রান্নাঘর গোছানোর সহজ কিছু কৌশল

রান্নাঘরকে বলা হয় ঘরের প্রাণ। সকালের চায়ের গন্ধ, দুপুরের ভাতের ঘ্রাণ, সন্ধ্যার নাশতার ব্যস্ততা, সবই এখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে। অথচ এই জায়গাটাই অনেক সময় সবচেয়ে এলোমেলো থাকে। মসলার কৌটা খুঁজতে খুঁজতে ভাত ধরে যায়, খুন্তি আছে অথচ হাতের কাছে নেই, তাকের কোণে পুরনো কৌটার ভিড়। গুছিয়ে রাখলে রান্নাও সহজ হয়, মনও ভালো থাকে।

পরিচ্ছন্নতার প্রতি ইসলামের গুরুত্ব তো আমরা জানিই। নবীজি ﷺ বলেছেন, পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক (মুসলিম, হাদীস ২২৩)। যে জায়গায় সবার জন্য খাবার তৈরি হয়, সেটা পরিচ্ছন্ন রাখা তাই আমাদের দ্বীনি অভ্যাসেরই অংশ।

কাজ ধরে ধরে ভাগ করুন

রান্নাঘরকে মনে মনে কয়েকটি অংশে ভাগ করে নিন। চুলার আশপাশে থাকবে তেল, লবণ, মসলা, খুন্তি আর হাতা। যেখানে কাটাকুটি হয়, সেখানে ছুরি, বঁটি আর কাটার তক্তা। পানির কলের কাছে থালাবাসন ধোয়ার জিনিস। আর খাবার সাজানোর জায়গায় প্লেট ও গ্লাস।

যে জিনিস যেখানে লাগে, সেখানেই রাখলে হাঁটাহাঁটি কমে যায়। রান্নার সময় একবার এদিক, একবার ওদিক ছোটাছুটি করতে হয় না। এই ছোট হিসাবটাই রান্নাঘরের কাজ অর্ধেক সহজ করে দেয়।

মসলা ও কৌটা সাজানো

যে মসলা সবচেয়ে বেশি লাগে, তা হাতের নাগালে রাখুন। হলুদ, মরিচ, জিরা, ধনিয়া, লবণ, এই কয়টি চুলার পাশেই থাকা ভালো। কম লাগে এমন মসলা উপরের তাকে তুলে দিন। প্রতিটি কৌটার গায়ে নাম লিখে রাখলে রান্নার তাড়ার মধ্যে ভুল হয় না।

একই আকারের কৌটা ব্যবহার করলে তাক গোছানো দেখায়। কৌটা ভরার আগে ভালো করে শুকিয়ে নিন, নইলে মসলায় সোঁদা গন্ধ হয়ে যায়। প্রতি মাসে একবার দেখে নিন, কোনটা শেষ হয়ে আসছে, কোনটার মেয়াদ পেরিয়ে গেছে।

পুরনো আর অকাজের জিনিস সরান

রান্নাঘরের ড্রয়ারে প্রায়ই এমন অনেক জিনিস জমে যায়, যা বছরের পর বছর কাজে লাগে না। ভাঙা ঢাকনা, ঢাকনাহীন কৌটা, ফাটা প্লেট, মরিচা ধরা চামচ। এগুলো শুধু জায়গা দখল করে। মাসে একবার একটি ড্রয়ার বেছে নিয়ে অকাজের জিনিস বাদ দিন। যা ঠিক আছে কিন্তু কাজে লাগে না, তা কাউকে দান করে দিন।

প্রতিদিনের ছোট নিয়ম

রান্নাঘর গুছিয়ে রাখতে দরকার প্রতিদিনের কয়েকটি ছোট অভ্যাস। রান্না শেষে চুলা মুছে ফেলুন। তেলের দাগ শুকিয়ে গেলে তুলতে অনেক কষ্ট হয়, কিন্তু গরম থাকতে মুছলে এক টানেই পরিষ্কার হয়ে যায়। রাতের খাবারের পর থালাবাসন ধুয়ে সাজিয়ে রাখুন। সিঙ্কে যেন পানি জমে না থাকে। ময়লার ঝুড়ি রোজ খালি করুন, না হলে মাছি আর পোকামাকড় বাসা বাঁধে।

