ভিন্নমত বা ভিন্ন ধর্মের মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের আচরণ
অনেক পরিবারে এমন হয় যে, সন্তান দীনের পথে চলতে চায়, কিন্তু মা-বাবা তা পছন্দ করেন না। আবার কেউ নতুন করে ইসলামে এসেছেন, আর তাঁর মা-বাবা এখনো অমুসলিম। এমন অবস্থায় সন্তান কীভাবে আচরণ করবে, মা-বাবার কতটুকু কথা মানবে, কোথায় অপারগতা জানাবে, এসব প্রশ্ন মনে আসে। কুরআন ও সহীহ হাদীস এ বিষয়ে পরিষ্কার পথনির্দেশ দিয়েছে। এই লেখায় সেই নির্দেশনা এবং হানাফী ফতোয়ার সারকথা সংক্ষেপে সাজিয়ে বলা হলো।
কুরআনের নির্দেশ: আনুগত্যের সীমা, কিন্তু সদ্ভাবের নির্দেশ অটুট
আল্লাহ তাআলা বলেন, “পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন বিষয়কে শরীক স্থির করতে পীড়াপীড়ি করে, যার জ্ঞান তোমার নেই; তবে তুমি তাদের কথা মানবে না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ভাবে সহঅবস্থান করবে। যে আমার অভিমুখী হয়, তার পথ অনুসরণ করবে। অতঃপর তোমাদের প্রত্যাবর্তন আমারই দিকে এবং তোমরা যা করতে, আমি সে বিষয়ে তোমাদেরকে জ্ঞাত করবো।” (সূরা লুকমান, ৩১:১৫)
এই আয়াতের দুটি অংশ আছে। প্রথমত, শিরকের মতো বিষয়ে মা-বাবার কথা মানা যাবে না। দ্বিতীয়ত, তারপরও দুনিয়ায় তাঁদের সঙ্গে সদ্ভাবে থাকতে হবে। অর্থাৎ বিরোধের জায়গা শুধু ওই নির্দিষ্ট বিষয়ে, সম্পর্কে নয়।
সূরা বনী ইসরাঈলের নির্দেশও সবার জন্য প্রযোজ্য, “তোমার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও এবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব-ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না এবং বল তাদেরকে শিষ্ঠাচারপূর্ণ কথা।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৩)
সাহাবীয়া আসমা (রাযি.)-এর প্রশ্ন
আসমা বিনতে আবূ বাকর (রাযি.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আমার আম্মা মুশরিক অবস্থায় আমার নিকট এলেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফাতওয়া চেয়ে বললাম, তিনি আমার প্রতি খুবই আকৃষ্ট, এমতাবস্থায় আমি কি তার সঙ্গে সদাচরণ করব? তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তুমি তোমার মায়ের সঙ্গে সদাচরণ কর।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬২০)
সহীহ বুখারীর আরেকটি বর্ণনায় ইবনু উয়াইনাহ (রহ.) বলেন, এ ঘটনা প্রসঙ্গেই আল্লাহ তাআলা এই আয়াত নাযিল করেন, “ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা মুমতাহিনা, ৬০:৮; সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৭৮)
আসমা (রাযি.)-এর মা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি, কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। মা-বাবা অমুসলিম হলেও মুসলিম সন্তানের জন্য তাঁদের প্রতি সম্মান ও দয়া থেকে বিরত থাকার অনুমতি নেই।
হানাফী ফতোয়ার সারকথা
