পরিবারের প্রধান হিসেবে বাবার দায়িত্ব

আমাদের সমাজে বাবা বলতে অনেক সময় বোঝায় সেই মানুষটিকে, যিনি রোজগার করেন, সংসারের খরচ চালান আর বাইরের কাজ সামলান। এগুলো যে তাঁর বড় দায়িত্ব, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাবার দায়িত্ব এখানেই শেষ নয়। সন্তানের মনে বাবা কেমন জায়গা করে নিলেন, ঘরে তাঁর উপস্থিতি কেমন, স্ত্রীর কাছে তিনি কেমন সঙ্গী, এসবও সংসারের সুখ-শান্তিতে বড় ভূমিকা রাখে।

নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমরা সবাই দায়িত্বশীল, আর সবাইকে তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। শাসক তার প্রজাদের ব্যাপারে দায়ী। পুরুষ তার পরিবারের ব্যাপারে দায়ী। নারী তার স্বামীর ঘর ও সন্তানদের ব্যাপারে দায়ী (বুখারী, হাদীস ৮৯৩; মুসলিম, হাদীস ১৮২৯)। অর্থাৎ বাবা শুধু উপার্জনকারী নন, আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে, এমন একজন দায়িত্বশীল মানুষ।

হালাল রিযিকের চেষ্টা

পরিবারের মুখে হালাল উপার্জনের লোকমা তুলে দেওয়া বাবার প্রথম বড় দায়িত্ব। তাই আয় কম হলেও হালাল পথেই থাকুন। ঘুষ, ধোঁকা, সুদ আর অবৈধ লেনদেন থেকে দূরে থাকুন। হালালের বরকত বাইরে থেকে হয়তো কম মনে হয়, কিন্তু ঘরে সে প্রশান্তি নিয়ে আসে।

নবীজি ﷺ বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যখন নিজের পরিবারের জন্য সওয়াবের নিয়তে খরচ করে, তখন সেটা তার জন্য সদকা হয়ে যায় (বুখারী, হাদীস ৫৫)। কাজেই নিয়ত ঠিক থাকলে সংসারের জন্য পরিশ্রম করাও ইবাদতের মধ্যে গণ্য হয়।

সময় দেওয়া, শুধু টাকা নয়

অনেক বাবা সকালে বেরিয়ে যান, ফেরেন রাতে। ততক্ষণে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ে। পরের দিনও একই রুটিন। এভাবে বছরের পর বছর কেটে যায়, অথচ সন্তান বাবার সাথে মন খুলে কথা বলার সুযোগই পায় না। টাকা সংসারের প্রয়োজন মেটায়, কিন্তু সন্তানের মনের প্রয়োজন মেটাতে লাগে বাবার সময়।

সপ্তাহে অন্তত একটা সন্ধ্যা শুধু পরিবারের জন্য রাখুন। সন্তানের সাথে খেলুন, পড়াশোনার খোঁজ নিন। মাঝে মাঝে তাদের নিয়ে মসজিদে যান। ছুটির দিনে সবাই মিলে বেড়াতে বের হন। এই সময়গুলোই একদিন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে থাকবে।

সন্তানের তরবিয়ত

সন্তানকে শেখানোর দায়িত্ব বাবারও। ছোটবেলা থেকেই তাদের আল্লাহর পরিচয়, কালিমা, নামায আর ভালো আচরণ শেখানো দরকার। নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদের নামাযের আদেশ দাও (আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৫)। আদেশ দেওয়ার মানে ভয় দেখানো নয়। নিজে নামায পড়ুন, সাথে নিয়ে মসজিদে যান, সুন্দর করে বুঝিয়ে বলুন। এভাবেই অভ্যাস গড়ে ওঠে।

শুধু দ্বীনের শিক্ষা নয়, দুনিয়ার শিক্ষাও দরকার। তাদের স্কুলের খোঁজ রাখুন, কাদের সাথে মিশছে জানুন, মোবাইল বা ইন্টারনেটে কী দেখছে সেদিকে সজাগ থাকুন। ধমক না দিয়ে বন্ধুর মতো কথা বলুন।

স্ত্রীর প্রতি ইনসাফ ও কোমলতা

যিনি ভালো স্বামী, তিনিই ভালো বাবা হতে পারেন। স্ত্রীর সাথে নরম আচরণ করা, তাঁর কথা শোনা, কষ্টের খবর রাখা, ঘরের কাজে হাত লাগানো, এসবও বাবার দায়িত্বের অংশ। নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম (তিরমিযী, হাদীস ৩৮৯৫)। বাবা-মায়ের সম্পর্ক দেখেই সন্তান শেখে, নারীকে কীভাবে সম্মান করতে হয়।

