দ্বিতীয় বিয়ের আদব: ইনসাফের শর্ত, প্রথম স্ত্রীর হক ও বিধবাকে বিয়ে
দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে সমাজে ভুল ধারণা আর বাড়াবাড়ি, দুটোই আছে। কেউ একে অন্যায় মনে করেন, কেউ আবার স্ত্রীদের হক না দিয়েই করে ফেলেন। এই লেখায় কুরআনের আয়াত, তিরমিযী ও আবু দাউদের হাদীস এবং চারটি হানাফি ফতোয়ার (দারুল ইফতা বার্মিংহাম, দারুল ইফতা লেস্টারের মুফতি মুহাম্মাদ ইবনে আদম, সীকার্স গাইডেন্স ও দারুল উলুম দেওবন্দ) আলোকে বিষয়টি সাজানো হলো। ফতোয়ার কথাগুলো তাদের নামসহ বলা হয়েছে। ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য মুফতির পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কুরআনের শর্ত: ন্যায়সঙ্গত আচরণ
আল্লাহ বলেন, “আর যদি এরূপ আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায় সঙ্গত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তবে, একটিই।” (সূরা নিসা, ৪:৩)। একাধিক বিয়ের অনুমতি ইনসাফের শর্তে, আর ইনসাফ রক্ষা করতে না পারার আশঙ্কা থাকলে একজনই যথেষ্ট।
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, “তোমরা কখনও নারীদেরকে সমান রাখতে পারবে না, যদিও এর আকাঙ্ক্ষী হও। অতএব, সম্পূর্ণ ঝুঁকেও পড়ো না যে, একজনকে ফেলে রাখ দোদুল্যমান অবস্থায়। যদি সংশোধন কর এবং খোদাভীরু হও, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়।” (সূরা নিসা, ৪:১২৯)।
ইনসাফ বলতে কী বোঝায়
মুফতি মুহাম্মাদ ইবনে আদম (দারুল ইফতা, লেস্টার)-এর ফতোয়ায় এক দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে:
- একাধিক স্ত্রী থাকলে সবার সঙ্গে সমান ও ন্যায়সঙ্গত আচরণ আবশ্যক: সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শারীরিক প্রয়োজনে, যার মধ্যে সমান খরচ এবং সমান রাত ভাগ করা পড়ে।
- ভালোবাসা ও সহবাসে সমতা আবশ্যক নয়, কারণ অন্তরের ঝোঁক মানুষের নিয়ন্ত্রণে নেই। তবে বাহ্যিক আচরণে ন্যায়বিচার থাকতে হবে।
- কোনো স্ত্রী ইচ্ছা করলে নিজের রাত সতীনকে ছেড়ে দিতে পারেন, পরে তা ফিরিয়েও নিতে পারেন।
- সফরে কোন স্ত্রীকে নেবেন, তা লটারির মাধ্যমে ঠিক করা উত্তম।
বার্মিংহামের ফতোয়ায় আরও বলা হয়েছে, ভরণপোষণ ও সম্মানজনক আচরণ সমান হওয়া আবশ্যক, তবে একসঙ্গে ঘুমানোর সমতা আবশ্যক নয়। প্রতিটি স্ত্রীর আলাদা বাসস্থান থাকবে, যদি না উভয়ে একসঙ্গে থাকতে রাজি হন। যে স্ত্রীর পালা নয়, তার সঙ্গে দিনের বেলায় সহবাস করা উচিত নয়। এক রাত দুই স্ত্রীর মধ্যে ভাগ করাও উচিত নয়। অসুস্থতার কারণে একজনের কাছে থাকলে সুস্থ হওয়ার পর অন্যদের দিনগুলো পূরণ করতে হবে।
হাদীসের সতর্কবাণী
আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ বলেছেন, যার দুই স্ত্রী থাকে এবং সে তাদের মধ্যে ইনসাফ করে না, সে কিয়ামতের দিন এক পাশ ঝুঁকে (বা অবশ হয়ে) আসবে। (জামে তিরমিযী, হাদীস ১১৪১)। এই হাদীসের সনদ নিয়ে মতভেদ আছে: মুহাদ্দিসদের কেউ একে সহীহ, কেউ দুর্বল বলেছেন।
আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ স্ত্রীদের মধ্যে সমানভাবে পালা বণ্টন করতেন এবং দোয়া করতেন, “হে আল্লাহ, আমার সাধ্যের মধ্যে এই আমার বণ্টন। যা আপনার হাতে আছে, আমার হাতে নেই (অন্তরের ঝোঁক), সে বিষয়ে আমাকে দোষারোপ করবেন না।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২১৩৪)। আবু দাউদ নিজে ব্যাখ্যা করেছেন, “যা আপনার হাতে আছে” বলতে অন্তর বোঝানো হয়েছে। ফতোয়ার উদ্ধৃতি হিসেবে এই বর্ণনা এসেছে, তাই এর মান সহ লেখা হলো।
দেওবন্দের ফতোয়া: বিধবাকে বিয়ে
ফতোয়া নম্বর ৪০৮/৩১৫/বি=১৪৩১-এ এক ব্যক্তি জানতে চেয়েছিলেন, তিনি এক বিধবাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন এবং বলেছেন তিনি প্রথম স্ত্রীর মতো অধিকার দিতে পারবেন না; বিধবাও তাতে রাজি। এমন শর্তে বিয়ে জায়েজ কি না? উত্তরে সরাসরি হ্যাঁ বা না বলা হয়নি, তবে এমন শর্তে বিয়ে না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফতোয়ায় সতর্ক করা হয়েছে, ইনসাফ রক্ষা না করলে আখিরাতে ক্ষতি হতে পারে, আর বিধবার ওপর যে অবিচার হতে পারে, তা ভেবে দেখতে বলা হয়েছে। সূরা নিসার ৪:৩ আয়াত বিবেচনায় নিতে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ বিধবাকে বিয়ে করা সওয়াবের কাজ হতে পারে, কিন্তু তাকে প্রথম স্ত্রীর চেয়ে কম হক দেওয়ার শর্তে নয়।
সীকার্স গাইডেন্সের ফতোয়া
শায়খ আবদুর রহীম রিসাত (সীকার্স গাইডেন্স) লিখেছেন, একজন মুসলিম পুরুষের জন্য চারজন পর্যন্ত স্ত্রী রাখা সাধারণভাবে জায়েজ, তবে এর বাস্তবতা সময় ও স্থানের ওপর নির্ভর করে। সম্পূর্ণ ইনসাফ করতে পারবেন বলে নিশ্চিত হলে তিনি আবার বিয়ে করতে পারেন। ইনসাফ করতে না পারার বাস্তব আশঙ্কা থাকলে বিয়ে করা উচিত নয়, এমনকি রদ্দুল মুহতারের উদ্ধৃতিতে তা হারামও হতে পারে। প্রথম স্ত্রীর মানসিক কষ্ট তাঁর ঈমান ও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফতোয়ায় ফাতহুল বারীর বরাতে আলী (রাঃ) জুওয়াইরিয়া বিনতে আবু জাহলকে বিয়ে করতে চাইলে ফাতিমা (রাঃ)-এর জন্য নবীজির ﷺ উদ্বেগের কথা এসেছে। সন্তানরাও মায়ের কষ্ট দেখে কষ্ট পেতে পারে।
প্রথম স্ত্রীর অনুমতি
বার্মিংহামের ফতোয়া অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার শর্ত নয়, তবে আগে তার সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত, যাতে সে কষ্ট না পায়। ফতোয়াটি এ-ও বলেছে, বর্তমান যুগে একজন স্ত্রীই উত্তম। বিয়ের আগে কাঙ্ক্ষিত নারীর সঙ্গে সব অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বন্ধ করা জরুরি, কারণ নামাহরামের সঙ্গে সম্পর্ক হারাম।
সারকথা
- ইনসাফ রক্ষা করতে পারবেন বলে নিশ্চিত না হলে দ্বিতীয় বিয়ে করবেন না।
- খরচ, রাত ও আচরণে সমতা আবশ্যক; ভালোবাসায় সমতা আবশ্যক নয়, কিন্তু কাউকে ঝুলিয়ে রাখা যাবে না।
- প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শর্ত নয়, কিন্তু তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
- বিধবাকে বিয়ে করলেও তার হক কম দেওয়ার শর্ত করা ঠিক নয়।
আল্লাহ আমাদের পরিবারগুলোকে ইনসাফ ও দয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।
