হায়েযকালে কী নিষিদ্ধ, কী বৈধ: হানাফী ফিকহের আলোকে
হায়েযের সময় নারীরা প্রায়ই দ্বিধায় থাকেন, কোন কাজ করা যাবে আর কোনটি যাবে না। কেউ ভাবেন আল্লাহর স্মরণও করা যাবে না, কেউ আবার সবকিছুতেই অনুমতি আছে ভেবে নেন। দুই ধারণাই ঠিক নয়। এই লেখায় হানাফী ফিকহের ফতোয়ার আলোকে নিষিদ্ধ ও বৈধ কাজগুলো সাজিয়ে বলা হলো, যাতে ধাপে ধাপে বিষয়টি পরিষ্কার হয়।
মূল নির্দেশ কুরআনে
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে হায়েয (ঋতু) সম্পর্কে। বলে দাও, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রীগমন থেকে বিরত থাক। তখন পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না, যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়ে যায়।” (সূরা বাকারা, ২:২২২)
হানাফী ফিকহে যা নিষিদ্ধ
হানাফী মাযহাবের একটি ফতোয়ায় (হায়েয ও নিফাস উভয়ের ক্ষেত্রে) নিচের বিষয়গুলো নিষিদ্ধ বলা হয়েছে:
- নামায। ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল, সব ধরনের নামায।
- সিজদা। তিলাওয়াতের সিজদা, কৃতজ্ঞতার সিজদা ও তাওবার সিজদাও এর মধ্যে আছে।
- রোযা। ফরয, মানতের, সুন্নাত ও নফল, সব রোযা।
- কুরআন স্পর্শ করা। কুরআন বা কুরআনের কোনো আয়াত আলাদা কোনো আড়াল ছাড়া ছোঁয়া যাবে না।
- কুরআন তিলাওয়াত। হানাফী ফিকহে এটি নিষিদ্ধ।
- মসজিদে প্রবেশ। যেকোনো মসজিদে।
- তাওয়াফ। হজ, উমরা বা অন্য যেকোনো তাওয়াফ।
- সহবাস। সূরা বাকারার উপরের আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী।
- নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত অংশ কাপড়ের আড়াল ছাড়া স্পর্শ। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই সীমা ফতোয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মসজিদ ও নামাযের জায়গা
মসজিদে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে একজন মুফতি লিখেছেন, মসজিদের সঙ্গে যুক্ত না হলেও যে জায়গা নারীরা নিয়মিত নামাযের জন্য ব্যবহার করেন, তা মসজিদের হুকুম পায়। তাই হায়েযগ্রস্ত নারী সেখানেও প্রবেশ করবেন না। ইসলামিক সেন্টারের এমন কোনো পাশের কক্ষ বা হলঘর, যা আসলে মসজিদ বা নামাযের স্থান নয়, সেখানে দরস বা বক্তৃতা শুনতে যাওয়ার সুযোগ আছে।
ঈদগাহের ঘটনাও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়। উম্মে আতিয়্যা (রা.) বলেন, তিনি নবী ﷺ-কে বলতে শুনেছেন যে, যুবতী, পর্দানশীন ও ঋতুবতী মহিলারা বের হবে এবং ভালো স্থানে ও মুমিনদের দাওয়াতে অংশ নেবে, “অবশ্য ঋতুবতী মহিলা ঈদগাহ হতে দূরে থাকবে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩২৪) অর্থাৎ ঈদের সমাবেশে তিনি অংশ নিতে পারেন, কিন্তু নামাযের স্থান থেকে দূরে থাকবেন।
নামাযের কাযা লাগবে না