মনে রাখবেন, ঘরে চিৎকার করা, স্ত্রীকে অপমান করা বা সন্তানের সামনে ঝগড়া করা তাদের মনে গভীর দাগ ফেলে। রাগ হলে তাই নিজেকে সামলে নিন।

নিজের চরিত্র দিয়ে শিক্ষা দিন

সন্তান কথার চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শেখে। আপনি সত্য বললে, ওয়াদা রাখলে, প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করলে, বড়দের সম্মান করলে সন্তানও তা-ই শিখবে। আবার মুখে এক কথা আর কাজে আরেক রকম হলে সে সেটাও ঠিক ধরে ফেলবে। তাই সন্তানের সামনে নিজের আচরণ নিয়ে সচেতন থাকুন।

মেয়েদের প্রতি বিশেষ যত্ন

আমাদের সমাজে অনেক সময় ছেলে আর মেয়ের মধ্যে ভেদাভেদ করা হয়। অথচ নবীজি ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি দুটি কন্যাকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, সে ও আমি কিয়ামতের দিন এভাবে থাকব, এই বলে তিনি দুই আঙুল একসাথে করে দেখালেন (মুসলিম, হাদীস ২৬৩১)। মেয়েকে শিক্ষা, ভালোবাসা আর সম্মান দেওয়া বাবার বিশেষ দায়িত্ব। তার কথা মন দিয়ে শুনুন, আত্মবিশ্বাসী হয়ে বড় হতে সাহায্য করুন।

সমস্যায় সন্তানের পাশে থাকুন

সন্তান কখনও ভুল করে বসবে। পরীক্ষায় খারাপ করবে, কারও সাথে ঝগড়া বাধাবে, কিংবা ভুল পথে পা বাড়াবে। তখন প্রথমেই চিৎকার না করে শুনুন, কী ঘটেছে। তারপর একসাথে সমাধান খুঁজুন। যে সন্তান জানে বাবা তার পাশে আছেন, সে সব কথা বাবাকেই বলে। আর যে বাবাকে ভয় পায়, সে সত্য লুকাতে শেখে।

ভবিষ্যতের প্রস্তুতি

পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভাবাও বাবার দায়িত্ব। বিপদের জন্য কিছু সঞ্চয় রাখা, সন্তানের পড়াশোনার পরিকল্পনা করা, বাবা-মায়ের চিকিৎসার জন্য তৈরি থাকা, এগুলো বুদ্ধিমানের কাজ। সম্ভব হলে আর্থিক সিদ্ধান্তে স্ত্রীকেও সাথে রাখুন। তাতে তিনিও নিশ্চিন্ত থাকেন।

নিজের যত্নও নিন

সংসারের দায়িত্বে ডুবে থাকতে থাকতে অনেক বাবা নিজের স্বাস্থ্য আর মনের কথা ভুলে যান। অথচ আপনি অসুস্থ হলে পুরো পরিবার বিপদে পড়ে। তাই নিয়মিত হাঁটুন, পরিমিত খান, ঠিকমতো ঘুমান। মন ভার থাকলে বিশ্বস্ত কোনো বন্ধু বা আত্মীয়ের সাথে কথা বলুন।

শেষ কথা

বাবা হওয়া মানে একটা বড় আমানত বহন করা। এই আমানতের হক আদায় করতে ধৈর্য, ভালোবাসা, ইনসাফ আর আল্লাহর ওপর ভরসা, সবই লাগে। কোনো বাবাই নিখুঁত নন, কিন্তু চেষ্টা করে যাওয়াটাই আল্লাহর কাছে প্রিয়।

আল্লাহ আমাদের সব বাবাকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের তাওফীক দিন এবং তাঁদের পরিবারে শান্তি ও বরকত দিন। আমীন।

Author

  • আমির হামজাহ

    আমির হামজাহ জামিয়াতু ইবরাহীম, মাহমুদনগর, সাইনবোর্ড, ঢাকার একজন শিক্ষক, লেখক ও অভিজ্ঞ মুফতি। তিনি প্রায় ৭ বছর ধরে ইসলামী বিষয় নিয়ে লেখালেখি ও ব্লগিং করছেন। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিবার, বিবাহ, দাম্পত্য জীবন ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। তিনি ইসলামিক কার্যক্রম ও দাওয়াহর সঙ্গে যুক্ত এবং পরিবার BD (PoribarBD.com)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক।

মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * চিহ্নিত।