শিশুকে নামায ও ভালো অভ্যাস শেখানোর কোমল পথ
প্রতিটি বাবা-মায়ের স্বপ্ন থাকে, সন্তান নামাযি হবে, সৎ হবে, ভালো মানুষ হবে। কিন্তু চেষ্টা করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় উল্টো ফল পাই। জোর করে নামাযে বসালে সন্তান মনে মনে বিরক্ত হয়। বারবার ধমক দিলে সে ধর্মকর্ম থেকেই দূরে সরে যেতে চায়। তাই শিশুকে শেখানোর পথটা হতে হবে কোমল, ধৈর্যের আর ভালোবাসায় ভরা।
নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাযের আদেশ দাও, আর দশ বছর হলে এর জন্য তাদের শাসন করো এবং তাদের বিছানা আলাদা করে দাও (আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৫)। এখান থেকে একটা ধাপ বোঝা যায়। আগে অভ্যাস গড়া, তারপর গুরুত্ব বোঝানো। তবে শাসনের মানে নির্মমতা নয়, ধীরে ধীরে দায়িত্ববোধ জাগানো।
নিজে করে দেখান
শিশুরা অনুকরণ করে শেখে। আপনি রোজ ঠিক সময়ে নামায পড়লে, তাদের সামনে কোরআন তিলাওয়াত করলে, সত্য বললে সে-ও ধীরে ধীরে তা অনুসরণ করবে। যে ঘরে বাবা-মা নামাযের সময় মোবাইল ঘাঁটেন, সেখানে সন্তানকে নামাযের নসিহত করা কঠিন।
ছোট সন্তানকে নামাযের সময় পাশে দাঁড় করিয়ে দিন। সে হয়তো শুধু আপনার দেখাদেখি দাঁড়াবে, কিছু ভুলও করবে। তাতে বিরক্ত হবেন না। এই দাঁড়ানোটাই তার ভেতরে নামাযের প্রতি ভালোবাসার বীজ বুনে দেয়।
ছোট ছোট ধাপে শেখান
প্রথমেই পাঁচ ওয়াক্তের চাপ না দিয়ে একটা ওয়াক্ত দিয়ে শুরু করুন। হয়তো মাগরিবে সবাই একসাথে দাঁড়ালেন। কয়েক সপ্তাহ পর এশা যোগ করুন। এভাবে ধাপে ধাপে বাড়ান। নামাযের সূরা মুখস্থ করাতে বাচ্চাদের সাথে মিলে ছোট ছোট সূরা পড়ুন। প্রতি সপ্তাহে একটি করে নতুন সূরা শেখালে কয়েক মাসেই অনেক কিছু হয়ে যায়।
নামাযের পর একসাথে দুআ করুন। সন্তানের নাম ধরে দুআ করলে সে ভালোবাসা টের পায়। ছোটদের জন্য রঙিন জায়নামাজ বা ছোট একটা নামাযের জায়গা বানিয়ে দিলে তারাও সেখানে বসতে আগ্রহী হয়।
মসজিদে সঙ্গে নিয়ে যান
ছেলে সন্তানকে মাঝে মাঝে মসজিদে নিয়ে যান, বিশেষ করে জুমার দিন। বড়দের সাথে কাতারে দাঁড়ানোর আনন্দ শিশুমনে গভীর ছাপ ফেলে। ফেরার পথে ছোট কোনো উপহার দিতে পারেন। মসজিদ যেন তার কাছে ভয়ের জায়গা না হয়, বরং আনন্দের জায়গা হয়ে ওঠে।
নবীজি ﷺ নাতি হাসান ও হুসাইনকে নামাযের সময় কাঁধে তুলে নিতেন, সিজদায় তারা পিঠে উঠে গেলে সিজদা দীর্ঘ করতেন (নাসাঈ, হাদীস ১১৪১)। শিশুদের প্রতি এই কোমলতা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
ভালো আচরণ শেখানো
নামাযের পাশাপাশি আচরণ শেখানোও জরুরি। সালাম দেওয়া, বড়দের সামনে নম্র হওয়া, সত্য বলা, অন্যের জিনিসে হাত না দেওয়া, খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলা, ডান হাতে খাওয়া, এসব ছোট ছোট আদব ছোটবেলা থেকেই শেখান। শেখানোর সময় গল্পের সাহায্য নিন। নবীজি ﷺ এর জীবনের ছোট ঘটনা আর সাহাবীদের কাহিনি শিশুদের খুব টানে।