১. মা-বাবা পরিবারের সদস্য, বন্ধু নয়। মুফতি অনলাইনের হানাফী ফতোয়ায় (মুফতি যাকারিয়া মাকাদা; যাচাই করেছেন মুফতি ইবরাহীম সালেজী) বলা হয়েছে, অমুসলিম মা-বাবা ও ভাইবোন পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু নয়। মুসলমান তাঁদের সঙ্গে সব বৈধ বিষয়ে সদ্ব্যবহার ও সম্মানের সঙ্গে চলবে। এই সদাচরণ তাঁদের ইসলামের দিকে আসার কারণও হতে পারে।
২. পাপে আনুগত্য নেই, কিন্তু খিদমত আছে। দারুল ইফতা আযাদভিলের হানাফী ফতোয়ায় (মুফতি মুহাম্মাদ সাঈদ মোতারা) বলা হয়েছে, মা-বাবা অমুসলিম বা অত্যাচারী হলেও সন্তান তাঁদের সম্মান ও খিদমত করবে। তবে কুফর বা আল্লাহর অবাধ্যতার বিষয়ে তাঁদের আনুগত্য করা যাবে না। ফতোয়ায় একটি প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, খ্রিস্টান পিতাকে গির্জায় পৌঁছে দেওয়া জায়েয নয়, কারণ তাতে পাপে সহযোগিতা হয়। তবে গির্জা থেকে তাঁকে ফিরিয়ে আনা জায়েয ও প্রশংসনীয়। সন্তান কঠোর না হয়ে বিনয়ের সঙ্গে অপারগতা জানাবে, বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা করবে এবং হিকমত ও দয়ার সঙ্গে তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকবে।
৩. দীনদারির কারণে মা-বাবা অসন্তুষ্ট হলে। সীকার্স গাইডেন্সের হানাফী ফতোয়ায় (উস্তাযা রাইদা শাহ ইদিল; যাচাই করেছেন ফারায রাব্বানী) এক সন্তানের প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে, দীন মানা ভুল নয়। মা-বাবার সঙ্গে রুঢ়ভাবে বা অসম্মানজনক ভাষায় কথা বললে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন। ফরয ইবাদত বজায় রাখতে হবে, প্রয়োজনে গোপনে পালন করা যাবে, আর যেসব কথায় মা-বাবা কষ্ট পান, সেগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।
ব্যবহারিক কিছু পরামর্শ (ফতোয়া থেকে)
সীকার্স গাইডেন্সের ফতোয়ায় সন্তানকে এই কাজগুলো করতে বলা হয়েছে:
- মা-বাবা কঠোর হলেও নরম ভাষায় কথা বলা।
- নসীহত করতে গিয়ে তাঁরা বিরক্ত হলে সেই প্রসঙ্গ বন্ধ করে অন্য আলাপে যাওয়া।
- তাঁদের ফরমাশ খাটা, চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া, প্রিয় খাবার রান্না করা, তাঁদের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা এবং কথা বলে সময় দেওয়া।
- তাঁদের কৃতজ্ঞতা জানানো, কথায় এবং কাজে।
- প্রতি ফরয নামাযের পর তাঁদের হিদায়াতের জন্য দোয়া করা, আর শেষ রাতে উঠে আল্লাহর কাছে তাঁদের অন্তর নরম করে দেওয়ার দোয়া করা।
ফতোয়ায় আরও বলা হয়েছে, সাহাবীদের অনেকের মা-বাবা ইসলামকে মেনে নেননি, তবু সাহাবীরা দৃঢ় ছিলেন এবং মা-বাবার প্রতি সম্মান ও দয়া বজায় রেখেছিলেন। চূড়ান্ত ফল আল্লাহর হাতে।
সংক্ষেপে
- শিরক ও পাপে মা-বাবার আনুগত্য নেই, কিন্তু সদ্ভাব ও খিদমত অব্যাহত থাকবে।
- অসম্মান বা কর্কশ ভাষা কোনো অবস্থায় বৈধ নয়।
- দাওয়াত হিকমত ও নম্রতার সঙ্গে হবে।
- প্রয়োজনে আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আল্লাহ আমাদের মা-বাবাকে হিদায়াত দান করুন এবং আমাদের তাঁদের প্রতি সদাচারী হওয়ার তাওফীক দিন। আমীন।
