কিশোর-কিশোরীকে দায়িত্ব শেখানো: ঘরের কাজ, হাতখরচ ও মধ্যপন্থা
কিশোর বয়স হলো সন্তানকে দায়িত্বের স্বাদ দেওয়ার সময়। ঘরের কাজ, নিজের টাকার হিসাব আর সংযমের শিক্ষা, এই তিনটি একসঙ্গে গড়ে তোলে আত্মনির্ভর ও দায়িত্বশীল মানুষ। এই লেখায় কুরআনের দুটি আয়াত, একটি হাদীস, প্রথম আলোর একটি লেখা (লেখক আবু দারদা মাহফুজ, সূত্র টাইমস অব ইন্ডিয়া) এবং ডেইলি স্টার বাংলার একটি লেখা (লেখক মারুফ ইসলাম) থেকে বিষয়টি সাজানো হয়েছে।
দায়িত্বের ইসলামী ভিত্তি
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ২৪০৯)। হাদীসের বিস্তারিত অংশে শাসক, স্বামী, স্ত্রী, সেবক ও সন্তানের নিজ নিজ দায়িত্বের কথা এসেছে। অর্থাৎ দায়িত্ব শুধু বড়দের নয়, অধীনে যা আছে তার ব্যাপারে প্রত্যেকেই জবাবদিহির মুখোমুখি হবে।
পরিবারের ব্যাপারে কুরআনের নির্দেশও এখানে স্মরণযোগ্য: “মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।” (সূরা তাহরীম, ৬৬:৬)।
সন্তানকে ছোট ছোট দায়িত্ব দেওয়া তাই কেবল সুবিধার জন্য নয়, তারবিয়াতের অংশ।
ঘরের কাজ কি কেবল মেয়েদের?
প্রথম আলোর লেখাটির শুরুতেই প্রশ্ন, “ঘরের কাজ কি কেবল মেয়েদেরই?” উত্তর: “মোটেও না।” লেখাটির মতে ছোটবেলা থেকে এসব শেখালে ছেলেরা আত্মনির্ভরশীল, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল ও মানবিক হয়ে ওঠে। লেখাটিতে আটটি কাজের কথা আছে, যা ছেলেদের ছোট থেকে শেখানোর পরামর্শ:
- ঘর পরিষ্কার রাখা: ধুলাবালি বা আবর্জনা দেখলে পরিষ্কার করার অভ্যাস।
- বাসনকোসন মাজা: নিজের ব্যবহৃত বাসন ব্যবহারের পর পরিষ্কার করা, কতটুকু ডিশওয়াশে কতগুলো বাসন মাজা যায় তা বোঝা।
- কাপড় সাফ করা: ধোয়া, শুকানো ও ভাঁজ করে রাখা।
- রান্না: প্রথমে সহজ রেসিপি, ধীরে ধীরে জটিল রান্না।
- বিছানা গোছানো: প্রতিদিন সকালে চাদর ঝেড়ে, বালিশ সাজিয়ে ও কম্বল ভাঁজ করে।
- আবর্জনার ব্যবস্থাপনা: কোথায় ও কীভাবে ফেলতে হয়, পুনর্ব্যবহারযোগ্য আবর্জনা আলাদা করা।
- ঘর সাজিয়ে রাখা: আসবাব ও ছোট জিনিস সুন্দরভাবে রাখা।
- বাড়ির ছোটদের যত্ন: খাওয়ানো, হাঁটাতে নেওয়া, অক্ষর শেখানো।
(লেখাটিতে নির্দিষ্ট বয়সসীমা বা বিশেষজ্ঞের মত উল্লেখ নেই। এটি একটি জীবনযাপন বিষয়ক লেখা, শরয়ী ফতোয়া নয়।) এই পরামর্শ মেয়েদের জন্যও সমান প্রযোজ্য, কারণ দায়িত্বের হাদীসটি ছেলে-মেয়ে সবার জন্যই।
হাতখরচ ও বাজেট: ডেইলি স্টার বাংলার পরামর্শ
ডেইলি স্টার বাংলার লেখাটির মূল কথা, শিশুদের বাজেট শেখানো কঠিন নয়। লেখাটিতে সূত্র হিসেবে হেল্প মি গ্রো, গ্রিনভ্যালি ফেডারেল ক্রেডিট ইউনিয়ন ও স্টাডি ডটকমের নাম আছে। বয়স ধরে পরামর্শ:
