গর্ভবতী নারীর রোযা: কখন রাখবেন, কখন ছাড়বেন, কাযা ও ফিদিয়ার মাসআলা
রমযান এলে গর্ভবতী নারীর সামনে প্রশ্ন আসে: রোযা রাখব, না ছাড়ব? ছাড়লে কাযা করতে হবে, নাকি ফিদিয়া দিতে হবে? এই লেখায় কুরআনের আয়াত, তিরমিযীর হাদীস এবং চারটি হানাফি ফতোয়ার আলোকে মাসআলাগুলো গুছিয়ে বলা হলো: দারুল উলুম দেওবন্দের দুটি ফতোয়া (নম্বর ১৫২৮/১২০৯/এল=১৪৩০ ও ১৩৩৪/১১৬৪=বি-১৪২৯), দারুল উলুম ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর মুফতি ওয়াসীম খানের উত্তর এবং শরীয়াহ বোর্ড। মাসআলাগুলো ফতোয়া থেকে হুবহু নেওয়া, আমাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নয়। ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য মুফতি ও অভিজ্ঞ মুসলিম চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
কুরআনের মূলনীতি: আল্লাহ সহজ করতে চান
আল্লাহ বলেন, “রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কুরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না।” (সূরা বাকারা, ২:১৮৫)।
এর আগের আয়াতেও অসুস্থ ও মুসাফিরের জন্য অন্য সময়ে রোযা পূরণ করার কথা আছে: “অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুখ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে।” (সূরা বাকারা, ২:১৮৪)।
হাদীসে গর্ভবতী ও দুধদানকারীর জন্য ছাড়
তিরমিযীর ৭১৫ নম্বর হাদীসের অধ্যায়ের শিরোনামই হলো, গর্ভবতী ও দুধদানকারী নারীর রোযা ভাঙার অনুমতি প্রসঙ্গে। আনাস ইবনে মালিক আল-কাবী (রাঃ) বর্ণিত এই হাদীসে নবীজি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ মুসাফিরের থেকে রোযা এবং নামাযের অর্ধেক সরিয়ে দিয়েছেন, এবং গর্ভবতী ও দুধদানকারী নারী থেকেও রোযা সরিয়ে দিয়েছেন। (জামে তিরমিযী, হাদীস ৭১৫; আলবানী: হাসান সহীহ)। আবু দাউদ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহতেও এর সমর্থক বর্ণনা আছে বলে tohed.com-এর পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে। (এ অংশের শব্দ আমরা সংক্ষেপে নিজের ভাষায় দিয়েছি, কারণ পুরো বর্ণনাটি দীর্ঘ।)
দেওবন্দের ফতোয়া: ১৫২৮/১২০৯/এল=১৪৩০
প্রশ্ন ছিল, পাঁচ মাসের গর্ভবতী স্ত্রী রোযা রাখতে গেলে ক্লান্ত ও অসুস্থ বোধ করেন, তিনি কী করবেন। উত্তরের সারকথা:
- গর্ভাবস্থায়ও নারীর রোযা রাখা উচিত।
- নিজের বা গর্ভস্থ সন্তানের জীবনের আশঙ্কা থাকলে রোযা না রাখার অনুমতি আছে।
- এমন কারণে ছাড়া রোযা পরে কাযা করতে হবে।
- কাফফারা নেই।
দেওবন্দের ফতোয়া: ১৩৩৪/১১৬৪=বি-১৪২৯
এ ফতোয়ায় প্রশ্ন ছিল, সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে জুনে, আর রমযান আসবে আগস্টে; তখন সন্তান মায়ের দুধের ওপর নির্ভর করবে। উত্তরে বলা হয়েছে:
- রোযা রাখলে নিজের বা সন্তানের জীবনের আশঙ্কা থাকলে, যুক্তিসংগত সম্ভাবনা বা অভিজ্ঞ মুসলিম চিকিৎসকের পরামর্শ থাকলে, রোযা না রাখার অনুমতি আছে এবং পরে কাযা করতে হবে।
- জীবনের কোনো আশঙ্কা না থাকলে রোযা ফরয।
- স্বামী দুধ-মা রাখার সামর্থ্য রাখলে দুধ পান করানোর অজুহাতে রোযা ছাড়া যাবে না।
- শিশু মা ছাড়া অন্য কারও দুধ না নিলে রোযা না রাখা জায়েজ, পরে কাযা করতে হবে।
ফতোয়ায় দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতারের (শামী) উদ্ধৃতি আছে। (এই গ্রন্থ থেকে সরাসরি আমরা মেলাইনি।)
কাযা, না ফিদিয়া?
মুফতি ওয়াসীম খান (ত্রিনিদাদ) লিখেছেন, গর্ভবতী বা দুধদানকারী নারী নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা করলে রোযা ভাঙতে পারেন এবং প্রতিটি দিনের কাযা করতে হবে। কাযা যে ফরয, এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভেদ জানা নেই বলে ইবনে কুদামার (আল-মুগনী) কথা তিনি উদ্ধৃত করেছেন।
ফিদিয়া নিয়ে মতভেদ আছে। হানাফি মত, যা আবু হানিফা, আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ (রহঃ)-এর বলে উদ্ধৃত হয়েছে, শুধু কাযা, ফিদিয়া নয়। শাফেয়ী ও আহমাদ (রহঃ)-সহ অন্যরা কাযার সঙ্গে ফিদিয়া দেওয়ার কথা বলেছেন। ফতোয়ার লেখক হানাফি মত অনুযায়ী ফিদিয়া আবশ্যক মনে করেন না। তাঁর যুক্তি, ফিদিয়ার মত ইবনে আব্বাসের (রাঃ) ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট হাদীস নেই। ফতোয়ায় এ-ও উল্লেখ আছে, সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি ও ইবনে উসাইমীন (রহঃ)-এর মতেও শুধু কাযা প্রযোজ্য, ফিদিয়া যথেষ্ট নয়।
শরীয়াহ বোর্ডের উত্তর
শরীয়াহ বোর্ডের (হানাফি) ফতোয়ায় বলা হয়েছে, গর্ভবতী নারী নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা করলে রোযা ভাঙতে পারেন এবং পরে কাযা করা আবশ্যক। দুধ পান করানোর সময় রোযা রাখা সম্ভব হলে রাখবেন, আর রাখলে দুধ কমে যাওয়ার বা শিশুর ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে ছেড়ে পরে কাযা করবেন। ফতোয়ায় ফাতাওয়া তাতারখানিয়ার উদ্ধৃতি এবং হাসান বসরী ও ইবরাহীম নাখায়ীর (রহঃ) মত বুখারীর তাফসীর অধ্যায়ের বরাতে এসেছে। (এই উদ্ধৃতি ফতোয়া থেকে নেওয়া।)
সারকথা
- আশঙ্কা না থাকলে গর্ভবতী নারীও রোযা রাখবেন।
- নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে ছাড়া জায়েজ, পরে কাযা আবশ্যক।
- হানাফি মতে ফিদিয়া আবশ্যক নয়; অন্য মাযহাবে ভিন্ন মত আছে।
- সন্দেহ থাকলে অভিজ্ঞ মুসলিম চিকিৎসক ও মুফতির পরামর্শ নিন, নিজে থেকে কঠিন সিদ্ধান্ত নেবেন না।
আল্লাহ গর্ভবতী মায়েদের সহজ করুন ও সুস্থ রাখুন।
