যে আত্মীয় সম্পর্ক রাখে না, তার সঙ্গেও সম্পর্ক রাখা
প্রায় সব পরিবারেই এমন একজন আত্মীয় থাকেন, যিনি কথা বলেন না, খোঁজ নেন না, বরং আমাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন। তখন মন বলে, সে যখন আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, আমি কেন তার পেছনে ঘুরব? এই অনুভূতি মানবিক। কিন্তু ইসলাম আমাদের এখানে এক উঁচু মাপকাঠি শিখিয়েছে। এই লেখায় আমরা দেখব, যে আত্মীয় সম্পর্ক রাখে না, তার সঙ্গে কীভাবে ও কতটুকু সম্পর্ক রাখা উচিত।
প্রতিদান নয়, সম্পর্ক রক্ষাই আসল
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন, সম্পর্ক রক্ষাকারী সে নয়, যে শুধু উপকারের বদলে উপকার করে। বরং প্রকৃত সম্পর্ক রক্ষাকারী সে, যার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হলে সে তা জুড়ে রাখে (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৯৯১)।
ভেবে দেখুন, কেউ আপনাকে সালাম দিলে আপনি সালামের জবাব দিলেন, কেউ দাওয়াত দিলে আপনি গেলেন। এটা ভালো, কিন্তু এটা পাল্টা আদান-প্রদান। নবীজি ﷺ আমাদের ডাকছেন তার চেয়ে বেশি কিছুর দিকে, যেখানে অপর পক্ষ ভুল করলেও আমরা সম্পর্কের দরজা খোলা রাখি।
এক সাহাবীর অভিযোগ ও নবীজির উত্তর
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি নবীজি ﷺ-কে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার কিছু আত্মীয় আছে। আমি তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখি, আর তারা ছিন্ন করে। আমি ভালো ব্যবহার করি, আর তারা মন্দ ব্যবহার করে। আমি সহনশীল থাকি, আর তারা আমার সঙ্গে রূঢ় আচরণ করে। নবীজি ﷺ বললেন, তুমি যদি এমনই হও, যেমন বললে, তাহলে তুমি যেন তাদের গরম ছাই খাওয়াচ্ছ। আর যতদিন তুমি এই অবস্থায় থাকবে, ততদিন আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী তোমার সঙ্গে থাকবে (সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৫৫৮)।
এই হাদীসে তিনটি শিক্ষা আছে।
প্রথমত, আপনার ধৈর্য ও ভালো আচরণ অপর পক্ষের জন্য লজ্জার কারণ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আপনি একা নন। আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আপনার সঙ্গে থাকে।
তৃতীয়ত, এই সাহায্য ততদিন থাকে, যতদিন আপনি এই পথে অটল থাকেন।
কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা সূরা রা’দে (১৩:২১) মুমিনদের প্রশংসা করেছেন, যারা আল্লাহ যা জুড়ে রাখতে বলেছেন তা জুড়ে রাখে এবং রবকে ভয় করে। সূরা বাকারায় (২:২৭) তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বলা হয়েছে, যারা আল্লাহ যে সম্পর্ক রক্ষা করতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে। এসব আয়াতে আত্মীয় সদাচরণ করছে কি না, সেই শর্ত নেই।
কীভাবে সম্পর্ক রাখবেন
প্রয়োজনের সময় আত্মীয়ের পাশে থাকা উচিত, তার আগের খারাপ ব্যবহারের হিসাব না রেখে। অহংকার ছেড়ে একটু এগিয়ে গেলেই অনেক সময় দূরত্ব ভেঙে যায়, আর এই এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনি যতটা ভাবছেন, তার চেয়ে কম লাগে।
বড় কিছু করার দরকার নেই। ছোট ও আন্তরিক কিছু কাজই যথেষ্ট:
- দেখা হলে আগে সালাম দিন।
- ঈদ বা বিশেষ দিনে শুভেচ্ছা জানান।
- ফোন বা বার্তায় মাঝে মাঝে খোঁজ নিন।
- অসুস্থ হলে দেখতে যান।
- বিপদের সময় পাশে দাঁড়ান, তার আগের খারাপ আচরণের হিসাব না করে।
- একটি সালাম, একটি ফোন বা দুঃখ প্রকাশই অনেক সময় দূরত্ব কমিয়ে আনে।
- তার জন্য দোয়া করুন।
আর্থিক সাহায্যে দ্বিগুণ সওয়াব
সালমান ইবনে আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন, অভাবীকে সদকা দিলে তা শুধু সদকা, আর আত্মীয়কে দিলে তা দুটি: সদকা এবং আত্মীয়তার হক আদায় (সুনানে নাসাঈ, হাদীস ২৫৮২)। তাই কোনো আত্মীয় যদি অভাবে থাকেন, তার আচরণ যেমনই হোক, সামর্থ্য থাকলে সাহায্য করা দ্বিগুণ কল্যাণের পথ।
যা এড়িয়ে চলবেন
- কারও সম্পর্কে যাচাই না করে নেতিবাচক কথা বিশ্বাস করবেন না।
- গীবত বা কানকথা থেকে দূরে থাকুন।
- খারাপ আচরণের জবাবে খারাপ আচরণ করবেন না।
- অহংকার ধরে বসে থাকবেন না।
- জীবনসঙ্গী বা শ্বশুরবাড়ির কথায় প্রভাবিত হয়ে নিজের পরিবারের প্রতি অন্যায় করবেন না, এবং উল্টোটাও করবেন না।
সীমারেখা ঠিক করা
সম্পর্ক রাখার মানে এই নয় যে, কেউ আপনাকে ক্রমাগত কষ্ট দিলেও তাকে অবাধে কাছে আনতে হবে। যিনি ক্ষতি করেন বা মনের শান্তি নষ্ট করেন, তার থেকে সামাজিক ও মানসিক দূরত্ব রাখা যায়। তবে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করা সমাধান নয়। দূরে থেকেও ছোট যোগাযোগ, খোঁজখবর ও দোয়ার মাধ্যমে সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখা যায়। কোনো নির্দিষ্ট জটিল পরিস্থিতিতে একজন বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
আল্লাহর সতর্কবাণী মনে রাখুন
আবু বাকরা (রা.) বর্ণিত হাদীসে নবীজি ﷺ বলেছেন, অত্যাচার এবং আত্মীয়তা ছিন্ন করার চেয়ে এমন গুনাহ আর নেই, যার শাস্তি আল্লাহ দুনিয়াতেই দ্রুত দেওয়ার যোগ্য মনে করেন, আর আখিরাতের জন্যও জমা রাখেন (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯০২)। অন্যের ভুল আমাদের ভুল করার অনুমতি দেয় না।
শেষ কথা
যে আপনাকে ছেড়ে দিয়েছে, তাকে ধরে রাখা সহজ কাজ নয়। কিন্তু নবীজি ﷺ-এর কথা অনুযায়ী, এই কঠিন কাজেই আল্লাহর সাহায্য আপনার সঙ্গে থাকে। আজ একটি ছোট পদক্ষেপ নিন। এমন একজনকে সালাম দিন বা তার জন্য দোয়া করুন, যে আপনার খোঁজ রাখে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ধৈর্য ও আত্মীয়তা রক্ষার তাওফীক দিন। আমীন।