- দুই-তিন বছর: দান, সঞ্চয় ও খরচ, তিন পাত্রে টাকা ভাগ করা। শুরুর অনুপাত ১০ শতাংশ দান, ২০ শতাংশ সঞ্চয়, ৭০ শতাংশ নিজের খরচ।
- স্কুলপড়ুয়া: যে বেশি খরচ করে তাকে সঞ্চয়ে উৎসাহ দিতে হবে। যে শুধু জমায় তাকে ছোট লক্ষ্যের জন্য কিছু খরচ করতে শেখাতে হবে।
- কৈশোরের শুরু: বড় কেনাকাটায় সন্তানকে অংশ নিতে দেওয়া, যেমন সরঞ্জাম বা পোশাক কেনার ক্ষেত্রে নিজের সঞ্চয় থেকে ছোট একটি অংশ দেওয়া।
- ১৩-১৪ বছর: পরিবারের বাজেটের হিসাব সামনে তুলে ধরা এবং নিজের মোবাইল বিল নিজে মেটাতে উৎসাহ দেওয়া।
(লেখাটিতে কিস্তি ও প্রাইজবন্ডের উল্লেখও আছে। এই লেখায় সেগুলো নেওয়া হয়নি, কারণ ইসলামী দৃষ্টিতে এসবের হুকুম আলাদা অনুসন্ধানের বিষয়।)
লেখাটির স্কুলপড়ুয়া অংশের মূল শিক্ষা হলো, টাকা জমানো যেমন জরুরি, প্রয়োজনে খরচ করতে অভ্যস্ত হওয়াও তেমনই জরুরি। শিশু বা কিশোর কোন স্বভাবের, তা বুঝে অভিভাবক সেই অনুযায়ী পথ দেখাবেন। আর তিন পাত্রের দান-পাত্রটি কিশোরকে অভাবী মানুষের কথা ভাবতেও শেখায়।
কুরআনের মধ্যপন্থা
হাতখরচ শেখানোর সঙ্গে সংযমের ভারসাম্যও শেখাতে হবে। আল্লাহ বলেন, “তুমি একেবারে ব্যয়-কুষ্ঠ হয়োনা এবং একেবারে মুক্ত হস্তও হয়ো না। তাহলে তুমি তিরস্কৃতি, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৯)।
রহমানের বান্দাদের গুণ বর্ণনায় বলা হয়েছে, “এবং তারা যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী।” (সূরা ফুরকান, ২৫:৬৭)।
অপচয় সম্পর্কে কুরআনে আরও এসেছে: “আত্নীয়-স্বজনকে তার হক দান কর এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। এবং কিছুতেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। শয়তান স্বীয় পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।” (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৬-২৭)। আরেক জায়গায়: “খাও ও পান কর এবং অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আরাফ, ৭:৩১)।
ডেইলি স্টারের “সঞ্চয়-পাত্র” ও “খরচ-পাত্র” শিশুকে একই শিক্ষা দেয়: কৃপণতাও নয়, অপচয়ও নয়।
বাবা-মায়ের জন্য সারকথা
- দায়িত্বের হাদীসটি (বুখারী ২৪০৯) কিশোরকেও শোনান: প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু দায়িত্ব আছে।
- ঘরের কাজ ছেলে-মেয়ে সবাইকে ছোট থেকে শেখান; একসঙ্গে একটি করে শুরু করা যায়।
- হাতখরচকে দান, সঞ্চয় ও খরচে ভাগ করার পদ্ধতি চালু করুন।
- কিশোরকে পারিবারিক হিসাবের কিছুটা অংশ দেখান, মোবাইল বিলের মতো ছোট দায়িত্ব দিন।
- খরচে মধ্যপন্থা, সূরা বনী ইসরাঈল ও সূরা ফুরকানের আয়াত আলোচনায় আনুন।
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের দায়িত্বশীল, মিতব্যয়ী ও নেককার বানান।
