রোগ প্রতিরোধ, টিকা ও প্রাথমিক চিকিৎসা: ইসলাম যা শেখায়
রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়া যেমন জরুরি, রোগ যেন না হয় সেই চেষ্টা করাও তেমনি জরুরি। ঘরে ঘরে জ্বর, সর্দি-কাশি বা সংক্রামক রোগ ব্যাপক হারে ছড়ালে পুরো পরিবার কষ্ট পায়। ইসলামের শিক্ষায় প্রতিরোধ, সতর্কতা ও আধুনিক চিকিৎসার প্রতি সুস্পষ্ট ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আছে। শাইখ মুহাম্মাদ উছমান গনী প্রথম আলোর কলামে ইসলামে স্বাস্থ্যসেবার মূলনীতি ও আধুনিক স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে যে আলোচনা করেছেন এবং ইসলাম জিজ্ঞাসা ও জবাব ওয়েবসাইটে ইসলামী ফিকহ একাডেমির যে সিদ্ধান্ত উদ্ধৃত হয়েছে, তার আলোকে এই লেখা।
মহামারির সময় নবীজির নির্দেশনা
উসামাহ ইবনে যায়দ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন তোমরা কোন অঞ্চলে প্লেগের বিস্তারের সংবাদ শোন, তখন সেই এলাকায় প্রবেশ করো না। আর তোমরা যেখানে অবস্থান কর, সেখানে প্লেগের বিস্তার ঘটলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেয়ো না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭২৮)
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়া যাওয়ার পথে সারগ নামক স্থানে পৌঁছে খবর পেলেন, সিরিয়ায় মহামারি দেখা দিয়েছে। তখন আবদুর রহমান ইবনে আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে নবীজির এই নির্দেশের কথা জানালেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৩০)। এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, সংক্রামক রোগের এলাকায় অকারণে যাওয়া এবং আক্রান্ত এলাকা থেকে বের হওয়া, দুটোর ক্ষেত্রেই সতর্কতা দরকার। ঘরের জন্য এর সাধারণ শিক্ষা হলো, কারও সংক্রামক রোগ হলে অন্যদের সুরক্ষার কথা ভাবা এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা। তবে আমাদের বিশ্বাস, রোগ নিজে থেকে কাউকে আক্রান্ত করে না। সবই আল্লাহর হুকুমে হয়। সতর্কতা ও চিকিৎসা আমরা করি আল্লাহ-প্রদত্ত উপায় হিসেবে, আর ভরসা রাখি আল্লাহর ওপর।
ইসলামী ফিকহ একাডেমির সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, চিকিৎসা ছেড়ে দিলে যদি রোগের ক্ষতি অন্যের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে, যেমন সংক্রামক ব্যাধি, তাহলে চিকিৎসা করানো ওয়াজিব। কিছু অবস্থায়, যেমন সংক্রামক ব্যাধি, টিকা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, শাসক চিকিৎসা গ্রহণে বাধ্যও করতে পারেন।
পরিচ্ছন্নতাই প্রথম প্রতিরক্ষা
শাইখ উছমান গনী লিখেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত স্বাস্থ্যসচেতন ছিলেন। স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম প্রধান অবলম্বন পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। নামাজের জন্য আমরা মসজিদ পরিষ্কার রাখি, তাই ঘরদোরও পরিষ্কার ও পবিত্র রাখা উচিত। তিনি আরও লিখেছেন, পুরো দুনিয়া আখেরি নবীর উম্মতের জন্য বড় মসজিদের মতো, তাই আমরা আঙিনা, আশপাশ, রাস্তাঘাট ও পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখব। ওযুর জন্য পানির পবিত্রতা নিশ্চিত করতে হয়, নোংরা পানিতে ওযু শুদ্ধ হয় না, তাই পানিকেও দূষণমুক্ত রাখা জরুরি।
চিকিৎসা নেওয়া ও টিকা
উসামাহ ইবনে শারীক রাযিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় নবীজি বলেছেন, “তোমরা চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করো; কেননা মহান আল্লাহ একমাত্র বার্ধক্য ছাড়া সকল রোগেরই ঔষধ সৃষ্টি করেছেন।” (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদীস ৩৮৫৫)
