আমীর হামযাহ
একটি শিশুকে সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তোলা কেবল আদেশের বিষয় নয়, বরং এটি একটি শিল্প। জেদি সন্তানকে বশে আনার কার্যকর উপায় হিসেবে নিচে আলোচিত বিষয়গুলো পাথেয় হতে পারে:
১. মানসিক স্থিরতা ও ধৈর্য ধারণ: শিশুর জেদ দমনে মা-বাবাকে প্রথমেই নিজের রাগের ওপর লাগাম টানতে হবে। আগুনের বিপরীতে আগুন যেমন কোনো সমাধান নয়, তেমনি শিশুর রাগের জবাবে চিৎকার করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে। আপনার শান্ত মেজাজ শিশুর উত্তাল মনকে শীতল করার প্রথম ঔষধ।
২. পছন্দের স্বাধীনতা ও ক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ: শিশুর ওপর সারাক্ষণ হুকুম না চালিয়ে তাকে কিছু ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে দিন। “তুমি কি লাল জামা পরবে না নীলটা?” কিংবা “এখন আপেল খাবে না কলা?”—এমন প্রশ্ন শিশুর মনে এই বোধ তৈরি করে যে, তার মতামতের গুরুত্ব আছে। এটি তার জেদ করার প্রবণতা অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
৩. প্রত্যাশার স্পষ্টতা ও সুনির্দিষ্ট নিয়ম: কোন আচরণটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি বর্জনীয়, সে সম্পর্কে শিশুর কাছে আপনার বার্তা যেন স্পষ্ট থাকে। নিয়মের বেড়াজাল যদি নড়বড়ে হয়, তবে শিশু দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। সুনির্দিষ্ট রুটিন ও স্পষ্ট নিয়ম শিশুর জীবনে স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তার বোধ নিয়ে আসে।
৪. পজিটিভ রিইনফোর্সমেন্ট বা ইতিবাচক উৎসাহ: মনোবিজ্ঞানে ইতিবাচক উৎসাহের ভূমিকা অপরিসীম। শিশু কোনো ভালো কাজ করলে বা জেদ না দেখিয়ে কথা শুনলে তার অকুণ্ঠ প্রশংসা করুন। একটি ছোট চকলেট, একটি স্টিকার কিংবা কপালে আলতো চুমু—এসবই শিশুর মনে ভালো আচরণের প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করে।
৫. সহমর্মিতা ও সক্রিয় শ্রবণ: আপনার সন্তান যখন কান্না করে, তখন তাকে থামানোর আগে বোঝার চেষ্টা করুন সে কেন কাঁদছে। তার উচ্চতায় নেমে এসে চোখের দিকে তাকিয়ে বলুন, “আমি বুঝতে পারছি তোমার খুব খারাপ লাগছে।” যখন শিশু অনুভব করে যে তার কষ্ট কেউ বুঝছে, তখন তার জেদ করার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়।
৬. যুক্তিনির্ভর কারণ ব্যাখ্যা: “আমি বড়, তাই আমি যা বলছি তা-ই করতে হবে”—এমন একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব পরিহার করুন। বরং কোনো কাজ করতে বললে তার পেছনের কারণটি সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন। বুদ্ধিবৃত্তিক কারণ জানলে শিশু সহযোগিতামূলক আচরণ করতে উৎসাহিত হয়।
৭. রুটিন ও শৃঙ্খলার চর্চা: খাবার, ঘুম এবং খেলার সময় যদি নির্দিষ্ট থাকে, তবে শিশুর শরীর ও মন একটি ছন্দের মধ্যে চলে। অনিশ্চয়তা শিশুর মধ্যে বিরক্তি ও জেদ তৈরি করে। তাই একটি সুন্দর দৈনিক রুটিন জেদি সন্তানকে বশে আনার কার্যকর উপায় হিসেবে অত্যন্ত ফলপ্রসূ।
সংকটকালীন মুহূর্তে অভিভাবকের করণীয়
যখন শিশু জনসমক্ষে বা বাড়িতে চরম জেদ শুরু করে, তখন বিচলিত না হয়ে নিচের কৌশলগুলো অবলম্বন করুন:
- স্থান পরিবর্তন: শিশুকে শান্ত করার জন্য ওই নির্দিষ্ট পরিবেশ থেকে সরিয়ে নির্জন কোথাও নিয়ে যান। পরিবেশের পরিবর্তন অনেক সময় শিশুর উত্তেজনা কমিয়ে দেয়।
- শারীরিক স্পর্শ ও মমতা: শিশু যখন রাগে অন্ধ হয়ে যায়, তখন তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরুন। আপনার শরীরের উষ্ণতা ও আলিঙ্গন তার মস্তিষ্কে প্রশান্তির বার্তা পাঠাবে।
- মনোযোগ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা: শিশুর জেদের বিষয়টি নিয়ে সরাসরি তর্কে না জড়িয়ে তার প্রিয় কোনো গল্প বা খেলনার কথা বলে মনোযোগ ঘুরিয়ে দিন।
- ট্যানট্রাম সাবসাইডিং বা কৌশলগত অবজ্ঞা: যদি বোঝা যায় শিশু কেবল মনোযোগ পাওয়ার জন্য জেদ করছে, তবে তাকে কিছুটা সময় একা ছেড়ে দিন। যতক্ষণ সে শান্ত না হচ্ছে, ততক্ষণ তার সাথে তর্কে জড়াবেন না। সে যখন দেখবে জেদ করে কোনো লাভ হচ্ছে না, সে নিজে থেকেই শান্ত হয়ে আসবে।
কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন?
