আমীর হামযাহ
সন্তানের জেদ সামলানো অনেক সময় পাহাড় ডিঙানোর মতো কঠিন মনে হয়। বিশেষ করে পড়ার টেবিল দেখলেই বাচ্চার মেজাজ বিগড়ে যাওয়া এখনকার সাধারণ সমস্যা। আসলে লেখা পড়ায় অমনোযোগী সন্তাদের মনোযোগী করার পদ্ধতি ও কলাকৌশল সঠিকভাবে জানা থাকলে এই জেদ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। ইসলাম, বিজ্ঞান ও বাস্তবতার নিরিখে চলুন জেনে নিই এর সমাধান।
১. জেদ কেন হয়? (মনস্তত্ত্ব ও বিজ্ঞান)
শিশুদের মস্তিষ্কের সামনের অংশ (Prefrontal Cortex), যা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, তা পুরোপুরি বিকশিত হতে সময় নেয়। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব হলে মস্তিষ্কের এই অংশটি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে শিশু খিটখিটে হয়ে যায়। এছাড়া অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার বা জাঙ্ক ফুড শিশুদের চঞ্চলতা (Hyperactivity) বাড়িয়ে দেয়।
২. ইসলামী আদর্শ ও মা-বাবার ভূমিকা
ইসলাম আমাদের ধৈর্য ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের সন্তানদের স্নেহ করো এবং তাদের সাথে উত্তম আচরণ করো” (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ৪২২৭)। সন্তান ভুল করলে তাৎক্ষণিক রাগ না করে শান্ত থাকা সুন্নাহ। মা-বাবার পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্ত মেজাজ শিশুকে ধৈর্যশীল হতে শেখায়।
৩. ভিন্ন ভিন্ন পারিবারিক বাস্তবতায় সমাধান
সন্তান লালন-পালন সবার জন্য এক নয়। ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে কৌশলও ভিন্ন হতে পারে:
- একক মা/বাবা (Single Parents): আপনার একার পক্ষে সব সামলানো কঠিন। তাই বাচ্চার সাথে প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট নিরবচ্ছিন্ন গল্প করার চেষ্টা করুন। এতে তার মানসিক শূন্যতা দূর হবে।
- কর্মজীবী দম্পতি: আপনারা বাসায় ফেরার পর ফোন দূরে রেখে বাচ্চাকে সময় দিন। কোয়ালিটি টাইম পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়।
- যৌথ পরিবার: দাদা-দাদি বা নানা-নানির সাথে আলোচনা করে বাচ্চার শাসনের একটি সাধারণ নিয়ম ঠিক করুন, যাতে শাসনের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি না হয়।
৪. পড়ার টেবিলে মনোযোগ ফেরানোর উপায়
পড়াশোনার প্রতি ভীতি দূর করতে লেখা পড়ায় অমনোযোগী সন্তাদের মনোযোগী করার পদ্ধতি ও কলাকৌশল হিসেবে নিচের সংক্ষিপ্ত চার্টটি ফলো করুন:
| কৌশল | প্রয়োগ পদ্ধতি | লক্ষ্য |
| পোমোডোরো | ২৫ মিনিট পড়া, ৫ মিনিট খেলা | ক্লান্তি দূর করা |
| পজিটিভ ফিডব্যাক | ছোট সাফল্যে বাহবা দেওয়া | আত্মবিশ্বাস বাড়ানো |
| ডিজিটাল ডিটক্স | পড়ার সময় সব ডিভাইস বন্ধ | মনোযোগ স্থির রাখা |
৫. লাইফস্টাইল ও আধ্যাত্মিক আমল
১. পর্যাপ্ত ঘুম: নিয়মিত ঘুমের অভাব মেলাটোনিন (Melatonin) হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। রাত জাগার অভ্যাস বাচ্চার জেদ বাড়িয়ে দেয়।
২. হালাল খাবার: শিশুকে হালাল ও পুষ্টিকর খাবার দিন। এটি তার মেধা ও চরিত্রে প্রভাব ফেলে।
৩. দোয়া: বাচ্চার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। পবিত্র কুরআনের এই দোয়াটি নিয়মিত পাঠ করতে পারেন:
“রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিইয়াতিনা কুররতা আ’ইউনিওঁ ওয়াজ’আলনা লিল মুত্তাকীনা ইমামা।” (সূরা ফুরকান: ৭৪)
