ঘর সাজানোর সহজ বুদ্ধি, রং আর আলোর ব্যবহার
ঘর সাজাতে মোটা টাকা খরচ করতে হয়, এই ধারণা ঠিক নয়। একটু বুদ্ধি, একটু রুচি আর পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস থাকলে সাধারণ ঘরও অসাধারণ হয়ে ওঠে। ঘরকে সুন্দর করে দামি আসবাব নয়, গুছিয়ে রাখা, ঠিকমতো আলো আর মানানসই রং।
ইসলাম সৌন্দর্যকে পছন্দ করে। নবীজি ﷺ বলেছেন, আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন (মুসলিম, হাদীস ৯১)। তবে সৌন্দর্যের নামে জাঁকজমক আর অপচয় নয়। আমাদের ঘরের সাজ হোক পরিমিত, পরিচ্ছন্ন আর শান্ত।
রং বাছাইয়ের কিছু কথা
ঘরের রং মেজাজের ওপর প্রভাব ফেলে। হালকা ক্রিম, সাদা, হালকা সবুজ বা আকাশি রঙে ঘর খোলামেলা ও শান্ত দেখায়। ছোট ঘরে গাঢ় রং না দিয়ে হালকা রং দিলে জায়গা বড় মনে হয়। বসার ঘরে হালকা হলুদ বা বেইজের মতো উষ্ণ রং আপ্যায়নের আমেজ আনে। শোবার ঘরে নরম, ঠান্ডা রং ভালো, যাতে ঘুমটা আরামের হয়।
একটি ঘরে সব রং না মিশিয়ে দুই-তিনটি রঙে থাকুন। একটি প্রধান রং, একটি পরিপূরক রং, আর অল্প একটু উজ্জ্বল রং, যেমন কুশন বা পর্দায়। এতে ঘর গোছানো ও পরিপাটি দেখায়।
আলোকে কাজে লাগান
আলো ঘরের প্রাণ। দিনের বেলা যতটা পারেন প্রাকৃতিক আলো ঘরে আসতে দিন। জানালার পর্দা হালকা রাখুন। সকালে পর্দা সরিয়ে দিলে ঘরে রোদ ঢোকে, তাতে ঘর শুধু আলো পায় না, জীবাণুও কমে।
রাতে কড়া সাদা আলোর বদলে নরম হলুদ আলো ব্যবহার করুন। এতে চোখ আরাম পায়, মনও শান্ত হয়। পড়ার টেবিলে আলাদা বাতি রাখুন, যাতে বাচ্চাদের চোখে চাপ না পড়ে। বিদ্যুৎ খরচ কমাতে এলইডি বাল্ব ব্যবহার করুন। দরকার না থাকলে বাতি বন্ধ রাখুন, কারণ অপচয় আমাদের জন্য শোভন নয়।
আসবাব গোছানোর নিয়ম
ঘরে আসবাব যত কম, তত খোলামেলা লাগে। দরকারি জিনিস রেখে বাকিগুলো সরিয়ে দিন। চলার পথে যেন কোনো বাধা না থাকে। সোফা বা চেয়ার এমনভাবে সাজান, যাতে সবাই একে অপরের সাথে গল্প করতে পারে। দেয়াল ঘেঁষে বড় আসবাব রেখে মাঝখানটা ফাঁকা রাখলে ঘর বড় দেখায়।
ছোট ঘরে বহুমুখী আসবাব কাজে আসে, যেমন নিচে বাক্স থাকা খাট, ভাঁজ করা টেবিল, বইয়ের তাকসহ বসার জায়গা। এতে জায়গা বাঁচে, জিনিসপত্রও গুছিয়ে রাখা যায়।
দেয়াল ও কোণ সাজান
দেয়ালে সুন্দর হস্তলিপিতে লেখা কোরআনের আয়াত বা দুআ ঝুলিয়ে রাখতে পারেন। এতে ঘরে একটা প্রশান্তির ভাব আসে। এ ছাড়া প্রকৃতির দৃশ্য, ফুল, পাতা বা নকশার ছবিও বেছে নিতে পারেন। পরিবারের ছোটদের আঁকা ছবি দেয়ালে ঝুলিয়ে দিলে তারা খুব খুশি হয়।
ঘরের এক কোণে ছোট একটি টবের গাছ রাখলে ঘর সতেজ লাগে। মানিপ্ল্যান্ট, স্নেক প্ল্যান্ট বা অ্যালোভেরা কম যত্নেই বেড়ে ওঠে। জানালার পাশে বা টেবিলের ওপর রাখুন।