ভুল করলে সবার সামনে লজ্জা না দিয়ে একান্তে বুঝিয়ে বলুন। আর ভালো কাজ করলে সাথে সাথে প্রশংসা করুন। শিশুমন প্রশংসায় যত উৎসাহ পায়, ধমকে তত পায় না।
পুরস্কার ও উৎসাহ
যে বাচ্চা সপ্তাহের সব নামায ঠিকমতো পড়ল, তাকে ছোট একটা উপহার দিন, হোক সেটা একটা বই বা প্রিয় খাবার। নামাযের একটা চার্টও বানাতে পারেন, যেখানে প্রতিটি নামাযের পর একটা করে টিক পড়বে। এতে খেলার ছলে আগ্রহ তৈরি হয়। তবে মূল উদ্দেশ্য যেন আল্লাহর জন্য নামায পড়াই থাকে, উপহারের লোভে নয়। কথাটা তাকে বারবার বুঝিয়ে বলুন।
রোযা ও কোরআনের সাথে পরিচয় করান
নামাযের সাথে ছোটবেলা থেকেই রোযা ও কোরআনের সাথেও সন্তানের বন্ধুত্ব গড়ে দিন। রমযান এলে সাহরি ও ইফতারে তাকে সঙ্গে রাখুন। প্রথমে একটি-দুটি রোযা রাখতে উৎসাহ দিন, কিন্তু কষ্ট দেবেন না। রোজ সকালে বা রাতে সন্তানের সাথে বসে কয়েক মিনিট কোরআন পড়ুন। সহজ উচ্চারণে শিখিয়ে দিন। একজন ভালো শিক্ষকের কাছে নিয়মিত পাঠের ব্যবস্থা করুন। বাড়িতে তিলাওয়াতের একটা সময়ও ঠিক করে রাখুন, যেমন মাগরিবের পর কিংবা ফজরের পর। সময় ঠিক থাকলে অভ্যাস টেকে।
নিজের ধৈর্য ধরে রাখুন
শিশুরা একদিনে নামাযি হয়ে যায় না। মাঝে মাঝে তারা অলসতা করবে, ভুলে যাবে, বায়না ধরবে। তখন রাগ না করে নরম গলায় মনে করিয়ে দিন। এখানে সফলতার চাবি ধৈর্য আর ধারাবাহিকতা। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, তুমি তোমার পরিবারকে নামাযের আদেশ দাও এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাকো (সূরা তা-হা, ২০:১৩২)।
মোবাইল আর পর্দার সীমা
আজকের শিশুদের নামায ও ভালো অভ্যাসের পথে সবচেয়ে বড় বাধা মোবাইল ও টিভির পর্দা। দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে দিন, যখন সে পর্দা দেখতে পারবে, বাকি সময় নয়। নামায আর খাবারের সময় ঘরের সবার জন্য মোবাইল বন্ধ রাখার নিয়ম করুন। বাচ্চার হাতে মোবাইল দেওয়ার আগে ভাবুন, সে সেখানে কী দেখছে। ভালো ইসলামি শিক্ষামূলক গল্প বা ছড়া খুঁজে দিতে পারেন, কিন্তু সময়ের লাগাম হাতে রাখুন। আর তাদের পাশে বসে থাকার সময় আপনি নিজেও মোবাইল সরিয়ে রাখুন। আপনার মনোযোগই তাদের কাছে সবচেয়ে দামি উপহার।
শেষ কথা
সন্তানের ভেতরে আল্লাহর ভালোবাসা জাগানো আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এটা এক রাতে হবে না, কিন্তু প্রতিদিনের ছোট চেষ্টায় একদিন ফল মিলবে। আজ রাতেই সন্তানের হাত ধরে বলুন, চলো একসাথে নামাযে দাঁড়াই।
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের নামাযি ও নেককার বানান এবং আমাদের তাদের সঠিক পথে গড়ে তোলার তাওফীক দিন। আমীন।
