রোগ হলে চিকিৎসা, ধৈর্য ও দোয়া
অসুখ হলে আমরা সবাই কিছুটা ভেঙে পড়ি। শরীরের কষ্টের সঙ্গে চিন্তাও যোগ হয়, পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। এই সময় অনেকের মনে প্রশ্ন আসে, শুধু দোয়া করলেই কি যথেষ্ট, না চিকিৎসাও নিতে হবে? আবার কেউ কেউ ভাবেন, ডাক্তারের কাছে যাওয়া তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী কি না। ইসলামের শিক্ষা এই দুই প্রশ্নেরই সুন্দর উত্তর দেয়। রোগ এলে চিকিৎসা নিতে হবে, ধৈর্য ধরতে হবে এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে।
আরোগ্য আল্লাহর হাতে, চিকিৎসা তার মাধ্যম
কুরআনে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কথা বলা হয়েছে, “যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং তিনিই আমাকে খাদ্য ও পানীয় দেন এবং আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই (আল্লাহ) আমাকে সুস্থ করেন।” (সূরা শুআরা, ২৬:৭৮-৮০)। এই আয়াত থেকে শাইখ মুহাম্মাদ উছমান গনী ও প্রথম আলোর ধর্ম ডেস্কের লেখায় একই শিক্ষা এসেছে, প্রকৃত শিফা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। চিকিৎসা হলো বাহ্যিক মাধ্যম, আর নিরাময় দানকারী হলেন আল্লাহ।
তাই মাধ্যম গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের বিপরীত নয়। বরং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে চিকিৎসার নির্দেশ দিয়েছেন। উসামাহ ইবনে শারীক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, কিছু বেদুঈন এসে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো?” নবীজি বললেন, “তোমরা চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করো; কেননা মহান আল্লাহ একমাত্র বার্ধক্য ছাড়া সকল রোগেরই ঔষধ সৃষ্টি করেছেন।” (সুনানে আবূ দাঊদ, হাদীস ৩৮৫৫)। সহীহ বুখারীতেও আছে, “আল্লাহ এমন কোন রোগ পাঠাননি যার আরোগ্যের ব্যবস্থা দেননি।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৬৭৮)
শাইখ উছমান গনী লিখেছেন, রোগ হলে যথাসম্ভব দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া সুন্নত। নবীজি সাহাবিদের দ্রুত চিকিৎসা নিতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং নিজেও অসুস্থতায় চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, যুদ্ধের সফরেও নবীজির নির্দেশনায় মুসলিম কাফেলায় চিকিৎসক দল থাকত। রুফায়দা আসলামিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহার তাঁবুতে আহতদের সেবা হতো, আহত সাহাবিকে নবীজি সেই রুফায়দার তাঁবুতে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলেও তিনি আল-আদাবুল মুফরাদের বরাতে উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিকরা এই তাঁবুকে প্রথম চিকিৎসালয় বলেছেন। অসুস্থকে সেবা দেওয়ার এই ধারা ইসলামের শুরু থেকেই চলে আসছে। ঘরের ক্ষেত্রে এর শিক্ষা হলো, সামান্য অসুখেও অবহেলা না করা এবং বিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
অসুস্থতায় ধৈর্য ও গুনাহ মাফ
অসুখ মুমিনের জীবনে শুধু কষ্ট নয়, ধৈর্য ধরলে এটি গুনাহ মাফের কারণও হয়। আবূ সাঈদ খুদরী ও আবূ হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেছেন, “মুসলিম ব্যক্তির উপর যে কষ্ট ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানী আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফুটে, এ সবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৬৪১)
প্রথম আলোর ধর্ম ডেস্ক লিখেছে, ইসলাম রোগকে শুধু কষ্ট হিসেবে দেখে না, বরং আল্লাহর পরীক্ষা ও রহমতের দরজা হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তাই মুসলিমের কর্তব্য হলো রোগ এলে ধৈর্য ধরা, চিকিৎসা নেওয়া এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করা। ধৈর্য মানে হাল ছেড়ে দেওয়া নয়। ধৈর্য মানে অভিযোগ ও অধৈর্য আচরণ ছেড়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চিকিৎসার সব চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
রোগীকে সান্ত্বনা দেওয়ার নববী ভাষা
ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবীজি যখন কোনো রোগীকে দেখতে যেতেন, তখন বলতেন, “কোন ক্ষতি নেই। ইনশাআল্লাহ তুমি তোমার গুনাহসমূহ থেকে পবিত্রতা লাভ করবে।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৬৫৬)। রোগীর পাশে গিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে এমন আশার কথা বললে রোগীর মন শান্ত হয়।
হাদীসে বর্ণিত রোগমুক্তির দোয়া
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, নবীজি তাঁর কোনো কোনো স্ত্রীকে সূরা নাস ও সূরা ফালাক পড়ে ডান হাত দিয়ে বুলিয়ে দিতেন এবং এই দোয়া পড়তেন, “হে আল্লাহ! মানুষের প্রতিপালক, কষ্ট দূর কর এবং আরোগ্য দান কর, তুমিই আরোগ্য দানকারী, তোমার আরোগ্য ছাড়া অন্য কোন আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দাও, যা কোন রোগ অবশিষ্ট থাকে না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৭৪৩)
আর কেউ কোনো রোগীকে দেখতে গেলে সাতবার এই দোয়া করতে পারেন, “আমি মহান আরশের রব মহামহিম আল্লাহ তা’আলার নিকট দুআ প্রার্থনা করছি, তিনি তোমাকে রোগ হতে সুস্থতা দান করুন।” নবীজি বলেছেন, যার মৃত্যুক্ষণ আসেনি তাকে এভাবে দোয়া করলে সে রোগমুক্ত হবে। (জামে তিরমিযী, হাদীস ২০৮৩)
প্রথম আলোর ওই লেখায় দোয়ার চারটি উপকারের কথা এসেছে। দোয়া মনে আত্মিক প্রশান্তি আনে। আশাবাদী মানসিকতা তৈরি করে। রোগকে গুনাহ মাফের সুযোগে পরিণত করে। আর চিকিৎসার পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। তবে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়।
পরিবারের জন্য কয়েকটি কথা
অসুখের সময় ঘরের সবার ভূমিকা আছে। রোগীর কাছে ভরসার কথা বলুন, তাঁকে বিশ্রাম দিন, সময়মতো ওষুধ ও পথ্য নিশ্চিত করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন। নিজে বা পরিবারের কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে বিলম্ব না করে যোগ্য চিকিৎসকের কাছে যান। দোয়া ও চিকিৎসা, দুটোই একসঙ্গে চলবে।
শেষ কথা
আল্লাহই সুস্থতা দেন, আর চিকিৎসা তাঁর দেওয়া একটি মাধ্যম। অসুখে ধৈর্য ধরলে গুনাহ মাফের সুসংবাদ আছে। তাই চিকিৎসা নেওয়া, দোয়া করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, তিনটিই একসঙ্গে থাকুক। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থতা ও ধৈর্যের তাওফীক দিন। আমীন।
