সন্তানের জন্য রেখে যাওয়া সর্বোত্তম সম্পদ

বাবা-মা সারা জীবন খাটেন সন্তানকে একটু ভালো রাখার জন্য। এই ভালো রাখার মানে আমরা সাধারণত বুঝি ব্যাংক ব্যালেন্স, ফ্ল্যাট বা জমিজমা। অথচ ইতিহাস বলে, শুধু অঢেল সম্পদ অনেক সময় সন্তানের সুখ আনেনি, বরং ধ্বংসের কারণ হয়েছে। আবার কিছুই না রেখেও অনেক বাবা-মা সন্তানকে এমন কিছু দিয়ে গেছেন, যা তাদের বড় মানুষ বানিয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা সন্তানের জন্য আসলে কী রেখে যাচ্ছি।

সম্পদ রেখে যাওয়া মন্দ নয়, তবে সবকিছু নয়

আগে একটি কথা পরিষ্কার করা দরকার। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কিছু সঞ্চয় রাখা ইসলামে নিন্দনীয় নয়। সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ অবস্থায় সব সম্পদ বা বেশির ভাগ সদকা করে দিতে চেয়েছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সীমা দিয়ে বললেন, এক-তৃতীয়াংশই যথেষ্ট, আর “তোমার ওয়ারিসদের অভাবমুক্ত রেখে যাওয়া, তাদেরকে খালি হাতে পরমুখাপেক্ষী অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৯৫)। অর্থাৎ পরিবারের সচ্ছলতার কথা ভাবা দ্বীনেরই শিক্ষা।

তবে মনযূরুল হক লিখেছেন, প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল জড় সম্পদে সীমাবদ্ধ নয়। এর ব্যাপ্তি নৈতিকতা, আদর্শ ও জীবনবোধ পর্যন্ত। আসুন, সেই সম্পদগুলোর কয়েকটি দেখি।

প্রথম সম্পদ: বাবা-মায়ের নিজের নেক জীবন

সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় আমানত হলো বাবা-মায়ের সৎ ও আল্লাহভীরু জীবন। কুরআনে মূসা ও খিযির আলাইহিমাস সালামের ঘটনা আছে। সেখানে এতিম দুই বালকের গুপ্তধন রক্ষার জন্য একটি প্রাচীর মেরামত করা হয়েছিল। কারণ হিসেবে আল্লাহ বলেছেন, “এর নীচে ছিল তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্ম পরায়ণ।” (সূরা কাহফ, ১৮:৮২)। তাবেয়ী মুহাম্মদ ইবনুল মুনকাদির রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, আল্লাহ একজন নেককার ব্যক্তির কারণে তার সন্তান, নাতি-নাতনি এমনকি আশপাশের ঘরবাড়িকেও হেফাজত করেন। আমাদের সততা তাই অবর্তমানে সন্তানের জন্য এক অদৃশ্য নিরাপত্তা।

দ্বিতীয় সম্পদ: ভালো অভ্যাস ও আদব

শুধু উপদেশ নয়, অভ্যাস শেখানো জরুরি। শৈশবে শীতের ভোরে বাবাকে ফজরের জন্য উঠতে দেখে যে সন্তান বড় হয়, তার জীবনে এই অভ্যাস বড় পাথেয় হয়ে থাকে। আবার ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক আদবও দরকার। মনযূরুল হকের পর্যবেক্ষণ হলো, আমরা সন্তানের ক্যারিয়ার গড়তে যতটা মনোযোগী, সংসার গড়ার শিক্ষা দিতে ততটা নই। ছেলেকে দায়িত্বশীলতা না শেখালে সে ভালো স্বামী হতে পারে না। মেয়েকে শুধু ভোগের মানসিকতায় বড় করলে সে দাম্পত্যের ত্যাগ বুঝতে পারে না।

আল্লাহ বলেছেন, “যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শুনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।” (সূরা যুমার, ৩৯:১৮)। সন্তানকে অন্যের কথা শোনা ও ভালোটা গ্রহণ করা শেখানো তাই এক বড় উত্তরাধিকার।

