বৃদ্ধ মা-বাবার সাথে কেমন আচরণ করব
একসময় যে মানুষটা আমাদের হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিলেন, আজ তাঁর হাত কাঁপে। যে মা রাতের পর রাত জেগে জ্বরের কপালে জলপট্টি দিয়েছেন, আজ তাঁর চোখে ঝাপসা দেখা। যে বাবা নিজে না খেয়ে আমাদের পড়ার খরচ জুগিয়েছেন, আজ তিনি সামান্য ওষুধের জন্য সংকোচ করেন। বার্ধক্য মানুষকে দুর্বল করে ঠিকই, কিন্তু সন্তানের কাছে এই দুর্বলতাই তাঁদের ঋণ কিছুটা শোধ করার সবচেয়ে বড় সুযোগ।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে তাঁকে ছাড়া আর কারও ইবাদত করো না এবং পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করো। তাঁদের একজন বা উভয়ে যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে পৌঁছায়, তবে তাঁদের উফ বলো না এবং তাঁদের ধমক দিয়ো না, বরং তাঁদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো (সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭:২৩)। লক্ষ্য করুন, আল্লাহ এখানে বিশেষভাবে বার্ধক্যের কথা বলেছেন। কারণ এই সময়টাতেই সন্তানের ধৈর্যের পরীক্ষা হয়।
উফ বলার আগে ভাবুন
বৃদ্ধ মানুষ অনেক সময় একই কথা বারবার বলেন। একই গল্প দশবার শোনান। কিছু ভুলে যান, তারপর আবার জিজ্ঞেস করেন। কখনও একটু জেদি হয়ে ওঠেন। আমাদের তখন বিরক্ত লাগে। বিরক্তি চেপে রাখতে না পেরে হয়তো মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, “আপনাকে তো একশবার বললাম!” কিন্তু মনে রাখুন, কোরআন আমাদের উফ শব্দটুকু বলতেও নিষেধ করেছে।
ছোটবেলায় আমরাও একই প্রশ্ন বারবার করেছি। মা কখনও বলেননি, “তুমি বিরক্ত করছ।” তিনি হাসিমুখে প্রতিবার উত্তর দিয়েছেন। আজ সেই ধৈর্যটুকু ফিরিয়ে দেওয়ার পালা আমাদের।
সময় দিন, শুধু টাকা নয়
অনেক সন্তান ভাবেন, প্রতি মাসে খরচ পাঠালেই দায়িত্ব শেষ। অথচ বৃদ্ধ বাবা-মা সবচেয়ে বেশি চান সন্তানের সঙ্গ। দিনে একবার ফোন করা, পাশে বসে চা খাওয়া, তাঁদের পুরনো দিনের গল্প মন দিয়ে শোনা, এসবের দাম টাকায় হয় না।
ঘরে থাকলে সকালে বা সন্ধ্যায় কিছুটা সময় তাঁদের সাথে বসুন। শরীরের খবর নিন। ওষুধ ঠিকমতো খাচ্ছেন কিনা দেখুন। নিয়মিত ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। দূরে থাকলে অন্তত রোজ একবার ফোনে বা ভিডিওতে কথা বলুন। এই ছোট জিনিসগুলোই তাঁদের একাকিত্ব কমায়।
কথা বলার ধরন
বৃদ্ধ বয়সে মানুষ খুব স্পর্শকাতর হয়ে যান। সামান্য কড়া কথাতেও তাঁদের মন ভেঙে যায়। তাই কথা বলার সময় গলা নরম রাখুন। তাঁদের মত অপছন্দ হলেও সরাসরি কেটে না দিয়ে বলুন, “আপনি ঠিকই বলছেন, তবে আমি একটু অন্যভাবে ভেবেছি।” সম্ভব হলে সবার সামনে তাঁদের ভুল ধরবেন না।
নবীজি ﷺ বলেছেন, যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলের নয় (তিরমিযী, হাদীস ১৯১৯)। বড়দের সম্মান করা মানে শুধু বয়সের মর্যাদা দেওয়া নয়, তাঁদের অভিজ্ঞতার মর্যাদা দেওয়াও।
