বার্ধক্যে ভুলে যাওয়া ও স্মৃতিভ্রংশ: নামাযের বিধান

বয়স বাড়লে অনেকের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়। কেউ রাকআত গুলিয়ে ফেলেন, কেউ রুকু-সিজদার ধারাবাহিকতা মনে রাখতে পারেন না। আবার কারও কারও ডিমেনশিয়া বা আলঝেইমারের মতো রোগের কারণে নামাযের নিয়মই ভুলে যায়। এমন অবস্থায় পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না কী করবেন। নামায মাফ হয়ে গেছে ধরে নিয়ে ছেড়ে দেবেন, নাকি আগের মতোই চালিয়ে যাবেন? এই লেখায় হানাফী ফতোয়ার আলোকে মূল বিধানগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।

আল্লাহ সাধ্যের বাইরে চাপান না

আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না।” (সূরা বাকারা, ২:২৮৬) বার্ধক্যের দুর্বলতায় ইবাদতের নিয়ম বদলে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর রহমত ও সুবিধা তাতে বেড়ে যায়। এই আয়াতের আলোকেই বৃদ্ধ ও অসুস্থদের জন্য ফকীহগণ সহজতর বিধান বর্ণনা করেছেন।

প্রথম অবস্থা: কিছুটা বোঝেন, কিন্তু ভুল করেন

মুফতি অনলাইনের হানাফী ফতোয়ায় (মুফতি যাকারিয়া মাকাদা; যাচাই করেছেন মুফতি ইবরাহীম সালেজী) বলা হয়েছে, বার্ধক্য বা অসুস্থতার কারণে নামায মাফ হয় না, বরং সব অবস্থায় নামায ফরয। যিনি দাঁড়াতে পারেন না, তিনি বসে পড়বেন, বসতে না পারলে শুয়ে ইশারায় পড়বেন, আর ওযূ করতে না পারলে তায়াম্মুম করে নামায পড়বেন।

যিনি রাকআতের সংখ্যা ও ধারাবাহিকতা ভুলে যান, তাঁর বিষয়ে ফতোয়ায় বলা হয়েছে, আরেকজন লোক তাঁর পাশে থেকে প্রতিটি ধাপ বলে দেবেন এবং কী করতে হবে তা জানিয়ে দেবেন। ফকীহগণ এটিকে জায়েয বলেছেন, কারণ প্রয়োজনের কারণে সাধারণত নিষিদ্ধ বিষয়ও বৈধ হয়ে যায়। আল্লামা লখনভীর ফতোয়াতেও অতি বার্ধক্যে রাকআত গুলিয়ে ফেলা ব্যক্তির জন্য অন্যের স্মরণ করানোয় নামায শুদ্ধ হওয়ার কথা আছে।

দারুল ইফতা মালাউইর হানাফী ফতোয়ায়ও (মুফতি সাফওয়ান ইবনে আহমাদ; যাচাই করেছেন মুফতি ইবরাহীম দেসাই) বলা হয়েছে, যিনি বোঝেন কিন্তু ভুল করেন, পাশের কেউ পরবর্তী কাজের কথা বলে দিলে তিনি সেই সহায়তায় নামায পড়বেন।

দ্বিতীয় অবস্থা: বোধশক্তি নেই

নামায ফরয হওয়ার জন্য জ্ঞান ও বোঝার ক্ষমতা শর্ত। মালাউইর ফতোয়ায় বলা হয়েছে, যিনি নিজের দায়িত্ব বুঝতে সক্ষম নন, তাঁর ওপর তা ফরয নয়। সুস্থ হলে আবার ফরয হবে। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, যিনি এমন অবস্থায় নামায পড়তে পারেন না এবং অন্যের স্মরণ করানোও সম্ভব নয়, তিনি নামায থেকে অব্যাহতি পাবেন। এমন অবস্থায় যে নামায তিনি আদায় করতে পারেননি, সে জন্য কোনো ফিদইয়া ওয়াজিব নয়। তবে রমযানে যদি অল্প সময়ের জন্যও তিনি সুস্থ বোধশক্তিতে ছিলেন, তাহলে পুরো মাসের জন্য ফিদইয়া দিতে হবে। (দারুল ইফতা মালাউই)

মুফতি অনলাইনের আলঝেইমারবিষয়ক ফতোয়ায়ও (মুফতি যাকারিয়া মাকাদা) একই কথা এসেছে। প্রশ্নকারীর দাদা আলঝেইমারে আক্রান্ত, সব ভুলে গেছেন, এমনকি নামাযের নিয়মও। উত্তরে বলা হয়েছে, তিনি যদি নিজের সঠিক জ্ঞানে না থাকেন, তাহলে নামাযের দায়িত্ব তাঁর ওপর নেই।

