মায়ের মর্যাদা: নবীজি ﷺ তিনবার বললেন, “তোমার মা”

আমরা সবাই জানি, মায়ের ঋণ শোধ করা যায় না। তবু ব্যস্ততার মধ্যে মাকে একটা ফোন করতে দেরি হয়ে যায়, দুটো ভালো কথা বলার সময় মেলে না। ইসলাম মাকে কতটা উঁচু আসনে বসিয়েছে, তা একবার ভালো করে জেনে নিলে হয়তো আমাদের আচরণে বদল আসবে।

কুরআনে মায়ের কষ্টের স্বীকৃতি

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।” (সূরা লুকমান, ৩১:১৪)

আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, “তার জননী তাকে কষ্টসহকারে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্টসহকারে প্রসব করেছে।” (সূরা আহকাফ, ৪৬:১৫)

খেয়াল করুন, পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতার কথা আল্লাহ নিজের কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই বলেছেন। আর কষ্টের বর্ণনা দিতে গিয়ে বিশেষভাবে মায়ের কথাই এসেছে। মায়ের রাত জাগা, শরীরের ক্লান্তি, সন্তানের জন্য নিজের আরাম ছেড়ে দেওয়া, এসব আল্লাহর কাছে মূল্যবান।

তিনবার মা, তারপর বাবা

আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, এক লোক রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিক হকদার?” তিনি বললেন, “তোমার মা।” লোকটি বলল, “অতঃপর কে?” তিনি বললেন, “তোমার মা।” সে বলল, “অতঃপর কে?” তিনি বললেন, “তোমার মা।” সে বলল, “অতঃপর কে?” তিনি বললেন, “অতঃপর তোমার বাপ।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৭১)

বাবারও বিশাল মর্যাদা আছে। কিন্তু এই হাদীসে নবীজি ﷺ ইচ্ছা করেই মায়ের হকের কথা তিনবার বলেছেন। মায়ের সঙ্গে ভালো ব্যবহারের প্রশ্নে অবহেলার সুযোগ রাখা হয়নি।

ইবাদতের পরেই মা-বাবার হক

আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর উপাসনা কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর।” (সূরা নিসা, ৪:৩৬)

ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, তিনি নবী ﷺ-কে জিজ্ঞেস করলেন, কোন আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়? তিনি বললেন, “যথা সময়ে সালাত আদায় করা।” তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, অতঃপর কোনটি? নবী ﷺ বললেন, “অতঃপর পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫২৭)

অর্থাৎ ঠিক সময়ে নামাযের পরেই পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের স্থান। মায়ের সেবা তাই কোনো ঐচ্ছিক ভদ্রতা নয়, ইবাদতের তালিকার একেবারে সামনের দিকের কাজ।

জান্নাত যে পায়ের নিচে

মুআবিয়া ইবনে জাহিমা (রহ.) বলেন, তাঁর পিতা জাহিমা (রা.) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার ইচ্ছা জানিয়ে পরামর্শ চাইলেন। নবীজি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার মাতা আছে কি?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” নবীজি ﷺ বললেন, “তার খেদমতে লেগে থাক। কেননা, জান্নাত তার পদদ্বয়ের নিচে।” (সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৩১০৪)

একজন সাহাবী বড় একটি আমলের ইচ্ছা নিয়ে এসেছেন, আর নবীজি ﷺ তাঁকে ঘরে মায়ের সেবায় ফিরিয়ে দিলেন। এতে বোঝা যায়, মায়ের সেবা কত বড় ইবাদত।

প্রতিদান হয়তো দেওয়া যায় না, কৃতজ্ঞতা দেওয়া যায়

মা আমাদের জন্য যা করেছেন, সন্তান তার পুরো প্রতিদান দিতে পারে না। কিন্তু তাই বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। প্রতিদান দেওয়া সম্ভব না হলে অন্তত অনুগত থাকা ও কৃতজ্ঞ থাকা সন্তানের কর্তব্য। ভাবুন তো, যে মা এক সময় আমাদের খাওয়া, ঘুম, অসুখ আর কান্নার জন্য রাতের পর রাত জেগেছেন, তিনি আজ শুধু একটু সময়, একটু হাসিমুখ আর একটু যত্ন চান।

মায়ের অবাধ্যতা কেন ভয়ের বিষয়

মুগীরা ইবনে শু’বা (রা.) বলেন, নবী ﷺ বলেছেন, “আল্লাহ তা’আলা তোমাদের উপর হারাম করেছেন, মা-বাপের নাফরমানী করা…” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৭৫)

মা অনেক সময় সবকিছু মুখে বলেন না। কিন্তু একটি তাচ্ছিল্যের কথা বা বিরক্তির ভাব তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দিতে পারে। তাই বড় অন্যায় তো দূরের কথা, ছোট অবহেলা থেকেও সাবধান থাকা চাই।

মায়ের সঙ্গে সম্পর্কটা সুন্দর রাখার কয়েকটি উপায়

আলেমরা জীবিত মা-বাবার হক হিসেবে যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন, তার সারকথা এই: শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, আনুগত্য, সেবা-যত্ন, প্রয়োজন পূরণ, আরামের দিকে খেয়াল এবং দূরে থাকলে মাঝে মাঝে দেখা করা। এগুলো কাজে লাগানোর ছোট পথ:

  • রোজ অন্তত একবার মায়ের সঙ্গে সময় নিয়ে কথা বলুন। মোবাইল সরিয়ে রেখে শুনুন।
  • মায়ের পছন্দের কোনো জিনিস মাঝেমধ্যে নিয়ে যান। উপহারের দামের চেয়ে মনে রাখাটাই বড়।
  • মা অসুস্থ হলে নিজে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান, ওষুধ ঠিকমতো খাচ্ছেন কি না দেখুন।
  • স্বামী বা স্ত্রী এবং সন্তানদেরও মায়ের প্রতি আদব শেখান।
  • বয়স হলে মায়েরা প্রায়ই একা হয়ে পড়েন। তাঁর কাছে বসে পুরোনো গল্প শুনুন।

আজকের ব্যস্ত সমাজে অনেক মা, বিশেষ করে বয়স হলে, একাকিত্বে ভোগেন। সন্তানরা কাজে, নাতি-নাতনিরা পড়ায়, আর তিনি ঘরের এক কোণে বসে থাকেন। তাই মায়ের সেবা মানে শুধু খাবার বা ওষুধ নয়, তাঁর পাশে থাকাটাও।

মা চলে গেলেও হক থাকে

মা-বাবার মৃত্যুর পর সন্তানের করণীয়ও আলেমরা উল্লেখ করেছেন: তাঁদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া, নেক আমলের সওয়াব পাঠানো, তাঁদের আত্মীয়-বন্ধুদের সম্মান করা, ঋণ ও আমানত পরিশোধ করা, বৈধ অসিয়ত পূরণ করা এবং মাঝেমধ্যে কবর যিয়ারত করা।

একটি দোয়া

কুরআনে মা-বাবার জন্য যে দোয়া শেখানো হয়েছে: “হে পালনকর্তা, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৪)

আল্লাহ আমাদের সবাইকে মায়ের হক আদায়ের তাওফীক দিন। আমীন।

Author