মুআযাহ (রহ.) বলেন, এক নারী আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হায়েযের সময় ছুটে যাওয়া নামায কি পবিত্র হওয়ার পর কাযা করতে হবে? আয়েশা (রা.) বললেন, “তুমি কি হারূরিয়্যাহ? (খারিজীদের একদল) আমরা নবী ﷺ-এর সময়ে ঋতুবতী হতাম কিন্তু তিনি আমাদের সালাত কাযার নির্দেশ দিতেন না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩২১)
অর্থাৎ হায়েযের সময়ের নামায পরে আদায় করতে হয় না।
হজ ও উমরায় হায়েয
আয়েশা (রা.) বলেন, তাঁরা নবী ﷺ-এর সঙ্গে হজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে ‘সারিফ’ নামক স্থানে পৌঁছালে তাঁর ঋতুস্রাব শুরু হয়। তিনি কাঁদছিলেন। নবী ﷺ বললেন, “এটাতো আদম-কন্যাদের জন্যে আল্লাহ্ নির্ধারিত করেছেন। তুমি পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অন্যান্য হাজীদের মত সমস্ত কাজ করে যাও, কেবল কা’বার তাওয়াফ করবে না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩০৫)
ফতোয়ায় উমরার ক্ষেত্রেও বলা হয়েছে, তাওয়াফ নিষিদ্ধ হলেও এই অবস্থায় মক্কা ও মদীনার ঐতিহাসিক স্থান দর্শন করা বৈধ। মক্কায় যেমন গারে হেরা, গারে সাওর, নবীজি ﷺ-এর জন্মস্থান ও মুআল্লা কবরস্থান, মদীনায় তেমনি মসজিদের বাইরে থেকে নবীজি ﷺ-কে সালাম দেওয়া, বদর, উহুদ ও খন্দকের স্থান দর্শন এবং জান্নাতুল বাকীর কবরবাসীদের জন্য দোয়া করা যায়।
যা বৈধ এবং উত্তম
ফতোয়ায় বলা হয়েছে, হায়েযের সময় নিচের কাজগুলো বৈধ:
- দোয়া করা, যে বিষয়ে ইচ্ছা।
- আল্লাহর যিকর।
- তাওবা, ইস্তিগফার ও ক্ষমা চাওয়া।
- নবী ﷺ-এর ওপর দরূদ পাঠ।
- কুরআন শোনা।
- নবীজি ﷺ-এর শেখানো দোয়া মুখস্থ করা।
- দ্বীনি ইলম পড়া ও পুনরাবৃত্তি করা, যেমন সীরাত, সাহাবিদের জীবনী, রিয়াদুস সালেহীন বা চল্লিশ হাদীসের মতো হাদীসগ্রন্থ পড়া।
- ধর্মীয় বক্তব্য শোনা।
- দান-সদকা করা ও অন্যের সেবা করা।
- স্বামী, বাবা-মা, সন্তান ও মুসলিমদের সঙ্গে উত্তম আচরণ।
- কৃতজ্ঞতা, ধৈর্য এবং আল্লাহর নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করা।
ফতোয়ায় আরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, নামাযের ওয়াক্ত হলে অযু করে নামাযের নির্ধারিত জায়গায় বসে যতক্ষণ নামাযে লাগত, ততক্ষণ যিকর করা ভালো।
বাস্তব জীবনের কয়েকটি পরামর্শ
- নামাযের সময় এলে যিকর বা দোয়ার অভ্যাস রাখুন, তাহলে ইবাদতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয় না।
- বাড়িতে কুরআন শোনার ব্যবস্থা রাখতে পারেন।
- এই দিনগুলোতে ধর্মীয় বই পড়ার সুযোগ কাজে লাগান।
- প্রশ্ন থাকলে নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির কাছে জিজ্ঞেস করুন।
মনে রাখবেন, এই লেখায় হানাফী ফিকহের ফতোয়া অনুযায়ী বিধানগুলো তুলে ধরা হয়েছে। হায়েযের বিশেষ কোনো অবস্থায়, যেমন রক্তের সময়সীমা নিয়ে সন্দেহ হলে বা অভ্যাস বদলে গেলে, নিজের সিদ্ধান্তে না গিয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের কাছ থেকে জেনে নেওয়াই নিরাপদ।
আল্লাহ আমাদের মা-বোনদের দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমীন।
