কুরআনে পর্দার বিধান: আয়াতগুলো কী বলে

পর্দা নিয়ে আমাদের সমাজে নানা কথা শোনা যায়। কেউ একে কঠিন মনে করেন, কেউ শুধু পোশাকের বিষয় ভাবেন। এই বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা হলো কুরআন। এই লেখায় আমরা পর্দা সম্পর্কিত মূল আয়াতগুলো এক জায়গায় দেখব এবং বুঝে নেব, প্রতিটি আয়াত আমাদের কী শেখায়।

১. দৃষ্টি সংযত রাখা: সূরা নূর

সূরা নূরের ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মুমিন পুরুষদের বলেছেন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নিচু রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য অধিক পবিত্রতা আছে (সূরা নূর, ২৪:৩০)।

পরের আয়াতে মুমিন নারীদের জন্যও একই নির্দেশ এসেছে। সঙ্গে আরও বলা হয়েছে, তারা যেন সাধারণত যা প্রকাশ পায়, তা ছাড়া নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে এবং ওড়না দিয়ে বক্ষদেশ ঢেকে রাখে। আর তারা যেন এমনভাবে পা না ফেলে, যাতে তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশ পায় (সূরা নূর, ২৪:৩১)।

লক্ষ করুন, প্রথম নির্দেশ পুরুষদের জন্য। অর্থাৎ পর্দা কেবল নারীর বিষয় নয়, পুরুষেরও দায়িত্ব আছে।

২. বাইরে যাওয়ার সময় চাদর: সূরা আহযাব

আল্লাহ তাআলা নবীজি ﷺ-কে বলেছেন, তিনি যেন তাঁর স্ত্রী, কন্যা ও মুমিন নারীদের বলেন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তাদের উত্যক্ত করা হবে না (সূরা আহযাব, ৩৩:৫৯)।

এই আয়াতে পর্দার উদ্দেশ্যও বলা হয়েছে: নারীর পরিচিতি ও নিরাপত্তা।

৩. আড়াল থেকে কথা বলা

নবীজি ﷺ-এর পবিত্র স্ত্রীদের সম্পর্কে সূরা আহযাবে বলা হয়েছে, তোমরা তাঁদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাও। এটি তোমাদের ও তাঁদের অন্তরের জন্য অধিক পবিত্রতার কারণ (সূরা আহযাব, ৩৩:৫৩)। এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, পর্দার একটি উদ্দেশ্য হলো উভয় পক্ষের মনের পবিত্রতা।

৪. কথা ও চলার ধরন

একই সূরায় আল্লাহ বলেছেন, তোমরা পরপুরুষের সঙ্গে কোমল সুরে কথা বলো না, কারণ যার অন্তরে রোগ আছে, সে লোভ করতে পারে। তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলো (সূরা আহযাব, ৩৩:৩২)। পরের আয়াতে ঘরে অবস্থান করা এবং আগের জাহিলি যুগের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন না করার কথা এসেছে (সূরা আহযাব, ৩৩:৩৩)।

অর্থাৎ পর্দা শুধু কাপড়ে নয়, কথায় ও চলনেও।

নিকটাত্মীয়দের সামনে ছাড়

সূরা আহযাবের ৫৫ নম্বর আয়াতে নবীজি ﷺ-এর পবিত্র স্ত্রীদের জন্য বলা হয়েছে, তাঁদের নিজেদের বাবা, ছেলে, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, মুসলিম নারী ও অধিকারভুক্ত দাসীদের সামনে আসতে কোনো দোষ নেই। তবে তাঁরা যেন আল্লাহকে ভয় করেন (সূরা আহযাব, ৩৩:৫৫)। এখান থেকে বোঝা যায়, নিকটাত্মীয় ও মাহরামদের ক্ষেত্রে বিধান আলাদা।

৫. মাহরাম কারা

সূরা নিসার ২৩ নম্বর আয়াতে এমন আত্মীয়দের তালিকা আছে, যাদের সঙ্গে বিয়ে হারাম, যেমন মা, মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাইঝি, ভাগনি। এঁরা মাহরাম। মাহরাম আত্মীয়দের সঙ্গে সাধারণ ঘরোয়া আচরণে গায়রে মাহরামের মতো পর্দার বিধান নেই। তবে মাহরাম কারা এবং তাঁদের সামনে কতটুকু প্রকাশ করা যাবে, সে বিস্তারিত নিয়ম নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে জেনে নিন।

৬. পোশাক ও তাকওয়া

সূরা আরাফের ২৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, আমি তোমাদের জন্য পোশাক দিয়েছি, যা লজ্জাস্থান ঢাকে এবং শোভা বাড়ায়। তবে তাকওয়ার পোশাকই সর্বোত্তম। অর্থাৎ বাইরের পোশাকের সঙ্গে ভেতরের আল্লাহভীতিও দরকার।

৭. বৃদ্ধা নারীদের জন্য ছাড়

সূরা নূরের ৬০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, যে বৃদ্ধা নারীরা বিয়ের আশা রাখেন না, তাঁরা সাজসজ্জা প্রদর্শন না করে বাড়তি পোশাক খুলে রাখলে দোষ নেই। তবে এ থেকে বিরত থাকাই তাঁদের জন্য উত্তম।

পর্দা নিয়ে কয়েকটি ভুল ধারণা

  • পর্দা মানে ঘরবন্দি থাকা। আয়াতগুলোতে নারীকে প্রয়োজনে বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়নি, বরং বাইরে যাওয়ার আদব শেখানো হয়েছে।
  • পর্দা কেবল নারীর কাজ। সূরা নূরে প্রথম নির্দেশ পুরুষদের জন্য।
  • পর্দা মানে অপমান বা কড়াকড়ি। আয়াতে কারণ বলা হয়েছে মনের পবিত্রতা ও সুরক্ষা।
  • এক দিনেই সব ঠিক করতে হবে। পরিবর্তন ধীরে ধীরে হয়। যে যতটুকু বুঝেছেন, ততটুকু থেকে শুরু করুন।

আয়াতগুলো থেকে আমরা কী পাই

  • পর্দা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য। পুরুষকে দৃষ্টি ও চরিত্র, নারীকে পোশাক, কথা ও চলনেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
  • পর্দার উদ্দেশ্য মনের পবিত্রতা, নারীর সুরক্ষা ও সমাজের শান্তি।
  • পর্দা বোঝা নয়, এটি আল্লাহর দেওয়া সুন্দর জীবনব্যবস্থার অংশ।
  • বিস্তারিত বিধানের জন্য নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছে যাওয়া উচিত।

ঘরে আলোচনার সহজ উপায়

পরিবারে সপ্তাহে একদিন কুরআন তরজমাসহ পড়ার সময় রাখুন। একটি আয়াত পড়ুন, তার অর্থ বুঝুন এবং ঘরে কীভাবে পালন করা যায় তা আলোচনা করুন। সন্তানরা যখন বুঝে মানে, তখন বিধান আর বোঝা মনে হয় না।

মনে রাখবেন, প্রতিটি আয়াতের পেছনে আল্লাহর রহমত ও হিকমত আছে। বুঝে ও মনের খুশিতে মানলে এই আমল সহজ হয়ে যায়।

শেষ কথা

আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন, তা আমাদের কল্যাণের জন্যই। পর্দার আয়াতগুলো মন দিয়ে পড়ুন এবং ধীরে ধীরে জীবনে আনার চেষ্টা করুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে লজ্জা ও শালীনতার সৌন্দর্য দান করুন। আমীন।

Author