তৃতীয় সম্পদ: আন্তরিক উপদেশ ও দোয়া

বাবা-মায়ের অকৃত্রিম উপদেশ সন্তানের জন্য আলোকবর্তিকা। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহিকে তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ উপদেশ চাইলে তিনি বলেছিলেন, সবসময় ভালো কাজের নিয়ত রেখো, কারণ যতক্ষণ ভালোর নিয়ত থাকবে, ততক্ষণ তুমি কল্যাণেই থাকবে। বর্তমান প্রজন্ম কখনো ভাবে বাবা-মা পুরনো ধ্যান-ধারণার মানুষ। তবু আন্তরিক ও ভালোবাসামাখা উপদেশের প্রভাব সহজে ফুরোয় না।

দোয়াও সন্তানের জন্য বিরাট সম্পদ। নবীজি বলেছেন, “তিন ব্যক্তির দু‘আ নিঃসন্দেহে কবুল হয়ঃ (এক) পিতা-মাতার দু‘আ, (দুই) মুসাফিরের দু‘আ, (তিন) মজলুমের দু‘আ।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫৩৬)। সন্তানের সুস্থতা, নেক হায়াত আর ঈমানের ওপর অটল থাকার জন্য আমরা যে দোয়া করি, তা আমাদের মৃত্যুর পরেও তাদের ছায়া দেবে।

চতুর্থ সম্পদ: ঈমান ও আশা

সন্তানের অন্তরে আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস গেঁথে দেওয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার। জীবনের কঠিন সময়ে যখন সে একা হয়ে যায়, তখন এই ঈমানই তাকে হতাশা থেকে বাঁচায়। তাকে শেখান, কষ্টের পরেই স্বস্তি আসে। আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি রয়েছে।” (সূরা ইনশিরাহ, ৯৪:৫-৬)

পঞ্চম সম্পদ: হালাল উপার্জন

আমরা যা রেখে যাচ্ছি, তার উৎস কী, সেটাও ভাবা দরকার। মনযূরুল হক লিখেছেন, হালাল না হলে সেই সম্পদ সন্তানের জন্য বরকত নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দেখা দিতে পারে। নবীজি বলেছেন, কিয়ামতের দিন কোনো বান্দার পা সরবে না, যতক্ষণ না তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, “কোথা হতে তার ধন-সম্পদ উপার্জন করেছে ও কোন কোন খাতে ব্যয় করেছে।” (জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪১৭)। তাই পাহাড়সম সম্পদের চেয়ে সামান্য হলেও হালাল ও বরকতময় সম্পদ রেখে যাওয়া অনেক বেশি কল্যাণকর।

ষষ্ঠ সম্পদ: ভাই-বোনের ভালোবাসা

বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে ভাই-বোনের ঝগড়া আর মুখ দেখাদেখি বন্ধ হওয়া আমাদের সমাজের নিত্যদিনের দুঃখজনক ঘটনা। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে যে, রক্তের সম্পর্ক কোনো বৈষয়িক স্বার্থের চেয়ে বড়। যে পরিবারে ভাই-বোনের মধ্যে ভালোবাসা থাকে, সেখানে আল্লাহর রহমত নেমে আসে। ভালোবাসা দিয়ে যেতে না পারলে কোটি টাকা রেখে গেলেও তারা শান্তিতে থাকবে না।

আজ থেকে যা শুরু করা যায়

সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন কিছু সময় কাটান। তাদের সামনে সত্য বলুন, আমানত রক্ষা করুন, হালাল পথে চলুন। ফজরে ও অন্যান্য ইবাদতে তাদের সঙ্গী করুন। ঘরের ছোটখাটো দায়িত্ব ভাগ করে দিন। রাতে বা ঘুমের আগে তাদের জন্য দোয়া করুন। আর সম্পদ সঞ্চয় করার পাশাপাশি এই সম্পদগুলো গড়ার দিকেও সমান নজর দিন।

শেষ কথা

আমরা যখন দুনিয়া ছেড়ে যাব, তখন ব্যাংক ব্যালেন্স আমাদের সঙ্গে যাবে না, সন্তানকেও চিরদিন আগলে রাখতে পারবে না। কিন্তু আমাদের শেখানো আদব, আমাদের নেক আমলের বরকত আর আমাদের দোয়া তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে সঙ্গ দেবে। আল্লাহ আমাদের সন্তানদের নেককার করুন এবং আমাদেরকে তাদের জন্য উত্তম উত্তরাধিকার রেখে যাওয়ার তাওফীক দিন। আমীন।

Author