গণক, জ্যোতিষ ও রাশিফল: ঈমানের দৃষ্টিতে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ

আমাদের সমাজে হাত দেখানো, রাশিফল পড়া, ভাগ্য জানতে গণকের কাছে যাওয়া বা কোনো “বাবা”র কাছে ভবিষ্যৎ জানতে চাওয়ার প্রবণতা একেবারে কম নয়। অনেকে একে নিছক কৌতূহল বা সময় কাটানোর বিষয় মনে করেন। কিন্তু ইসলামের আকীদা বলছে, অদৃশ্যের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর। তাই এ বিষয়ে হাদীসে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। এই লেখায় হানাফী ফতোয়ার আলোকে বিষয়টি ধাপে ধাপে বোঝানো হলো।

অদৃশ্যের জ্ঞান কার

আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আপনি বলুন, আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া কেউ অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে না” (সূরা নামল, আয়াত ৬৫)। নবী-রাসূলগণও আল্লাহর জানানো বিষয়ের বাইরে কিছু জানেন না। তাই কেউ যদি দাবি করে, সে তারা, হাতের রেখা বা অন্য কোনো উপায়ে ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারে, তার দাবির ভিত্তি ইসলামে নেই। আর কেউ সে দাবি বিশ্বাস করলে সে অদৃশ্যের জ্ঞান আল্লাহ ছাড়া অন্যের আছে বলে মেনে নেয়।

হাদীসের সতর্কবাণী

নবীজি ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করে এবং তাকে বিশ্বাস করে, তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল হয় না (সহীহ মুসলিম)। ইমাম নববী রহ. ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ হলো সেই নামাযগুলোর সওয়াব সে পায় না, তবে সেগুলো আবার পড়তে হয় না। দারুল ইফতা ত্রিনিদাদ ও টোবাগো ও আসকিমামের ফতোয়ায় এই হাদীস এসেছে।

আরেক হাদীসে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি গণকের কাছে যায়, সে মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর যা নাযিল হয়েছে, তা অস্বীকার করল (সুনানে তিরমিযী, হাদীস ১৩৫)। শায়খ ফারায রব্বানী জ্যোতিষ ও রাশিফলের ক্ষেত্রে আহমাদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনে মাজার একই ধরনের বর্ণনা উল্লেখ করেছেন: যে ব্যক্তি জ্যোতিষী বা গণকের কাছে গিয়ে তাকে বিশ্বাস করল, সে মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর নাযিলকৃত বিষয়কে অস্বীকার করল।

যাওয়া ও বিশ্বাস করার মধ্যে পার্থক্য

সিকার্সগাইডেন্সের হানাফী ফতোয়ায় (নং ৩১৯৭৬) বিষয়টি দুই ভাগে বোঝানো হয়েছে:

  • গণকের কাছে যাওয়া হারাম। ইমাম নববী রহ. এ বিষয়ে আলেমদের ঐকমত্য উল্লেখ করেছেন।
  • তাকে বিশ্বাস করা। কেউ যদি এই বিশ্বাস রাখে যে গণক সত্যিই অদৃশ্যের জ্ঞান পায়, অথবা এই কাজকে বৈধ মনে করে, তাহলে তা কুফরির পর্যায়ে পড়তে পারে। এর বাইরে এটি মারাত্মক কবীরা গুনাহ।

আসকিমামের ফতোয়ায় বলা হয়েছে, বিশ্বাস করে বা পূর্বাভাস সত্য ভেবে গণকের কাছে গেলে ঈমান হারানোর ঝুঁকি থাকে। এমন কিছু ঘটে গেলে নতুন করে ঈমান ঠিক করে নেওয়া এবং তাওবা করা উচিত।

ফতোয়াটিতে আরও বলা হয়েছে, কাউকে কাফির বলা ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি মুসলমানের কাজ নয়। হানাফী মাযহাবের একটি মত হলো, গণককে কাফির বলা যায় যখন কেউ বিশ্বাস করে যে জিনরা তার ইচ্ছামতো কাজ করে দেয়। কেবল তাকে হাতের কৌশল মনে করলে তা কুফর নয়।

রাশিফল পড়া কি

শায়খ ফারায রব্বানীর উত্তর (ফতোয়া নং ৩৭১৯৩) অনুযায়ী:

  • জ্যোতিষীদের কথায় বিশ্বাস করা বা সে অনুযায়ী আমল করা নিষিদ্ধ।
  • শুধু পড়াও নিন্দনীয়, কারণ এটি অর্থহীন সময় নষ্ট।
  • প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা জরুরি।