সাধারণত শৈশবের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে জেদ থাকা স্বাভাবিক। তবে শিশু যদি নিজের বা অন্যের শারীরিক ক্ষতি করার চেষ্টা করে, অতিরিক্ত মারমুখী হয়ে ওঠে, কিংবা চার-পাঁচ বছর বয়সের পরেও কোনোভাবেই তার জেদ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তবে একজন অভিজ্ঞ শিশু বিশেষজ্ঞ বা মনোরোগবিদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতা বা নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল কোনো কারণেও শিশুর আচরণে এমন উগ্রতা আসতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, জেদ কোনো রোগ নয়, বরং এটি শিশুর বেড়ে ওঠার একটি জটিল পর্যায় মাত্র। জেদি সন্তানকে বশে আনার কার্যকর উপায় প্রহার বা ভীতি প্রদর্শনের মধ্যে নেই, বরং আছে অপরিসীম ধৈর্য ও ভালোবাসায়। একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে আপনার সঠিক নির্দেশনা ও সুন্দর আচরণই পারে একটি অবাধ্য শিশুকে সমাজের এক অমূল্য সম্পদে পরিণত করতে। আজকের ধৈর্যশীল মা-বাবাই আগামীদিনের একজন আত্মবিশ্বাসী ও সংবেদনশীল মানুষের নির্মাতা।
সচরাচর কিছু প্রশ্ন :
১. প্রশ্ন: শিশুর জেদ কি কোনো মানসিক সমস্যা বা রোগ? উত্তর: না, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুর জেদ কোনো মানসিক রোগ নয়। এটি শিশুর বেড়ে ওঠার একটি স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক ধাপ। বিশেষ করে যখন তারা নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা জাহির করতে চায় কিন্তু শব্দ দিয়ে মনের ভাব গুছিয়ে বলতে পারে না, তখনই তারা জেদের মাধ্যমে প্রতিবাদ বা চাহিদা প্রকাশ করে।
২. প্রশ্ন: জেদ করলে শিশুকে শাসন করতে মারধর করা কি ঠিক? উত্তর: একদমই নয়। মারধর করলে শিশুর জেদ সাময়িকভাবে কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তা হিতে বিপরীত হয়। এতে শিশুর মনে ভয় ও ক্ষোভ জন্মায় এবং সে নিজেও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। মারধরের বদলে ধৈর্য এবং ইতিবাচক কৌশলের মাধ্যমে তাকে শাসন করা উচিত।
৩. প্রশ্ন: শিশু জনসমক্ষে বা বাইরে জেদ শুরু করলে দ্রুত শান্ত করার উপায় কী? উত্তর: জনসমক্ষে শিশু জেদ করলে মা-বাবা লজ্জিত হয়ে তার আবদার পূরণ করে ফেলেন, যা ভুল। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর হলো দ্রুত স্থান পরিবর্তন করা। শিশুকে কোলে নিয়ে নিরিবিলি কোথাও চলে যান এবং সে শান্ত না হওয়া পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করুন। তাকে বোঝান যে, চিৎকার করে কোনো লাভ হবে না।
৪. প্রশ্ন: শিশুকে কি সব সময় তার পছন্দের কাজ করতে দেওয়া উচিত? উত্তর: সব সময় নয়। তবে তাকে ছোট ছোট বিষয়ে পছন্দের স্বাধীনতা দেওয়া উচিত (যেমন: দুটি পোশাকের মধ্যে একটি বেছে নেওয়া)। এতে শিশুর মধ্যে ‘নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার’ তৃপ্তি আসে এবং অযৌক্তিক বিষয়ে জেদ করার প্রবণতা কমে যায়। তবে ক্ষতিকর বা অন্যায্য বিষয়ে অবশ্যই কঠোর হতে হবে।
৫. প্রশ্ন: অতিরিক্ত আদর কি শিশুকে জেদি করে তোলে? উত্তর: আদরের কারণে শিশু জেদি হয় না, বরং শাসনহীন ‘অন্ধ আবদার’ পূরণের কারণে জেদি হয়। চাহিদার আগেই সবকিছু হাতে পেয়ে গেলে শিশু ধৈর্যের গুরুত্ব বোঝে না। তাই শিশুকে আদর দেওয়ার পাশাপাশি জীবনের নিয়ম-কানুন এবং ‘না’ শোনার অভ্যাসও তৈরি করতে হবে।
৬. প্রশ্ন: কখন বুঝব যে শিশুর জেদ অস্বাভাবিক এবং বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া প্রয়োজন? উত্তর: যদি দেখেন ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশু প্রতিনিয়ত নিজের বা অন্যের শারীরিক ক্ষতি করছে, আসবাবপত্র ভাঙচুর করছে, নিজের শ্বাস আটকে রাখছে কিংবা কোনোভাবেই তাকে শান্ত করা যাচ্ছে না, তবে একজন শিশু মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
