ঘর পরিপাটি রাখার সহজ কিছু অভ্যাস

সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি বিছানা এলোমেলো, টেবিলে কালকের চায়ের কাপ পড়ে আছে, আর মেঝেতে ছড়িয়ে আছে বাচ্চাদের খেলনা, তাহলে দিনটা কেমন যেন ভারী হয়ে শুরু হয়। অথচ একটু গোছানো ঘরে ঢুকলে মনটা আপনিই হালকা হয়ে যায়। ঘর পরিপাটি থাকা তাই শুধু সাজসজ্জার বিষয় নয়, মনের শান্তিরও বিষয়।

আমাদের দীনও পরিচ্ছন্নতাকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। হাদীসে এসেছে, পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। কাজেই ঘর গোছানো আর পরিষ্কার রাখাকে আমরা শুধু গৃহিণীর কাজ বা বাড়তি ঝামেলা না ভেবে একটা সুন্দর অভ্যাস হিসেবে নিতে পারি।

বড় কাজ নয়, ছোট অভ্যাসই আসল

অনেকে ভাবেন, ঘর গোছাতে হলে একদিন পুরো ছুটি নিয়ে বসতে হবে। বাস্তবে তা নয়। যে ঘর রোজ পাঁচ-দশ মিনিটের যত্ন পায়, সে ঘর কখনো পাহাড়সমান জঞ্জালে ভরে ওঠে না। তাই বড় অভিযানের চেয়ে ছোট ছোট নিয়ম বানিয়ে নেওয়াই ভালো।

সকালে উঠে প্রথম কাজ হোক বিছানা গুছিয়ে রাখা। চাদর টেনে, বালিশ সাজিয়ে রাখলে ঘরের চেহারাটাই বদলে যায়। এই একটা কাজ করলেই মনে হয় দিনের প্রথম ছোট জয়টা হয়ে গেল।

যে জিনিসের যেখানে জায়গা, সেখানেই রাখুন

ঘর এলোমেলো হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো জিনিসের নির্দিষ্ট জায়গা না থাকা। চাবি, চশমা, মোবাইলের চার্জার, ছাতা, এসব জিনিস যদি রোজ আলাদা আলাদা জায়গায় পড়ে থাকে, তবে খুঁজতে খুঁজতেই সময় চলে যায়।

দরজার পাশে একটা ছোট তাক বা ঝুড়ি রাখুন, সেখানে চাবি আর বাইরের ছোটখাটো জিনিস থাকবে। বাচ্চাদের খেলনার জন্য একটা বড় বাক্স রাখুন। রাতে ঘুমানোর আগে সবাই মিলে খেলনা বাক্সে তুলে দিলে বাচ্চারাও গোছানোর অভ্যাস শিখে যায়। জায়গা ঠিক করে দিলে গোছানো কাজটা অর্ধেক সহজ হয়ে যায়।

অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলুন

আমাদের ঘরে এমন অনেক জিনিস জমে থাকে যা বছরের পর বছর কেউ ব্যবহার করে না। ভাঙা প্লাস্টিকের বাক্স, পুরনো কাগজ, ছোট হয়ে যাওয়া জামা, অকেজো খেলনা। এসব জিনিস জায়গা দখল করে, ধুলো জমায়, আর ঘরকে ঠাসাঠাসি দেখায়।

প্রতি মাসে একবার একটা তাক বা একটা ড্রয়ার বেছে নিন। যা কাজে লাগে না, তা ফেলে দিন। যা ভালো আছে কিন্তু আপনার দরকার নেই, তা কাউকে দান করে দিন। পুরনো জামাকাপড় অভাবী কোনো পরিবারের কাজে লাগতে পারে। এতে ঘর হালকা হয়, আবার একটা ভালো কাজও হয়ে যায়।

প্রতিদিন রাতের দশ মিনিট

দিনের শেষে ঘুমানোর আগে দশ মিনিট সময় আলাদা করে রাখুন। ঘড়ি ধরে এই দশ মিনিটে ড্রয়িংরুম আর খাবার টেবিলটা একবার চোখ বুলিয়ে নিন। ছড়ানো কাপ-প্লেট রান্নাঘরে নিয়ে যান, কুশন জায়গামতো রাখুন, মেঝে থেকে খেলনা আর জুতা তুলে নিন। দেখবেন, সকালে উঠে ঝকঝকে ঘরটা দেখে মনটাই ভালো হয়ে যায়। অনেক মা বলেন, এই দশ মিনিটের অভ্যাসটা তাদের সপ্তাহান্তের বড় পরিষ্কারের চাপ অর্ধেক কমিয়ে দিয়েছে।

