বিয়ের আংটি: নারী-পুরুষের জন্য সোনা-রুপার বিধান
অনেক পরিবারে বিয়ের সময় বর-কনের আংটি বদল একটি রীতির মতো হয়ে গেছে। বরের জন্য সোনার আংটি কেনা হয়, কখনো স্বর্ণ-জড়ানো ঘড়ি বা চেইনও উপহার দেওয়া হয়। এই লেখায় আসকিমাম (মুফতি ইবরাহীম দেসাই) ও দারুল উলুম দেওবন্দের দারুল ইফতার দুটি হানাফি ফতোয়া থেকে বিয়ের আংটির বিধান সাজানো হলো। ফতোয়ার কথা ও সূত্র ফতোয়ার মতোই রাখা হয়েছে। ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে স্থানীয় মুফতির পরামর্শ নিন।
আসকিমামের প্রশ্ন: আংটি কে পরতে পারেন
আসকিমামে প্রশ্ন করা হয়েছিল, স্বামী-স্ত্রী দুজনের জন্য, শুধু স্ত্রীর জন্য, নাকি কারও জন্যই বিয়ের আংটি পরা জায়েয? মুফতি ইবরাহীম দেসাইয়ের উত্তরের সারকথা:
- নারী যেকোনো ধরনের বিয়ের আংটি দিয়ে নিজেকে সাজাতে পারেন, সেটি সোনার হোক, রুপার হোক বা অন্য কিছুর।
- পুরুষের জন্য সোনা ব্যবহার জায়েয নয়। উত্তরের ভাষায়: “পুরুষদের জন্য সোনা ব্যবহার জায়েয নয়।”
- পুরুষ রুপার আংটি পরতে পারেন, তবে সীমিত ওজনের।
- পুরুষের রুপার আংটি সাড়ে চার মাশার সমান, অর্থাৎ ৬৭.৫ গ্রেইন ট্রয় ওজনের বেশি হতে পারবে না।
উত্তরের সূত্র হিসেবে ফাতাওয়া রহীমিয়্যাহ, প্রথম খণ্ড, পৃ. ১৪০ (মাকতাবা রহীমিয়্যাহ, রান্দের, সুরাত সংস্করণ) উল্লেখ আছে। উত্তরে কোনো আয়াত বা হাদীসের সূত্র নেই।
দেওবন্দের ফতোয়া: সোনার প্রলেপযুক্ত জিনিসও কি চলে?
দারুল উলুম দেওবন্দের ১১৩৯/১০৮৪/N=৯/১৪৩৪ নম্বর ফতোয়ায় প্রশ্ন ছিল, পুরুষের জন্য সোনার প্রলেপযুক্ত জিনিস, যেমন আংটি ও ঘড়ি, ব্যবহার করা জায়েয কি না। উত্তরে বলা হয়েছে, বিয়ের উপলক্ষে হোক বা অন্য কোনো সময়, পুরুষের জন্য কোনো সোনার জিনিস ব্যবহার করা জায়েয নয়, তা হারাম। ফতোয়ায় এর কারণ হিসেবে মিশকাত শরীফ (পৃ. ৩৭৮)-এর উল্লেখ আছে।
ফতোয়ায় আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসের আরবি পাঠ উদ্ধৃত হয়েছে: “إن هذين حرام على ذكور أمتي” (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ ও নাসায়ী)। হাদীসের ঘটনা হলো, নবীজি (সা.) রেশম নিয়ে ডান হাতে এবং সোনা নিয়ে বাম হাতে রাখলেন, তারপর বললেন, এ দুটি আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম। (ঘটনার বিবরণ ফতোয়ার সারাংশ থেকে আমাদের ভাষায়।)
ফতোয়াটিতে প্রশ্নের “সোনার প্রলেপ” অংশ আলাদা করে বলা হয়নি, সাধারণভাবে সোনার ব্যবহারকে হারাম বলা হয়েছে। প্রলেপযুক্ত নির্দিষ্ট জিনিস নিয়ে সন্দেহ থাকলে মুফতির কাছে জিজ্ঞাসা করুন।
আসকিমামের আরেকটি উত্তর: সোনালি রঙ, নকল সোনা ও রেশম
আসকিমামের (মুফতি ইবরাহীম দেসাই) আরেকটি উত্তরে প্রশ্ন ছিল, পুরুষ কি সোনার জিনিস, সোনালি রঙের জিনিস (যেমন সোনালি টুপি বা কোট), নকল সোনা এবং রেশম পরতে পারেন? উত্তরের সারকথা:
- রেশম পরা পুরুষের জন্য জায়েয নয়।
- খাঁটি সোনা ব্যবহার পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ।
- যে জিনিসে শুধু সোনার প্রলেপ আছে বা যা নকল সোনা, তা জায়েয, তবে শর্ত হলো সাজসজ্জার উদ্দেশ্যে পরা যাবে না। উত্তরে সাজসজ্জার জন্য সোনালি বা নকল জিনিস পরতেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
- উত্তরে কোনো আয়াত, হাদীস বা কিতাবের সূত্র নেই।
লক্ষ করার বিষয়, দেওবন্দের ফতোয়া সাধারণভাবে সোনার জিনিসকে হারাম বলেছে, আর আসকিমামের এই উত্তরে প্রলেপযুক্ত বা নকল জিনিস শর্তসাপেক্ষে জায়েয বলা হয়েছে। দুই উত্তরের এই পার্থক্য নিয়ে স্থানীয় মুফতির কাছে জেনে নেওয়াই নিরাপদ।
দুই উৎসে কী আছে
- নারীর জন্য: আসকিমাম বলেছে যেকোনো আংটি, সোনা-রুপাসহ।
- পুরুষের জন্য সোনা: আসকিমাম ও দেওবন্দ, দুই জায়গাতেই জায়েয নয়।
- পুরুষের জন্য রুপা: আসকিমামে সাড়ে চার মাশা পর্যন্ত।
- সূত্র: আসকিমাম, ফাতাওয়া রহীমিয়্যাহ ১/১৪০। দেওবন্দ, মিশকাত পৃ. ৩৭৮ এবং আহমাদ, আবু দাউদ ও নাসায়ীতে আলী (রা.)-এর হাদীস।
বিয়ের আয়োজনে প্রয়োগ
- বরের জন্য সোনার আংটি, চেইন বা ঘড়ি উপহার দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
- বর আংটি পরতে চাইলে রুপার আংটি বেছে নিন এবং ওজন সাড়ে চার মাশার বেশি যেন না হয়, তা দেখে নিন (আসকিমামের ফতোয়া অনুযায়ী)।
- কনের জন্য সোনা-রুপার আংটি জায়েয, তবে অপচয় ও দেখানোর প্রতিযোগিতা এড়ানো ভালো। (এই পরামর্শটি আমাদের, ফতোয়ার অংশ নয়।)
- আংটি বদলকে বিয়ের শর্ত বা ফরয রীতি বানাবেন না। নিকাহের মূল ভিত্তি ইজাব-কবুল ও সাক্ষী, আংটি নয়। (এটিও আমাদের পরামর্শ।)
সারকথা
পুরুষের জন্য সোনা ব্যবহার জায়েয নয়, বিয়ের আংটিও এর ব্যতিক্রম নয়। নারী সোনা-রুপা যা খুশি পরতে পারেন। পুরুষের জন্য রুপার আংটি সীমিত ওজনে জায়েয। এই লেখার ফতোয়াগুলো দেওবন্দ ও আসকিমামের, স্থানীয় ক্ষেত্রে মুফতির সঙ্গে কথা বলুন।
