আমীর হামযাহ
শুরুতে কিছু কথা: এক কঠিন কিন্তু পবিত্র সফর
সন্তান লালনপালন করা কেবল একটি দায়িত্ব নয়, এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক বড় পরীক্ষা ও নেয়ামত। তবে এই সফরের সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো ঘুমের অভাব। দীর্ঘ সময় না ঘুমিয়ে থাকা একজন মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে ইসলাম ও বিজ্ঞান—উভয় দিক থেকেই কিছু কৌশলী রুটিন মেনে চললে এই কষ্ট কিছুটা লাঘব করা সম্ভব।
১. ঘুমের ঘাটতি ও আমাদের বাস্তবতা
সন্তান ছোট থাকাকালীন আট ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম পাওয়া প্রায় অসম্ভব। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ (Prefrontal Cortex) এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে আমরা দ্রুত রেগে যাই বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি। ইসলাম এই কষ্টকে স্বীকার করে। তাই রাসূল (সা.) মায়ের পায়ের নিচে জান্নাতের ঘোষণা দিয়েছেন, কারণ এই ত্যাগের কোনো তুলনা নেই।
২. রুটিন সাজানোর বাস্তবসম্মত কৌশল
- ভোরের বিশ্রাম: হাদিসে এসেছে, রাসূল (সা.) ভোরবেলার বরকতের জন্য দোয়া করেছেন (আবু দাউদ: ২৬০৬)। তবে বাস্তবতা হলো, নতুন মায়েদের জন্য ফজর পড়ে জেগে থাকা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই ফজরের সালাত আদায়ের পর যদি শিশু ঘুমিয়ে থাকে, তবে নিজের ঘুমের ঘাটতি মেটাতে পুনরায় ১-২ ঘণ্টা ঘুমিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
- কাইলুলা বা দুপুরের ছোট ঘুম: সুন্নত অনুযায়ী দুপুরের দিকে সামান্য সময় বিশ্রাম নেওয়া (কাইলুলা) ক্লান্তি দূর করতে জাদুর মতো কাজ করে। বিজ্ঞান একে ‘পাওয়ার ন্যাপ’ বলে। মাত্র ২০ মিনিটের বিশ্রাম আপনার কর্মক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
- অগ্রাধিকারের তালিকা : সব কাজ আপনাকে একাই নিখুঁতভাবে করতে হবে না। ঘরের পরিচ্ছন্নতার চেয়ে আপনার মানসিক সুস্থতা বেশি জরুরি। প্রতিদিনের কাজের একটি ছোট তালিকা করুন এবং অপ্রয়োজনীয় কাজগুলো বাদ দিন।
৩. পুরুষ ও নারীর যৌথ ভূমিকা: একটি জরুরি বাস্তবতা
আমাদের সমাজে অনেক সময় সন্তান লালনপালনের পুরো দায়ভার মায়ের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, যা ইসলাম সমর্থন করে না। রাসূল (সা.) নিজের ঘরের কাজে স্ত্রীদের সাহায্য করতেন (বুখারী: ৬৭৬)।
- স্বামীদের দায়িত্ব: রাতে অন্তত কয়েক ঘণ্টার জন্য বাবারা বাচ্চার দায়িত্ব নিতে পারেন, যাতে মা কিছুটা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম পান।
- বাস্তবতা: যদি স্বামী বাইরে কর্মব্যস্ত থাকেন, তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের (নানি, দাদি বা সাহায্যকারী) সহায়তা নিতে কোনো দ্বিধা করবেন না। নিজেকে ‘সুপার ওম্যান’ প্রমাণ করার চেয়ে সুস্থ থাকা বেশি জরুরি।
৪. ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও ঘুমের মান
আমরা ক্লান্তি দূর করতে অনেক সময় ফোন হাতে নিই। কিন্তু স্ক্রিনের নীল আলো ‘মেলাটোনিন’ (Melatonin) হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়, যা ঘুমের জন্য দায়ী।
- পরামর্শ: ঘুমানোর অন্তত ৩০ মিনিট আগে ফোন দূরে রাখুন। এর বদলে তাসবিহে ফাতেমি (৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার) পাঠ করুন। এটি শরীর ও মনকে শান্ত করে দ্রুত গভীর ঘুমে সাহায্য করবে।
৫. খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টির গাইডলাইন
অতিরিক্ত চা বা কফি তাৎক্ষণিক শক্তি দিলেও তা স্নায়ুকে আরও উত্তেজিত করে তোলে।
- করণীয়: প্রচুর পানি পান করুন। ওমেগা-৩ যুক্ত খাবার (যেমন- বাদাম, মাছ) এবং ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার (যেমন- কলা, শাকসবজি) মস্তিষ্কের ক্লান্তি দূর করতে বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রমাণিত।
এক নজরে আপনার দৈনন্দিন রুটিন
| সময় | কাজ ও কৌশল |
| ফজর পরবর্তী | সালাত শেষে শিশু ঘুমালে নিজের বিশ্রামের জন্য অন্তত ১ ঘণ্টা সময় নিন। |
| সকাল ১০:০০ | ভারী কাজের বদলে শরীর সচল রাখতে হালকা স্ট্রেচিং বা পুষ্টিকর নাস্তা। |
| দুপুর ২:০০ | যোহরের পর ১৫-২০ মিনিটের কাইলুলা বা বিশ্রাম। |
| বিকেল ৫:০০ | ফোনের বদলে শিশুর সাথে খোলা বাতাসে ১০ মিনিট হাঁটা (মানসিক প্রশান্তির জন্য)। |
| রাত ১০:০০ | দ্রুত ঘুমের প্রস্তুতি। সঙ্গী বা পরিবারের সাথে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া। |
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর
১. প্রশ্ন: ঘুমের অভাবে আমি কি ইবাদতে অবহেলা করছি?
উত্তর: না। সন্তানের যত্ন নেওয়া নিজেই একটি বড় ইবাদত। ফরয সালাতগুলো সময়মতো আদায়ের চেষ্টা করুন। শারীরিক অক্ষমতা বা অতিরিক্ত ক্লান্তিতে নফল ইবাদত না করতে পারলে কোনো গুনাহ নেই।
২. প্রশ্ন: মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না, কী করব?
উত্তর: এটি ক্লান্তির লক্ষণ। রাগ উঠলে ‘আউযুবিল্লাহ’ পড়ুন এবং সাথে সাথে পানি পান করুন। এটি একটি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও বটে, যা দ্রুত শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে স্নায়ুকে শান্ত করে।
৩. প্রশ্ন: কাইলুলা করার সেরা সময় কোনটি?
উত্তর: যোহরের সালাতের আগে বা পরে সামান্য সময়ের জন্য। এটি আপনার মেজাজ উন্নত করতে এবং মেমোরি শার্প করতে বিজ্ঞানসম্মতভাবে স্বীকৃত।
পরিশেষে:
সন্তান লালনপালনের এই কঠিন সময়টি সারা জীবন থাকবে না। আপনার এই প্রতিটি নির্ঘুম রাত আল্লাহর কাছে অত্যন্ত দামী। নিজেকে সময় দিন, নিজের শরীরের যত্ন নিন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