রান্নাঘর আর গোসলখানার দিকে বাড়তি নজর

পুরো বাড়ির মধ্যে রান্নাঘর আর গোসলখানা সবচেয়ে বেশি পরিচ্ছন্নতা চায়। রাতের খাবারের পর থালাবাসন ফেলে রেখে ঘুমাতে গেলে সকালে সেগুলো আরও কঠিন কাজ হয়ে দাঁড়ায়। চেষ্টা করুন খাওয়ার পরপরই বাসন ধুয়ে রাখতে। চুলার আশপাশ প্রতিদিন একবার মুছে নিলে তেলের দাগ জমতে পারে না।

গোসলখানায় ভেজা মেঝে ঠিকমতো শুকাতে দিন, আর সপ্তাহে অন্তত একবার ভালো করে ঘষে পরিষ্কার করুন। এতে দুর্গন্ধ হয় না, আর রোগজীবাণুও কম থাকে।

আলমারি আর তাকের গোছানো

জামাকাপড়ের আলমারি এলোমেলো থাকলে সকালে তাড়াহুড়োর সময় সবচেয়ে বেশি বিরক্তি লাগে। কাপড় ভাঁজ করে সোজা করে দাঁড় করিয়ে রাখলে এক নজরেই সব দেখা যায়, আর খুঁজতে গিয়ে বাকিগুলো এলোমেলো হয় না। ঋতু বদলের সময় শীতের কাপড় আর গরমের কাপড় আলাদা করে তুলে রাখুন। বইয়ের তাকেও একই নিয়ম, যে বই রোজ পড়েন তা হাতের কাছে, বাকিগুলো উপরের তাকে।

পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিন

ঘর গোছানোর সব দায়িত্ব একজনের কাঁধে চাপিয়ে দিলে সেই মানুষটা ক্লান্ত হয়ে পড়েন, আর ঘরের প্রতি ভালোবাসাও কমে যায়। আমাদের প্রিয় নবী ﷺ নিজের ঘরের কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন, নিজের জামা নিজেই সেলাই করতেন। সেই সুন্নত মনে রেখে বাবা, ভাই, ছেলেমেয়ে সবাই কিছু কিছু কাজ ভাগ করে নিতে পারেন।

কেউ বিছানা গোছাবে, কেউ জুতা সাজিয়ে রাখবে, কেউ খাওয়ার পর টেবিল মুছবে। ছোটদের হাতে ছোট দায়িত্ব দিন। তারা মজা করেই করবে, আর বড় হয়ে এই অভ্যাস তাদের সঙ্গে থেকে যাবে।

গোছানো ঘর, গোছানো মন

ঘর খুব দামি আসবাবে সাজানো হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। ছোট একটা ঘরও যদি পরিষ্কার, আলো-বাতাসে ভরা আর সাজানো-গোছানো থাকে, সেখানে বসে থাকতেই ভালো লাগে। মেহমান এলে আপনাকে আলাদা করে লজ্জিত হতে হয় না। নামাযের জায়গাটা পরিচ্ছন্ন থাকলে ইবাদতেও মন বসে বেশি।

আজ থেকেই শুরু করতে পারেন। আজ শুধু বিছানাটা গুছিয়ে রাখুন, আর রাতে ঘুমানোর আগে ঘরের মেঝে থেকে ছড়ানো জিনিসগুলো তুলে নিন। কাল আরেকটু। এভাবে ধীরে ধীরে দেখবেন, ঘর আর আপনার মনের ভার দুটোই হালকা হয়ে গেছে।

আল্লাহ আমাদের সবার ঘরে শান্তি, বরকত আর পরিচ্ছন্নতা দান করুন। আমীন।

Author

  • আমির হামজাহ

    আমির হামজাহ জামিয়াতু ইবরাহীম, মাহমুদনগর, সাইনবোর্ড, ঢাকার একজন শিক্ষক, লেখক ও অভিজ্ঞ মুফতি। তিনি প্রায় ৭ বছর ধরে ইসলামী বিষয় নিয়ে লেখালেখি ও ব্লগিং করছেন। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে পরিবার, বিবাহ, দাম্পত্য জীবন ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন। তিনি ইসলামিক কার্যক্রম ও দাওয়াহর সঙ্গে যুক্ত এবং পরিবার BD (PoribarBD.com)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও লেখক।

মতামত দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। আবশ্যক ঘরগুলো * চিহ্নিত।