সাহরি: সুন্নত, বরকত ও জরুরি মাসআলা
রমযানের রোযা শুরু হয় সুবহে সাদিকের সময় থেকে। সেই রোযার জন্য প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হলো সাহরি। অনেকে ভাবেন, সাহরি শুধু ক্ষুধা না লাগার জন্য খাওয়া। কিন্তু হাদীসে একে বরকতপূর্ণ বলা হয়েছে, আর আলেমরা একে সুন্নত বলেছেন। এই লেখায় সাহরির পরিচয়, ফযীলত এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।
সাহরি কাকে বলে
রোযা রাখার নিয়তে সুবহে সাদিকের আগে ভোররাতে যে খাবার খাওয়া হয়, তাকেই সাহরি বলে। কুরআনে বলা হয়েছে:
“আর পানাহার কর যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত।” (সূরা বাকারা, ২:১৮৭)
সাহরির বিধান কীভাবে এল
আলেমদের বর্ণনা অনুযায়ী, পূর্ববর্তী নবীদের যুগে এবং ইসলামের শুরুর দিকে সাহরির বিধান ছিল না। পরে কায়েস ইবনে সিরমা (রা.)-এর ঘটনার প্রেক্ষিতে সূরা বাকারার একটি আয়াতে সাহরির বিধান নাযিল হয়। এতে আল্লাহ তাআলা রোযাদারদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। আগের উম্মতের সঙ্গে আমাদের রোযার এটি একটি বড় পার্থক্য।
সাহরির ফযীলত
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমরা সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত আছে। (সহীহ বুখারী, ১৯২৩)
আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, আমাদের রোযা এবং আহলে কিতাবদের রোযার মধ্যে পার্থক্য হলো সাহরি খাওয়া। (সহীহ মুসলিম, ১০৯৬)
এই দুই হাদীস থেকে বোঝা যায়, সাহরি আমাদের রোযার একটি বিশেষ পরিচয়। আলেমরা সাহরির কয়েকটি উপকারের কথা বলেছেন:
- নবীজি ﷺ-এর সুন্নত অনুসরণ করা যায়।
- ইসলামের স্বতন্ত্র পরিচয় ধরে রাখা যায়।
- ইবাদতের শক্তি পাওয়া যায়।
- ক্ষুধার কারণে যে চাহিদা বা অস্থিরতা তৈরি হয়, তা কমে।
- তাকওয়া অর্জনে সাহায্য হয়।
- শরীর ও মনের সতেজতা বজায় থাকে।
ভোররাতে জাগার সুফল
ভোররাত আল্লাহর রহমত ও দোয়া কবুলের সময়। কুরআনে মুমিনদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, তারা রাতের শেষ প্রহরে ক্ষমা প্রার্থনা করে। সাহরির জন্য উঠলে সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায়। অন্তত দুই রাকাত তাহাজ্জুদ পড়া, কিছুক্ষণ দোয়া ও ইসতিগফার করার অভ্যাস হয়ে যায়।
জরুরি মাসআলা
আলেমদের বর্ণনা অনুযায়ী:
- সাহরি খাওয়া সুন্নত। ইচ্ছাকৃতভাবে না খেলে সুন্নত ছুটে যায়।
- সাহরির সময় অর্ধরাতের পর থেকে শুরু হয়। কেউ কেউ রাতের শেষ তৃতীয়াংশকে সাহরির সময় বলেছেন। তবে সুবহে সাদিক হয়েছে কি না, এমন সন্দেহের সময় পর্যন্ত দেরি না করাই উচিত।
- সুন্নত আদায়ের জন্য অল্প কিছু খাবার বা পানীয়ও যথেষ্ট। এমনকি এক ঢোঁক পানি হলেও সাহরির সুন্নত আদায় হয়।
- সাহরি খেতে না পারলেও রমযানের ফরয রোযা রাখতে হবে।
নাপাক অবস্থায় সাহরির মাসআলা
কারও যদি ফরয গোসলের প্রয়োজন হয় এবং গোসলের মতো সময় হাতে না থাকে, তাহলে করণীয় হলো:
- ওযু করে অথবা হাত-মুখ ধুয়ে সাহরি খেয়ে নেবেন।
- তারপর গোসল করে ফজরের নামায পড়বেন।
- সাহরি খাওয়ার জন্য পবিত্র হওয়া শর্ত নয়, কারণ সাহরি সুন্নত। তবে নামাযের জন্য পবিত্রতা ফরয।
- নাপাক হলে যত দ্রুত সম্ভব গোসল করে নেওয়া উচিত। কোনো ওজর ছাড়া রমযানে দীর্ঘ সময় নাপাক অবস্থায় থাকা মাকরূহ।
সাহরিতে কী খাবেন
সাহরির আসল উদ্দেশ্য ইবাদতের শক্তি অর্জন। তাই:
- স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- ওষুধ বা খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপারে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলুন।
- এত বেশি খাবেন না, যাতে রোযার উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যায়। রমযান যেন ভোজের মাস হয়ে না যায়।
- সাহরিকে এমন কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা প্রথায় পরিণত করবেন না, যাতে ইবাদতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় বা শরীয়তের বিধান লঙ্ঘিত হয়।
প্রতিবেশী ও অভাবীর পাশে দাঁড়ানো
নিজে সাহরি খাওয়ার পাশাপাশি প্রতিবেশী, আত্মীয় ও অভাবী মানুষের সাহরির ব্যবস্থায় সাহায্য করা উচিত। তিরমিযীর একটি হাদীসে এসেছে, যে ব্যক্তি পেট ভরে খায় আর তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে, সে প্রকৃত মুমিন নয়।
পরিবারের জন্য কয়েকটি পরামর্শ
- সাহরির সময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসুন। এতে ঘরে রমযানের পরিবেশ তৈরি হয়।
- সন্তানদের সাহরিতে উঠতে উৎসাহ দিন। জোর না করে আনন্দের সঙ্গে ডাকুন।
- ঘুম থেকে উঠে প্রথমে নিয়ত করুন, আল্লাহর জন্য রোযা রাখছি। এতে সাহরি খাওয়াও ইবাদতে পরিণত হয়।
- সাহরির পর ফজর পর্যন্ত জেগে থেকে কুরআন তিলাওয়াত বা যিকিরে সময় দিন।
- আগের রাতে সাহরির খাবারের কিছু প্রস্তুতি রাখুন, যাতে ঘরের একজনের ওপর সব চাপ না পড়ে।
শেষ কথা
সাহরি ছোট একটি সুন্নত, কিন্তু এতে বরকত আছে। এক ঢোঁক পানি দিয়েও এর সওয়াব পাওয়া যায়। যে সাহরি খেয়ে রোযা রাখে, সে নবীজি ﷺ-এর সুন্নত পালন করে এবং ইবাদতের শক্তি পায়।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহরি ও রোযার যথাযথ আদায়ের তাওফীক দিন। আমীন।