প্রতি সপ্তাহে একবার ফ্রিজ খুলে দেখুন। বাসি খাবার ফেলে দিন, পুরনো সবজি বের করুন, তাকগুলো মুছে নিন। খাবার নষ্ট করতে কেউ চায় না, তাই কেনার সময়ই হিসাব করে কিনুন, যাতে ফেলতে কম হয়। নবীজি ﷺ আমাদের অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। কোরআনে আছে, তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না (সূরা আরাফ, ৭:৩১)।

খাবার ঢেকে রাখার আদব

নবীজি ﷺ বলেছেন, তোমরা পাত্রগুলো ঢেকে রাখো এবং মশকের মুখ বেঁধে রাখো (বুখারী, হাদীস ৩২৮০)। খাবারের পাত্র ঢেকে রাখলে ধুলো, পোকামাকড় ও জীবাণু থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তাই ঢাকনাওয়ালা কৌটা আর পাত্র কিনে রাখা দরকার। সুন্দর করে সাজানো, ঢাকা দেওয়া খাবার ঘরের আবহাওয়াও ভালো রাখে।

সবাই মিলে রান্নাঘরের যত্ন নিন

রান্নাঘর শুধু মায়ের বা স্ত্রীর কাজ, এই ধারণা বদলাতে হবে। বাবা চা বানিয়ে ছোটদের জন্য নাশতা সাজিয়ে দিতে পারেন। ছেলেমেয়েরা খাওয়ার পর নিজেদের প্লেট সিঙ্কে নিয়ে রাখতে পারে। বড় মেয়ে মাকে সবজি কাটতে সাহায্য করতে পারে। নবীজি ﷺ ঘরের কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন। আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, নবীজি ﷺ ঘরের কাজে পরিবারের লোকদের সহযোগিতা করতেন, আর নামাযের সময় হলে নামাযে চলে যেতেন (বুখারী, হাদীস ৬৭৬)।

ছোট রান্নাঘরেও জায়গা বের করা যায়

সব ঘরে বড় রান্নাঘর থাকে না। তবে ছোট জায়গাও বুদ্ধি করে সাজালে বড় মনে হয়। দেয়ালে পেরেক লাগিয়ে হাতা, খুন্তি ও ছাঁকনি ঝুলিয়ে রাখা যায়। দরজার ভেতরের দিকে ছোট তাক লাগিয়ে মসলার কৌটা রাখা যায়। একটার ওপর একটা বসানো যায় এমন পাত্র কিনলে ক্যাবিনেটে জায়গা বাঁচে। যে জিনিস রোজ লাগে না, যেমন বড় ডেকচি বা পিঠার সরঞ্জাম, সেগুলো আলাদা করে ওপরের তাকে তুলে রাখুন। এতে নিচের তাক হালকা থাকে আর প্রতিদিনের কাজে সুবিধা হয়।

রান্নাঘরকে সুন্দর করার ছোঁয়া

গোছানো রান্নাঘরে একটু সবুজের ছোঁয়া দিলে আরও ভালো লাগে। জানালার পাশে ছোট একটা টবে পুদিনা বা ধনেপাতা লাগাতে পারেন। রান্নার সময় তাজা পাতা হাতের কাছে পেলে খাবারের স্বাদও বাড়ে। দেয়ালে হালকা রং আর পরিষ্কার আলো রান্নাঘরকে প্রশস্ত দেখায়।

শেষ কথা

রান্নাঘর গোছাতে বড় খরচ বা বেশি সময় লাগে না। শুধু দরকার একটু পরিকল্পনা আর নিয়মিত যত্ন। আজই একটা ড্রয়ার বা একটা তাক বেছে নিন, সেটাকে গুছিয়ে ফেলুন। দেখবেন, কাল সকালে চা বানাতে গিয়ে মনটা অনেক হালকা লাগছে।

আল্লাহ আমাদের রান্নাঘরে বরকত দিন, আর আমাদের হালাল ও পবিত্র রিযিক ভোগ করার তাওফীক দিন। আমীন।

Author

  • আমির হামজাহ

    আমির হামজাহ জামিয়াতু ইবরাহীম, মাহমুদনগর, সাইনবোর্ড, ঢাকার একজন শিক্ষক, লেখক ও অভিজ্ঞ মুফতি। তিনি প্রায় ৭ বছর ধরে ইসলামী বিষয় নিয়ে লেখালেখি ও ব্লগিং করছেন। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিবার, বিবাহ, দাম্পত্য জীবন ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। তিনি ইসলামিক কার্যক্রম ও দাওয়াহর সঙ্গে যুক্ত এবং পরিবার BD (PoribarBD.com)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক।

মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * চিহ্নিত।