শাইখ উছমান গনী লিখেছেন, সুস্থতা ও রোগ প্রতিরোধের জন্য টিকা বা ভ্যাকসিন অন্যতম কার্যকর পদ্ধতি। তাঁর ভাষায়, বিশ্বের আলেম-ওলামারা টিকা গ্রহণে সম্মতি ও উৎসাহব্যঞ্জক পরামর্শ দিয়েছেন। দেশের বিশিষ্ট আলেমরাও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে স্বাস্থ্যবিধি মানা ও টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সৌদি সরকার হজযাত্রীদের জন্য টিকা গ্রহণ বাধ্যতামূলক করেছে। শাইখ উছমান গনী ইসলামে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে আরেকটি লেখায়ও লিখেছেন, রোগ প্রতিরোধে আধুনিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উত্তম এবং রোগপ্রতিরোধক টিকা বা ভ্যাকসিন গ্রহণ ইসলামসম্মত। (আল ফিকহুল ইসলামি)
অর্থাৎ শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়ানো ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী নয়। কোন বয়সে কোন টিকা দিতে হবে, তা জানতে স্বাস্থ্যকর্মী ও শিশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
শরিয়তের মৌলিক উদ্দেশ্য পাঁচটি বলে তিনি উল্লেখ করেছেন, জীবন, সম্পদ, জ্ঞান, বংশগতি ও ধর্মের সুরক্ষা। জীবন সুরক্ষার এই উদ্দেশ্যের সঙ্গেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টি জড়িত।
প্রাথমিক চিকিৎসা: সুন্নত ও আধুনিক ব্যবস্থা
শাইখ উছমান গনী একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি মনে করিয়ে দিয়েছেন। নবীজির কাজকর্ম দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ শরিয়তের বিধিবিধান, যেমন ইমান, নামাজ, রোজা, হজ। অন্য ভাগ প্রাকৃতিক বিষয়, যেমন কৃষি ও চিকিৎসা, যেখানে মানুষের জ্ঞান ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তিনি এ প্রসঙ্গে কুরআনের সূরা নাহলের আয়াত উল্লেখ করেছেন, “তিনি এমন জিনিস সৃষ্টি করেন যা তোমরা জান না।” (সূরা নাহল, ১৬:৮)। খেজুরগাছের কৃত্রিম পরাগায়নের ঘটনাও তিনি টেনেছেন, যেখানে নবীজি বলেছিলেন, “দুনিয়াবি বিষয়ে তোমরা আমার চেয়ে ভালো জানো।” (সহীহ মুসলিম)
তিনি উদাহরণ দিয়েছেন, ওহুদ যুদ্ধে নবীজি আহত হলে ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহা ছাই দিয়ে পট্টি করে দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, এটি তৎকালীন প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থা, শরিয়তের বিধান নয়। শিঙা লাগানো বা হিজামাও প্রাচীনকালের একটি প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতি, শরিয়তের বিধান নয়। সুতরাং এখনকার সময়ে ছাই দিয়ে পট্টি করা বা শিঙা লাগানো সুন্নত বা ইবাদত নয়। বরং এর বিকল্প হিসেবে আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি।
ঘরের প্রাথমিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, আহত হলে বা হঠাৎ অসুস্থ হলে দেরি না করে সঠিক আধুনিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। জরুরি অবস্থায় রোগীর অনুমতি অপেক্ষা না করে জীবন রক্ষার চিকিৎসা শুরু করা যায়, ইসলামী ফিকহ একাডেমির সিদ্ধান্তেও তা আছে। কোনো আত্মীয়ের জরুরি অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে নিন এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ দেবেন না।
শেষ কথা
রোগ প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা, সতর্কতা, টিকা ও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা, সবই ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। নবীজি বলেছেন, “তোমার দেহের অধিকার রয়েছে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ১১৫৩)। সেই হক আদায়ে আমরা যেন সচেতন থাকি। আল্লাহ আমাদের পরিবারকে সব রোগ-ব্যাধি থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