সাধারণ কিছু প্রশ্ন
- ১. বাচ্চা জেদ করে মাটিতে গড়াগড়ি দিলে বা চিৎকার করলে তাৎক্ষণিক করণীয় কী? মারধর বা পালটা চিৎকার না করে তাকে নিরাপদ দূরত্ব থেকে চোখে চোখে রাখুন । সে যখন বুঝতে পারবে যে চিৎকার করে কাজ হচ্ছে না, তখন সে নিজে থেকেই শান্ত হবে। শান্ত হওয়ার পর তাকে জড়িয়ে ধরুন এবং কেন সে এমন করছিল তা নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করুন।
- ২. পড়াশোনায় অনীহা দূর করতে ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’ বা পুরস্কার দেওয়া কি ঠিক? হ্যাঁ, তবে তা যেন ঘুস বা লোভ না হয়। শিশুকে বলুন—”তুমি এই অধ্যায়টি শেষ করলে আমরা বিকেলে একসাথে ছবি আঁকব।” মনে রাখবেন, বস্তুগত পুরস্কারের (যেমন: খেলনা বা চকলেট) চেয়ে আপনার সাথে কাটানো সময় বা আপনার সামান্য প্রশংসাই শিশুর কাছে বড় পুরস্কার।
- ৩. যৌথ পরিবারে বাচ্চার শাসনের নিয়ম ভিন্ন হলে কী করব? এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে পরিবারের বড়দের (দাদা-দাদি বা নানা-নানি) সাথে একান্তে কথা বলুন। তাদের বোঝান যে, বাচ্চার সামনে শাসনের নিয়ম আলাদা হলে সে দ্বিধায় পড়ে যায় এবং জেদি হয়ে ওঠে। সবার সম্মতিতে একটি সাধারণ নিয়ম বা ডিসিপ্লিন ঠিক করা জরুরি।
- ৪. অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তি কি শিশুর জেদ বাড়িয়ে দেয়? অবশ্যই। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, স্মার্টফোনের নীল আলো ও দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য শিশুদের মস্তিষ্কে ডোপামিন লেভেল বাড়িয়ে দেয়। ফলে তারা বাস্তব জীবনে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে এবং ফোন কেড়ে নিলে প্রচণ্ড জেদ দেখায়। তাই স্ক্রিন টাইম কমিয়ে তাদের বই পড়া বা মাঠে খেলার অভ্যাস করান।
- শিশুর অবাধ্যতা দূর করতে ধর্মীয় কোনো বিশেষ আমল আছে কি? হ্যাঁ, সন্তানের আচরণগত পরিবর্তনের জন্য আধ্যাত্মিক প্রশান্তি ও দোয়া অত্যন্ত কার্যকর। আলেমদের মতে, প্রতি রাতে শিশু যখন ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়, তখন তার মাথায় হাত রেখে দুরুদ শরীফ এবং সূরা ফাতেহা (যা আল-কুরআনের আরোগ্যের সূরা) পাঠ করে ফুঁ দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া সন্তানের নিরাপত্তার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দোয়াটি পড়তেন: أعيذُكُما بِكلماتِ اللَّهِ التَّامَّةِ ، مِن كلِّ شيطانٍ وَهامَّةٍ ومن كلِّ عينٍ لامَّةٍ
“উয়ীযুকুমা বিকালিমাাতিল্লাহিত তা-ম্মাহ, মিন কুল্লি শায়ত্বানিন ওয়াহা-ম্মাহ, ওয়ামিন কুল্লি আইনিন লা-ম্মাহ।” (সহীহ বুখারী: ৩৩৭১)।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মা-বাবার দোয়া। হাদিসে এসেছে, সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া সরাসরি কবুল হয় (সুনানে ইবনে মাজাহ)। তাই ফরজ সালাতের পর সন্তানের হেদায়েত ও নেক চরিত্রের জন্য আল্লাহর কাছে বিনম্রভাবে প্রার্থনা করুন।
উপসংহার সন্তানকে গড়ে তোলা একটি দীর্ঘমেয়াদী সাধনা। লেখা পড়ায় অমনোযোগী সন্তাদের মনোযোগী করার পদ্ধতি ও কলাকৌশল কেবল নিয়ম নয়, এটি মমতা ও ধৈর্যের মেলবন্ধন। ভালোবাসা দিয়ে যা জয় করা সম্ভব, কঠোরতা দিয়ে তা অসম্ভব। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন এবং সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখুন।
