তিনটি জায়গায়: নিয়ত কখন ও কীভাবে, কোন কাজে রোযা ভাঙে, আর কোন কাজে ভাঙে না। এই লেখায় সিকার্সগাইডেন্সের হানাফী গাইড (“The Complete Guide to Fasting”, উস্তাযা নাইলা আকবারআলী) অনুসরণ করে বিষয়গুলো সাজানো হলো।

রোযা কাকে বলে

আভিধানিক অর্থে রোযা হলো বিরত থাকা। শরীয়তে অর্থ হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে সহবাস থেকে এবং শরীরের ভেতরে কিছু প্রবেশ করানো থেকে বিরত থাকা। এটি ফরয প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ বুদ্ধির মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর। হায়েয ও নিফাসের নারী রোযা রাখবেন না, পরে কাযা করবেন।

নিয়ত: কখন করবেন

নিয়ত অন্তরের সংকল্প। মুখে বলা ভালো, তবে জরুরি নয়। প্রতিদিন নিয়ত করতে হয়, রমযানেও। হানাফী গাইডে দুই ধরনের রোযা আলাদা করা হয়েছে:

  • নির্দিষ্ট দিনের রোযা (চলতি রমযান, নির্দিষ্ট মানতের রোযা, আরাফা ও আশুরার মতো সুন্নাত এবং নফল রোযা)। আগের রাতে মাগরিব থেকে শরয়ী দ্বিপ্রহরের আগ পর্যন্ত নিয়ত করা যায়। রাতে করা উত্তম। শুধু “রোযা রাখছি” বললেই যথেষ্ট।
  • অনির্দিষ্ট ফরয বা ওয়াজিব রোযা (পুরোনো রমযানের কাযা, কাফফারার রোযা)। মাগরিব থেকে ফজর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নিয়ত করতে হবে এবং রোযার ধরন নির্দিষ্ট করতে হবে। ফজরের পর নিয়ত করলে তা নফল হয়ে যায়।

শরয়ী দ্বিপ্রহর মানে ফজর ও মাগরিবের মাঝের সময়ের মধ্যবিন্দু, দুপুর বারোটা নয়। যেমন ফজর ভোর ৫টায় আর মাগরিব বিকেল ৫টায় হলে শরয়ী দ্বিপ্রহর সকাল ১১টা।

সুন্নাত ও আদব

  • সাহরি খাওয়া এবং ফজরের কিছু আগে পর্যন্ত দেরি করে খাওয়া।
  • সূর্যাস্ত হওয়ামাত্র ইফতার করা।
  • ইফতারের দোয়া পড়া, যার শুরু “আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু”।
  • রোযা অবস্থায় কথা ও আচরণে সংযত থাকা।

যে কাজে রোযা ভাঙে

হানাফী গাইডে দুটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে।

ইচ্ছাকৃতভাবে করলে কাযা ও কাফফারা, শুধু রমযানে:

  • পানাহার, বা এমন কিছু গ্রহণ করা যা শরীরকে পুষ্টি, ওষুধ বা তৃপ্তি দেয়।
  • সহবাস, সামনে বা পেছনে, বীর্যপাত হোক বা না হোক।
  • স্ত্রী বা স্বামীর মুখের লালা গিলে ফেলা।

ভুলে খেলে বা পান করলে রোযা ভাঙে না। বুখারীর হাদীসে এসেছে, “যে রোযাদার ভুলে খেল বা পান করল, সে তার রোযা পূর্ণ করুক।”

ভুলে বা বাধ্য হয়ে হলে শুধু কাযা: উদাহরণের মধ্যে আছে:

  • সূর্যাস্ত হয়েছে ভেবে ইফতার করা, অথচ হয়নি; ফজর হয়ে গেছে বুঝে না থাকায় সাহরি খেয়ে ফেলা।
  • দাঁতের ফাঁকে থাকা ছোলার সমান বা তার চেয়ে বড় খাবার গিলে ফেলা।
  • টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ বা ওযু-গোসলের কুলির পানি গিলে ফেলা।
  • ইচ্ছা করে মুখভরা বমি করা, বা মুখভরা বমি গিলে ফেলা।
  • নাকের পানি গলা বা মগজে পৌঁছানো, ইনহেলার বা ইচ্ছাকৃত ধোঁয়া শ্বাসে নেওয়া।
  • হস্তমৈথুন বা স্পর্শের কারণে বীর্যপাত।
  • পায়ু বা যোনিপথে ভেজা কিছু প্রবেশ করানো।

যে কাজে রোযা ভাঙে না

  • ভুলে পানাহার বা সহবাস।
  • দাঁতের ফাঁকের ছোলার চেয়ে ছোট খাবার।
  • নিজের লালা, কফ বা কুলির পর মুখে থাকা ভেজা ভাব গিলে ফেলা।
  • মিসওয়াক বা ব্রাশ করা, যদি কিছু গিলে না ফেলা হয়।
  • অনিচ্ছায় বমি হওয়া, বা মুখে আসা বমি ফিরে না যাওয়া।
  • হঠাৎ স্বপ্নদোষ হওয়া, দেখা বা ভাবনা থেকে বীর্যপাত।
  • সুরমা, চোখের ড্রপ, কন্টাক্ট লেন্স।
  • কানে পানি যাওয়া, কান পরিষ্কার করা, তেল বা ক্রিম মাখা, রক্ত পরীক্ষা।
  • গীবত করা (গুনাহ হলেও রোযা ভাঙে না)।

জুনুবী অবস্থায় ফজর হলেও রোযা শুদ্ধ। আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ স্ত্রীসঙ্গমজনিত জুনুবী অবস্থায় ফজর পেয়েও রোযা রাখতেন (মুসলিম)। তবে নামাযের জন্য গোসল করতে হবে।

মাকরূহ কাজ

  • বিনা প্রয়োজনে খাবার চেখে দেখা বা চিবানো।
  • কামভাবের সঙ্গে চুমু বা স্পর্শ, যেখানে সহবাস বা বীর্যপাতের আশঙ্কা আছে।
  • লালা জমিয়ে গিলে ফেলা।
  • ওযু-গোসলে অতিরিক্ত কুলি করা বা নাকে পানি টানা।
  • যে কাজ রোযাদারকে দুর্বল করে, যেমন রক্ত দেওয়া।

কাফফারা

ইচ্ছাকৃতভাবে রমযানের রোযা ভাঙলে কাযার সঙ্গে কাফফারা। প্রথমে একটানা ষাটটি রোযা। কোনো শরয়ী কারণ ছাড়া মাঝখানে ছেড়ে দিলে আবার নতুন করে গুনতে হয়। ঈদের দিন ও আইয়ামে তাশরীকের দিন গণনায় ধরা যায় না। ষাট দিন রোযা রাখতে একেবারে অক্ষম হলে ষাজন মিসকিনকে দুই বেলা খাওয়ানো, বা প্রত্যেককে অর্ধ বা এক সা’ শস্য বা খেজুর, বা তার মূল্য দেওয়ার কথা গাইডে এসেছে। এক সা’ প্রায় দুই কেজি, পূর্ণ সা’ প্রায় চার কেজি বলে সেখানে উল্লেখ আছে।

Author

মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * চিহ্নিত।