ক্ষমার সৌন্দর্য এবং হিংসা-মুক্ত মন
প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দুটি পরীক্ষা হলো ক্ষমা করা আর ঈর্ষা না করা। একজন আমাদের কষ্ট দিলে মনে ক্ষোভ জমে। আরেকজনের ঘরে সুখ-সমৃদ্ধি দেখলে মনের কোণে অস্বস্তি জাগে। এই দুটি অনুভূতি যদি সামলানো না যায়, সম্পর্ক ভাঙে; আর সামলাতে পারলে মন হালকা হয়, আল্লাহর ভালোবাসাও মেলে। এই লেখায় আমরা দেখব, কুরআন ও হাদীসে ক্ষমা ও হিংসা-মুক্ত মনের কী মর্যাদা বলা হয়েছে।
ক্ষমা: আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের গুণ
আল্লাহ তাআলা বলেন, “যারা স্বচ্ছলতায় ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে, বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকেই ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪)
এই আয়াতে রাগ সংবরণ ও ক্ষমা, দুটি গুণকে সৎকর্মশীলের পরিচয় বলা হয়েছে, আর তাদের প্রতি আল্লাহর ভালোবাসার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, “মন্দের প্রতিফল তো অনুরূপ মন্দই। যে ক্ষমা করে ও আপস করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে।” (সূরা শূরা, ৪২:৪০) এবং “ক্ষমা করার অভ্যাস গড়ে তোলো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খ জাহেলদের থেকে দূরে সরে থাকো।” (সূরা আ’রাফ, ৭:১৯৯)
আরেকটি আয়াত আমাদের নিজেদের দিকে ফিরে তাকাতে শেখায়: “তাদের ক্ষমা করা উচিত এবং দোষ-ত্রুটি উপেক্ষা করা উচিত। তোমরা কি কামনা করো না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।” (সূরা নূর, ২৪:২২) আমরা সবাই আল্লাহর ক্ষমার মুখাপেক্ষী। তাহলে অন্যকে ক্ষমা করতে আমরা কেন কুণ্ঠিত হব?
রাগ নিয়ন্ত্রণই প্রকৃত শক্তি
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন, প্রকৃত শক্তিশালী সে নয়, যে শক্তি দিয়ে মানুষকে পরাস্ত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১১৪)
আবু হুরায়রা (রা.) আরও বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি নবীজি ﷺ-এর কাছে বলল, আমাকে অসিয়ত করুন। তিনি বললেন, রাগ করো না। লোকটি কয়েকবার একই কথা বলল, নবীজি ﷺ প্রতিবারই বললেন, রাগ করো না। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬১১৬)
প্রতিবেশীর ছোটখাটো ভুল, কথায় আঘাত বা অসতর্কতা ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা এই শিক্ষারই বাস্তব রূপ। রাগের মুহূর্তে একটু থেমে নিজেকে সামলে নেওয়া, আর রাগের কারণে কিছু বলে বা করে ফেলার আগে ভাবা, ক্ষমার প্রথম ধাপ।
মন্দের জবাব ভালো দিয়ে
আল্লাহ বলেন, “ভালো ও মন্দ সমান নয়। জবাবে তাই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন, আপনার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু।” (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৩৪) কেউ আপনার সঙ্গে খারাপ আচরণ করলে প্রতিশোধ না নিয়ে সৌজন্য দেখান। প্রতিবেশী ও সামাজিক সম্পর্কে এই নীতি আশ্চর্য ফল দেয়।
হিংসা: মনের নীরব রোগ
হিংসা মানে অন্যের প্রাপ্ত নেয়ামত নষ্ট হয়ে যাওয়ার কামনা। কুরআনে হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে শেখানো হয়েছে: “এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।” (সূরা ফালাক, ১১৩:৫)
নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। তোমরা দোষ তালাশ করো না, গোয়েন্দাগিরি করো না, পরস্পর হিংসা করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না। বরং আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০৬৪)
কুরআন আরও বলে, “আর তোমরা আকাঙ্ক্ষা করো না এমন সব বিষয়ে, যাতে আল্লাহ তাআলা তোমাদের একের ওপর অপরের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। … আর আল্লাহর কাছে তাঁর অনুগ্রহ প্রার্থনা করো।” (সূরা নিসা, ৪:৩২) অর্থাৎ অন্যের প্রাপ্তি দেখে জ্বলে ওঠার বদলে আল্লাহর কাছেই নিজের জন্য কল্যাণ চাওয়া উচিত।
হিংসামুক্ত মনের দৃষ্টান্ত
মদিনার আনসারদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে। মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, সে জন্য তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। (সূরা হাশর, ৫৯:৯)
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন, দুটি ক্ষেত্র ছাড়া কারও মতো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করো না। এক, আল্লাহ যাকে সম্পদ দিয়েছেন আর সে তা সৎপথে ব্যয় করে। দুই, আল্লাহ যাকে হিকমত (জ্ঞান) দিয়েছেন আর সে তা অনুযায়ী আমল করে ও অন্যকে শেখায়। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৩) অর্থাৎ ভালো কাজে এগিয়ে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রশংসনীয়, তবে অন্যের ক্ষতি চাওয়া নয়।
মনকে হিংসামুক্ত রাখার কিছু উপায়
- প্রতিবেশীর ভালো খবরে “মাশাআল্লাহ” বলে মন থেকে দোয়া করুন।
- নিজের নেয়ামতের হিসাব করুন এবং শুকরিয়া আদায় করুন।
- আল্লাহর কাছে নিজের জন্য কল্যাণ চান।
- নবীজি ﷺ-এর শিক্ষা মনে রাখুন: মুসলিমরা ভাই ভাই, ভাইয়ের সুখে খুশি হওয়াই স্বাভাবিক।
- যাঁর প্রতি হিংসা আসছে, তাঁকে একটি উপহার দিন বা সালাম দিয়ে কথা বলুন। এতে মন নরম হয়।
মনে রাখুন, ক্ষমা করা দুর্বলতা নয়। যে ক্ষমা করে, সে নিজের রাগকে পরাস্ত করে এবং আল্লাহর ভালোবাসার পথে এগিয়ে যায়।
শেষ কথা
ক্ষমা ও হিংসামুক্ত মন, দুটিই সুস্থ সমাজের ভিত্তি। প্রতিবেশীর ছোট ভুল ক্ষমা করে দিন, তাঁর সুখে খুশি হন। এতে শুধু সম্পর্ক সুন্দর হয় না, আমাদের নিজেদের হৃদয়ও শান্ত হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পরিষ্কার মন দান করুন।