তাঁদের সেবাই জান্নাতের পথ
একবার এক সাহাবী নবীজি ﷺ এর কাছে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। নবীজি ﷺ জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবা-মা কি জীবিত আছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। নবীজি ﷺ বললেন, তাহলে তাঁদের সেবাতেই চেষ্টা করো (বুখারী, হাদীস ৩০০৪)। এই হাদীস থেকে বোঝা যায়, বাবা-মায়ের সেবা কত বড় ইবাদত।
আরেক হাদীসে নবীজি ﷺ বলেছেন, তার নাক ধুলোয় ধূসরিত হোক, তার নাক ধুলোয় ধূসরিত হোক। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, কার, ইয়া রাসূলাল্লাহ? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি বাবা-মা দুজনকে বা একজনকে বার্ধক্যে পেল, কিন্তু জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না (মুসলিম, হাদীস ২৫৫১)। অর্থাৎ বাবা-মা বেঁচে থাকলে তাঁরা আমাদের জন্য জান্নাতের সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে আছেন।
ঘরের পরিবেশ তাঁদের উপযোগী করুন
বৃদ্ধ মানুষের জন্য ঘরটা একটু সহজ ও নিরাপদ করা দরকার। বাথরুমে যেন পা পিছলে না যায়, সে ব্যবস্থা রাখুন। রাতে চলাচলের পথে একটা হালকা আলো জ্বালিয়ে রাখুন। তাঁদের বসার জায়গাটা আরামদায়ক রাখুন, যেখানে সকালের রোদ আসে। নামাযের জায়গা পরিষ্কার রাখুন, যাতে সহজে পৌঁছানো যায়। খাবারে নরম, সহজপাচ্য আর তাঁদের পছন্দের পদ রান্না করুন।
ঘরের সব সিদ্ধান্তে তাঁদের মত নিন। এতে তাঁরা বোঝেন যে এ সংসারে তাঁদের গুরুত্ব এখনও আছে।
মৃত্যুর পরেও সেবা চলে
বাবা-মা দুনিয়া থেকে চলে গেলেও তাঁদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। তাঁদের জন্য দুআ করা, তাঁদের পক্ষ থেকে সদকা করা, তাঁদের বন্ধুদের সম্মান করা, তাঁদের ওসিয়ত পূরণ করা, এসবই সন্তানের কাজ। নবীজি ﷺ বলেছেন, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বাদে: সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম, এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দুআ করে (মুসলিম, হাদীস ১৬৩১)।
ভাইবোনেরা মিলে দায়িত্ব ভাগ করুন
বাবা-মায়ের সেবা অনেক সময় একজন সন্তানের ওপরই বেশি পড়ে যায়, আর বাকিরা দূর থেকে মন্তব্য করেন। এতে সেই সন্তান ক্লান্ত হয়ে পড়েন, ভাইবোনদের মধ্যেও মনোমালিন্য তৈরি হয়। ভালো হয়, সবাই বসে ঠিক করে নিলে কে কী দায়িত্ব নেবে। কেউ সেবা করবে, কেউ চিকিৎসার খরচ দেবে, কেউ নিয়মিত দেখতে যাবে। যার যতটুকু সাধ্য, ততটুকুই যথেষ্ট, কিন্তু কেউ যেন একেবারে বাদ না পড়ে।
শেষ কথা
আজ হয়তো আমরা ব্যস্ত। কিন্তু একদিন আমরাও বৃদ্ধ হব। নিজের সন্তানদের কাছ থেকে যে আচরণ আশা করি, আজ নিজের বাবা-মাকে সেই আচরণই দিতে শিখি। আজই ফোন তুলে বাবা-মায়ের খবর নিন। তাঁদের কাছে বসুন। সামান্য একটা হাসি তাঁদের পুরো দিনটা ভরে দেবে।
আল্লাহ আমাদের বাবা-মাকে সুস্থ ও সুখে রাখুন, আর আমাদের তাঁদের হক আদায়ের তাওফীক দিন। আমীন।