অনেকে বলেন, “বিশ্বাস করি না, শুধু মজা করে পড়ি।” কিন্তু একবার দেখলে মন প্রভাবিত হতে পারে। কিছু মিলে গেলে সেই মিলই বিশ্বাসের দরজা খুলে দেয়। পরে ঘটনাগুলো সেই “ভবিষ্যদ্বাণী”র সঙ্গে মেলাতে মন নিজেই কাজ করে।

কিছু ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায় কেন

অনেকে বলেন, “গণকের কিছু কথা তো মিলে যায়।” সহীহ বুখারীতে আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, কিছু লোক নবীজি ﷺ-কে গণকদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, “ওরা কিছুই নয়।” তাঁরা বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ওরা কখনো এমন কথা বলে যা সত্য হয়। তিনি বললেন, ওই সত্য কথাটি জিন ছিনিয়ে নিয়ে তার বন্ধুর কানে ঢেলে দেয়, তারপর তার সঙ্গে শতাধিক মিথ্যা মিশিয়ে দেয় (সহীহ বুখারী, হাদীস ৭৫৬১)। আরেক বর্ণনায় আছে, ফেরেশতারা মেঘের আড়ালে ভবিষ্যতের কথা বললে শয়তানরা তা শুনে নেয় এবং গণকের কানে ঢেলে দেয়, সঙ্গে শত মিথ্যা যোগ করে (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩২৮৮)।

অর্থাৎ হাজারটা কথার মধ্যে দু-একটা মিলে যাওয়া অদৃশ্যের জ্ঞানের প্রমাণ নয়।

জ্যোতির্বিজ্ঞান আর জ্যোতিষ এক নয়

দারুল ইফতা বার্মিংহামের ফতোয়ায় (নং ২৪৫২৮৬) পরিষ্কার পার্থক্য করা হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান একটি বিজ্ঞান, আর জ্যোতিষ বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন চর্চা। সূরা আর-রহমানের ৫ নং আয়াত (“সূর্য ও চন্দ্র নির্দিষ্ট হিসাবের অধীন”) জ্যোতির্বিজ্ঞানের দিকে ইঙ্গিত করে, জ্যোতিষের দিকে নয়। ফতোয়াটিতে বলা হয়েছে, জ্যোতিষ-অনুষ্ঠান দেখা জায়েয নয়। নিজে তা এড়িয়ে চলতে হবে, অন্যকেও এ থেকে বিরত থাকতে বলতে হবে, জ্যোতিষীর কথা শোনা বা বিশ্বাস করা যাবে না। অনিচ্ছাকৃতভাবে টেবিলে বসে থাকলেও দোষ ধরা হবে না, তবে ভুল বুঝতে পেরে তওবা করতে হবে। তওবার তিনটি শর্ত: গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, তার জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং আর না করার দৃঢ় অঙ্গীকার।

দ্য মুফতি ডটকমের ফতোয়ায় (মুফতি ইসমাঈল বাসসা) বলা হয়েছে, ভাগ্য-গণনা কবীরা গুনাহ এবং সম্পূর্ণ হারাম। এ বিষয়ে ইবনে মাজার একটি হাদীসও উদ্ধৃত হয়েছে।

পরিবারে ও সমাজে করণীয়

  • সন্তানদের শেখান, ভবিষ্যৎ আল্লাহর হাতে। আমাদের কাজ চেষ্টা, দোয়া ও ভরসা।
  • বিয়ে, ব্যবসা বা সফরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় গণক বা তারা নয়, ইস্তিখারা ও পরামর্শের পথ নিন।
  • কেউ গণকের কাছে গিয়ে ফেললে তাকে লজ্জা না দিয়ে তাওবার দিকে ডাকুন।
  • টিভি, মোবাইল অ্যাপ বা পত্রিকার রাশিফল দেখার অভ্যাস থাকলে তা ছেড়ে দিন।
  • কোনো অশুভ ঘটনা ঘটলে তাকে গ্রহ-নক্ষত্র বা কোনো দিনের ফল মনে না করে আল্লাহর ফয়সালা ভেবে ধৈর্য ধরুন।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তা-ই আমাদের কাছে পৌঁছাবে। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর মুমিনদের উচিত আল্লাহর ওপরই ভরসা করা” (সূরা তাওবা, আয়াত ৫১)।

Author