হাদীসের ভিত্তি

আয়িশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে রাখা হয়েছেঃ ঘুমন্ত ব্যক্তি যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়, নাবালেগ, যতক্ষণ না সে বালেগ হয় এবং পাগল, যতক্ষণ না সে জ্ঞান ফিরে পায় বা সুস্থ হয়।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ২০৪১) মুফতি অনলাইনের ফতোয়ায় এই বিষয়ে আবূ দাউদের একই অর্থের বর্ণনার উল্লেখ আছে।

শয্যাশায়ী বৃদ্ধার ওযূ ও নামায

দারুল ইফতা শিকাগোর হানাফী ফতোয়ায় (ম্যাওলানা আম্মার আহমাদ; যাচাই করেছেন মুফতি আবরার মির্যা) একজন শয্যাশায়ী বৃদ্ধার প্রশ্নের উত্তরে কয়েকটি মাসআলা এসেছে, যা অনেক পরিবারের কাজে লাগে। বৃদ্ধা ডায়াপার পরেন এবং ওষুধের কারণে বারবার বাথরুমের প্রয়োজন হয়।

  • নাপাকি বের হতেই থাকলে, কিংবা ডায়াপার বদলানো অত্যন্ত কষ্টকর হলে ডায়াপার পরা অবস্থায় নামায পড়া যাবে।
  • নাপাকি এমনভাবে অবিরাম বের হলে যে, পুরো এক নামাযের ওয়াক্তে ওযূ করে ফরয নামায পড়াও সম্ভব হয় না, তাহলে তিনি মা‘যুর (ওজরগ্রস্ত) বলে গণ্য হবেন। তিনি ওযূ বা তায়াম্মুম করে সেই ওয়াক্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত নামায ও অন্যান্য ইবাদত করতে পারবেন, যদিও মাঝে নাপাকি বের হয়। ওজরের অবস্থা ধরে রাখতে প্রতি ওয়াক্তে অন্তত একবার সেই ওজর ঘটতে হবে।
  • নিজে পবিত্রতা অর্জন করতে না পারলে এবং ধুয়ে দেওয়ার মতো কেউ না থাকলে তায়াম্মুম করবেন। তবে ফতোয়ার পাদটীকায় বলা হয়েছে, যদি কেউ সাহায্য করার জন্য উপস্থিত থাকেন, তাহলে অধিকাংশ আলেমের মতে তায়াম্মুম করা ঠিক নয়, কারণ তিনি সাহায্যকারীর মাধ্যমে সক্ষম বলে গণ্য। এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদও আছে।
  • দাঁড়াতে, রুকু বা সিজদা করতে না পারলে কিবলামুখী হয়ে বসে ইশারায় নামায পড়বেন, সিজদার ইশারা রুকুর চেয়ে নিচু হবে। বসতে না পারলে কিবলার দিকে পা রেখে (সম্মানের খাতিরে পা কিছুটা গুটিয়ে) শুয়ে মাথার ইশারায় পড়বেন। চোখ বা ভ্রূর ইশারায় নামায পড়া জায়েয নয়।
  • মাথার ইশারাও না পারলে ওই সময় নামায পড়বেন না। সুস্থ হলে ছুটে যাওয়া নামায পাঁচ ওয়াক্ত বা তার কম হলে কাযা করতে হবে, পাঁচ ওয়াক্তের বেশি হলে কাযা করতে হবে না।

পরিবারের করণীয়

  • আগে বুঝতে হবে, তিনি কোন অবস্থায় আছেন। কিছু বুঝে ভুল করছেন, নাকি সম্পূর্ণ বোধহীন।
  • প্রথম অবস্থায় পাশে থেকে নরম ভাষায় ধাপে ধাপে মনে করিয়ে দেওয়া।
  • বোধশক্তি না থাকলে অযথা দোষারোপ বা চাপ না দেওয়া।
  • সঠিক বিধান জানতে অভিজ্ঞ আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া, কারণ রোগীর অবস্থা ভেদে মাসআলা বদলাতে পারে।
  • তাঁর জন্য আরোগ্য ও ধৈর্যের দোয়া করা, আর নিজেরাও ধৈর্য ধরা।

আল্লাহ তাআলা সব বৃদ্ধ মা-বাবাকে সুস্থতা দান করুন এবং আমাদেরকে তাঁদের সেবায় ধৈর্যের তাওফীক দিন। আমীন।

Author