বাচ্চাদের ঘর সাজানো
শিশুদের ঘর একটু আলাদা করে ভাবতে হয়। তাদের পড়ার টেবিল জানালার কাছে রাখুন, যাতে দিনের আলো আসে। খেলনা রাখার জন্য নিচু তাক বা বড় বাক্স রাখুন, যাতে তারা নিজেরাই গুছিয়ে রাখতে পারে। ধারালো কোণওয়ালা আসবাবের কোণে নরম রাবার লাগিয়ে দিন। দেয়ালে ওদের উচ্চতা মাপার একটা চার্ট ঝোলাতে পারেন, এতে তারা মজা পায়। ঘুমের ঘরে উজ্জ্বল আলো না রেখে হালকা বাতি রাখুন, যাতে ঘুমের ব্যাঘাত না হয়।
পুরনো জিনিসে নতুন রূপ
নতুন কিছু না কিনেও ঘরের চেহারা বদলানো যায়। পুরনো কাচের বোতল ধুয়ে ফুলদানি বানানো যায়। পুরনো কাঠের বাক্সে রং করে তাক হয়ে যায়। পুরনো কাপড় থেকে কুশন কভার সেলাই করা যায়। এভাবে অপচয়ও কমে, ঘরও নিজের একটা আলাদা ছাপ পায়।
বছরে একবার ঘরের আসবাব এদিক-ওদিক সরিয়ে বসান। জায়গা বদলালে ঘর নতুন মনে হয়, আর ঝেড়েমুছে নতুন করে সাজানোর সুযোগও মেলে।
সুগন্ধ ও পরিচ্ছন্নতা
ঘর সুন্দর হোক বা সাধারণ, পরিচ্ছন্ন না থাকলে ভালো লাগে না। রোজ ঝাড়ু ও মোছার অভ্যাস রাখুন। আসবাবের ধুলো মুছুন। মাসে একবার পর্দা ধুয়ে নিন। নবীজি ﷺ সুগন্ধি ভালোবাসতেন। ঘরে আতর, আগরবাতি বা প্রাকৃতিক সুগন্ধ ব্যবহার করতে পারেন। রান্নাঘর আর বাথরুম থেকে যেন দুর্গন্ধ না আসে, সেদিকে নজর রাখুন।
মেহমানের জন্য প্রস্তুতি
বসার ঘরটা সবসময় অতিথির জন্য তৈরি রাখুন। পরিষ্কার চাদর, গোছানো কুশন, পানির জগ ও গ্লাস হাতের কাছে থাকলে হঠাৎ কেউ এলে বিব্রত হতে হয় না। নবীজি ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন মেহমানকে সম্মান করে (বুখারী, হাদীস ৬০১৮)। সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন ঘর মেহমানের প্রতি আমাদের সম্মানের এক নীরব প্রকাশ।
বাজেটের মধ্যে থাকুন
ঘর সাজাতে গিয়ে অনেকেই বাজেটের বাইরে চলে যান। মাসের আয় থেকে ঘর সাজানোর জন্য ছোট একটা অংশ আলাদা করে রাখুন। প্রতি মাসে একটি করে ছোট জিনিস যোগ করুন, যেমন একটি সুন্দর পর্দা, একটি নতুন কুশন, একটি ফুলদানি। একসাথে অনেক টাকা খরচ করার চেয়ে ধীরে ধীরে সাজানো বেশি টেকসই হয়। কেনার আগে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, জিনিসটা কি সত্যিই দরকার? যা লাগে না, তা কিনে ঘরে জমানোর কোনো মানে নেই।
শেষ কথা
ঘরের সাজ আসলে ঘরের মানুষগুলোর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। যে ঘরে শান্তি আছে, পরিচ্ছন্নতা আছে, আলো আছে, সেটাই সবচেয়ে সুন্দর ঘর। আজ একটা কোণ বেছে নিন, একটু সাজান, তারপর দেখুন সামান্য বদলেই ঘরটা কেমন হাসছে।
আল্লাহ আমাদের ঘরকে বরকত, শান্তি ও ভালোবাসায় ভরে দিন। আমীন।
